Friday, July 24, 2026

আমার দেশ, এখন

 

মনে কি পড়ে ঢুকে পড়েছি কবে এই সুড়ঙ্গে?

আলো কি ছিল? হয়তো বা ছিল যাত্রা শুরুর দিনে।

এখন অন্ধকার, তীব্র অন্ধকার, তবে শব্দ আছে -

শব্দ স্লোগানের, ফর্মান-ফতোয়ার, চাবুকের আস্ফালন,

চাপা আর্তনাদ, পেলেট গান, লাঠি, বেনোজলের চোটপাট।

অনুসরণের ইঙ্গিতবাহী না, নেহাৎ মুখহীন শব্দ।

গার্হস্থ্য রাতের মতো নিশ্চিন্তি দেয় না এ অন্ধকার,

কাঁটা খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে জীবনের সব অর্জন!

ব্যারিকেড ঘেরা দিকশূন্যের মতো চলছি তো চলেইছি –

হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁক পাথরের টুকরো উড়ে এল ভীড়ে -

কোথা থেকে? কে? পুলিশ ছুঁড়েছে? যন্তর-মন্তর থেকে?

সুড়ঙ্গের আলোর প্রান্ত জানাল নাকি তার ঠিকানা?

24/07/2026

Thursday, July 23, 2026

সাইকেল চুরি

 

-          গল্প, দরজাটা বন্ধ করো।

সাড়া নেই। তাকে দেখাও যাচ্ছে না। উধাও হয়ে গেছে। তাই ভল্যুম খানিকটা বাড়িয়ে -

-          গল্পও -  গল্পওওও..

গল্পের বান্ধবী ময়রাদিদি রোয়াকে বসে আছে, ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে। ভল্যুম বাড়ানোর পর সে মুখ বাড়িয়ে বলল - আরমান ইধর হ্যায়।

ইধার হ্যায় তো সাড়া কিঁউ দেতা নহি – মনে ভাবতে ভাবতে দরজা পেরিয়ে বাইরে হাজির হয়েছি সে নবাবপুত্তুর কি করছেন তা স্বচক্ষে দেখবার জন্যে। আমাকে দেখেই ময়রা তড়াক করে রক থেকে রাস্তায় নেমে উত্তর দিকে মুখ করে আরমান ...... আরমান করে ডাকতে শুরু করল।  কোনো সাড়া নেই।

-          কিধার গয়া?

-          আরমান কুছ খোঁজ রহা হ্যাহ।

-          কেয়া?

-          কুছ খো গয়া শায়দ।

-          কেয়া খো গয়া।

-          মালুম নহি।

-          সাইকেল লেকে গয়া কেয়া?

-          সাইকেল হি তো খো গয়া।

-          মানে?!

-          কুছ দের পহলে আরমান উধার সাইকেল রাক্খা থা, চাবি দে কে রাক্খা থা। লেকিন আভি নহি হ্যায়, কোই লেকে চলা গয়া!

ময়রা ক্লাস সিক্স। আমাদের বাড়ির প্রায় কোনাকুনি বাড়িটা তার মামারবাড়ি। মামা বাঙ্গালোরবাসী, তবে দাদু-দিদা এখানেই থাকেন। ডিসেম্বরের ছুটিতে ময়রা ও তার মাসতুতো ভাই ইয়ুভান মামারবাড়িতে এসেছে। ইয়ুভান ক্লাস টু। গল্প ও আরমান একই ব্যক্তির ডাকনাম আর ভালোনাম। সেও ক্লাস টু। ইদানিং সকাল দশটা থেকে রাত দশটা অবধি যেকোনো সময়ে আশেপাশে যেকোনো জায়গায় – রাস্তায় রোয়াকে ছাদে সিঁড়িতে খাটের নিচে – এই তিনমূর্তিকে নানান ক্রিয়াকাণ্ডে ব্যস্ত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। গল্প একেবারেই কাছাখোলা – বাড়ি থেকে আটবার বেরোলে ষোলোবার দরজা হাট করে খোলা থাকে। ঘরে ঢুকে একটা আলো জ্বাললে বেরোবার সময়ে আরেকটি আলো জ্বেলে রেখে বেরিয়ে যায়। তবে তর্কে সে অজেয়। প্রতিপক্ষকে একেবারে ধ্বসিয়ে দেবে – যুক্তিতে নয়, দৈর্ঘ্যে। প্রতিটি কথার উত্তর তার মুখে মজুত। ফলে ধৈর্যের শেষ সীমা পেরিয়ে, আজকাল তো চড়চাপড় ব্যান হয়ে গেছে তাই, প্রতিপক্ষ রণে ভঙ্গ দেবে! এই যেমন, গল্প তার দ্বিচক্র যানটি বাড়ির সামনে রাস্তায় রাখবে – এপারে বা ওপারে। তাকে অনেকবার বলা হয়েছে চক্কর মারা হয়ে গেলে রাস্তায় ফেলে না রেখে সাইকেলটি বাড়িতে তুলে রাখতে।

-          কেন?সানিদাদা বাইক রাস্তায় রাখে, পিকলুদাদা গাড়ি রাস্তায় রাখে, নান্টুজেঠু তার অটো রাস্তায় রাখে, তোমার গাড়িও মাঝে মাঝে সারারাত রাস্তায় থাকে, তাহলে আমি কেন রাখবো না?

-          তোর তো ছোটো সাইকেল, কে কবে তুলে নিয়ে চলে যাবে, তখন কি করবি?

-          আমি চাবি দিয়ে রাখি।

-          তোর ওই কুড়ি ইঞ্চি চাকার সাইকেল চাবি দেওয়া সমেত মাথায় তুলে নিয়ে চলে যাবে। সানির বাইকটা চারশো সিসির, খুব ভারি, তুলে নিয়ে যেতে পারবে না।

-          যদি মনে করে নিয়ে যাবে তাহলে তো পাঁচজন বাউন্সার ভাড়া করে এনে বাইক তুলে নিয়ে যেতে পারে।

ব্যাস, একবার এই যদির চক্রব্যূহে ঢুকে গেলে তো রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া বাঁচার রাস্তাই নেই!

ময়রা ডেকে ডেকে হাল ছেড়ে দেবার পর পাশের গলি থেকে আবির্ভাব হল গল্পর। পাশের এই গলিতে বহু মানুষের বাস। ঘর ও পথের তুলনায় বাসিন্দার সংখ্যা এতই বেশি যে সারাক্ষণই অগণিত মানুষ ও তাদের সংসারের খানিকটা অংশ এই রাস্তার ওপরেই থাকে। পাড়ার দাদাদের মোটরবাইক, ভাঙা বালতিতে পোঁতা তুলসীগাছ, কলাগাছ, বালতি ভরা সংসারের জল, পাখির খাঁচা, বিকেলে রোলের দোকানের জন্যে পিঁয়াজ কুঁচোনো, ফুটপাতের রুটি-তরকারির দোকানের আলু-পটল কাটা – কি নেই পথের এই এক্সটেন্ডেড সংসারে! তারই পাশ কাটিয়ে এই রাস্তা দিয়ে সাইকেল, বাইক ও জঞ্জালের গাড়িও চলে। আর অবিরাম লোক। গুগল দেখায় না বটে, তবে দেখালে এই রাস্তাকে সারাক্ষণ লাল রঙেই দেখাত। এত ব্যস্ততার একটা কারণ হল এই রাস্তা একটা মোক্ষম শর্টকাট। সাইকেলের খোঁজে গল্প এই গলিতে গেছিল পরিক্রমায়।

-          কি রে, তোর সাইকেল কোথায়?

-          দেখছো তো খুঁজছি।

পরম অবজ্ঞায় উত্তর ছুঁড়ে দিয়ে তিনি চরম ব্যস্ততায় ডানদিকে ঘুরে পার্কের দিকে চলে গেলেন। ইতিমধ্যে ময়রা ও ইয়ুভানের – নেহি মিলা...কিধার গয়া... ইত্যাদি গুঞ্জনে দুটি বাইক এখানে থেমে গেছে – একটি সানিদাদার আর অন্যটি তার বন্ধুর।

-কি হয়েছে? কি হয়েছে?

-সাইকেল উঠাকে লে গয়া...

আমার ধুয়ো -গল্পর সাইকেল চুরি গেছে।

-যেটা করে ও ঘুরে বেড়ায়?

-হ্যাঁ। সানিবাবা, তুই তো চিনিস ওর সাইকেলটা। একটু নজর রাখিস তো। কোথাও বা কাউকে যদি ওই সাইকেল নিয়ে দেখিস।

-হ্যাঁ, হ্যাঁ, চিনি তো। ও এইখানটাতেই তো রেখে দেয়।

-ইধার সে হি তো উঠাকে লে গয়া।

-ওর সাইকেল তো সবাই চেনে। দীপ জানে?

-জানিনা। আমি তো এই সবে জানতে পারলাম।

দীপ সানির বন্ধু, গল্পের সদ্য কলেজ শেষ করা মামাতো দাদা। শুধু সানি নয়, দীপ, সানি আর পাপাই এ পাড়ার থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। গল্পের মা আজ বাড়িতে। শনিবার তার অফিস বন্ধ থাকে। সে নিজের ঘরে হয় দিবানিদ্রা নয়তো ওটিটিতে মগ্ন। আমি ওপরে উঠে তার দরজা নেড়ে এ হেন দু:সংবাদ দিলাম। সে শুনে নির্বিকারভাবে বলল

–বেশ হয়েছে। তুমি নাতিকে নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে এখন বিশ্রাম নিতে যাও।

সে নাহয় যাচ্ছি। কিন্তু এর কোনো তাপ-উত্তাপ নেই কেন? সাইকেল গেল মানে কেউ নজর রেখেছে। আর নজর রেখে থাকলে সে তো আর সাইকেলেই শেষ হবে না। বরং বলা যায় যে সাইকেল দিয়ে শুরু হল। এ তো উটকো ঝামেলা এল পাড়ায়! নাতিকে নিয়ে মাথা নাহয় না ঘামালাম। কিন্তু এই ঝামেলার ভাবনাটা তো মাথায় ঝামেলা করছে!

রাস্তায় এখন তিনমূর্তির লাগাতার অনুসন্ধান পর্ব চলছে। কে সাইকেল তুলে নিয়ে গিয়ে কোন রাস্তায় তার মালিকের জন্যে সাজিয়ে রেখে দিয়েছে সেই সন্ধানে গরুখোঁজায় ব্যস্ত তিনজনে। প্রায় আধঘণ্টা পর শুনি রোয়াকে তিনজনের গলা পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে কি সাইকেল পাওয়া গেল? কিন্তু কথাবার্তায় তেমন উচ্ছ্বাস নেই, বরং একটু তর্কাতর্কি চলছে। কি হল? আবার উঁকি দিলাম। ওপরের বারান্দা থেকে আলোচনায় আড়ি পেতে বোঝা গেল যে সাইকেলের দেখা পাওয়া গেছে পাপাইদাদাদের কোলাপসিবল গেটের ভেতরে। গেটে চাবি দেওয়া। সাইকেল দেখতে পেয়ে এবং সেটি তালাচাবির মধ্যে থাকায় ওরা একদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত। তবে ওদের এই মুহূর্তের প্রশ্ন হল – অপহরণটা কে করল? ময়রাদিদির মতে – পাপাইদাদাই করেছে, আবার কে? ইয়ুভান পুরো ঘেঁটে গেছে, বলছে – পাপাইদাদা তো অত ছোটো সাইকেলে চড়তেই পারবে না, ও কেন করবে? আর গল্প বলছে –চুরি হয়নি। পাপাইদাদা চুরি করতেই পারে না। এখানে নিশ্চয়ই অন্য ব্যাপার আছে।

যে ব্যাপারই থাক আপাতত ওরা সাইকেল হাতে পাচ্ছে না, সে তো চাবির ভেতর। দরজা নেড়ে ডাকতেও ভরসা পাচ্ছে না, কারণ কি করে কি হল তা এখনও বোধগম্য নয়। শেষ অবধি ঠিক হল যে ওরা দীপদাদার শরণাপন্ন হয়ে পাপাইদাদাকে ফোন করাবে। দীপদাদাও বাড়িতে নেই। ফিরুক। এখন অপেক্ষা।

-কি হল, তুমি ঘরে যাওনি? তখন থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছো?

-না রে, এই তো আবার এলাম। জানিস, ওরা না পাপাইয়ের বাড়িতে সাইকেলটা দেখতে পেয়েছে।

-পাবেই তো! এই ভরদুপুরবেলা, রাস্তায় কেউ কোত্থাও নেই, শুধু সাইকেলটা পড়ে আছে দেখে দীপ ওটা তুলে নিয়ে গিয়ে পাপাইদের বাড়িতে রেখে এসেছে তো। তারপর পাপাইকে আর আমাকে বলে বেরিয়ে গেছে। খুঁজুক। ওই সাইকেল চুরি করা যায় কিনা বুঝুক। আর চুরি গেলে কেমন লাগে দেখুক। যাও যাও, তুমি এখন ঘরে ঢোকো। বাকিটা দীপ বুঝে নেবে!

-----

 

Tuesday, July 8, 2025

কেওনঝড় জুলাই ৫, ২০২৬ (১ম ও শেষপর্ব)

 জুলাই ৫, ২০২৫ (১)











আজ আমাদের ফেরার দিন। বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে ফিরব জাজপুর স্টেশন থেকে। তার আগে পথে দেখব সীতাবিঞ্জি আর পাহাড়ের গায়ে ফ্রেস্কো। ব্রেকফাস্ট সেরে, বিল মিটিয়ে ঘরেই বসে আছি। আজ ছিল লুচি, আলুকুমড়োর তরকারি আর চিঁড়ের পোলাও। 

গাড়ি এলেই বেরিয়ে পড়ব।  গাড়ির দেরি হচ্ছে। ফোন করতে জানা গেল আজ অন্য গাড়ি, অন্য ড্রাইভার আসবে। গত দুদিনের গাড়ি বিয়েবাড়িতে গিয়ে ফিরতে পারেনি। পান্থনিবাসের একটি সুগন্ধী ডবল টগরের ও খুদি খুদি ফুলের বোগেনভেলিয়ার গাছ খুব পছন্দ হয়েছিল আমাদের তিনজনেরই। আহা যদি কটা ডাল পাওয়া যেত! এই বর্ষায় হয়ত লেগেও যেত। সকালে একজন স্টাফকে সে কথা বলেছিলামও, মানে আবেদন। আমরা তখনও ঘর থেকে নামিনি। সেই কর্মী আমাদের দরজায় নক করে, আমাদের ব্যাগগুলো সব নামিয়ে দিয়ে, কোথায় হাওয়া হয়ে গেলেন। তারপর দেখি একটা ঠিকঠাক কাটার দিয়ে ঠিকঠাক ডাল খুঁজে কেটে আমাদের দিলেন। মধুমিতার ভাঁড়ারে বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক বিনব্যাগ ছিল, ওগুলো ওর ক্যামেরার ব্যাগের বর্ষাতি। তারই তিনখানা ও বার করল তিনজনের জন্যে। ততক্ষণে গাড়িও হাজির। সবাইয়ের কাছে বিদায় নিয়ে পোঁটলা পুঁটলি বৃক্ষশাখাসম্পদ আগলে গাড়িতে অধিষ্ঠিত হতে গাড়িও যাত্রা শুরু করল, সঙ্গে বৃষ্টিও তার রেগুলেটর ফুলস্পিড করে দিল।

সীতাবিঞ্জির পথে যাচ্ছি এন এইচ ২০ ধরে। রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডারে বাহারি কলকে আর করবীর ঝোপ। কলকে হলুদ, সাদা আর হলুদ ফুলের অন্দরমহলে কমলা ছোপ। করবী তাজা গোলাপী, সাদা, লাল আর লাল-গোলাপীর মাঝের একটা শেড। কত রঙের! খুব লোভ হচ্ছে। বৃষ্টি পুরো এনার্জি নিয়ে নেচে চলেছে। একটা সময় সব কিছুর সমাপতন ঘটল - বৃষ্টি প্রায় নেই, ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার জন্যে নেমে গেল। আর ডানদিকের ডিভাইডারে তখন কলকের তিনটে রং-ই হাতছানি দিচ্ছে। আমিও চট করে নেমে পড়লাম। তিনটে গাছের তিনটে ডাল ভেঙে নিয়ে, ডিকি খুলিয়ে তুলে দিয়ে আবার ছুট। 

লোকমুখে সীতাবিঞ্জি লব-কুশের জন্মস্থান, যদিও ওখানকার গেরুয়াধারীরা বাল্মীকি আশ্রমের খোঁজ জানেন না। পাহাড়ের গায়ে চওড়া বাঁধানো টাইলসের সিঁড়ি। বর্ষায় পিছলে যাবার সম্ভাবনা। ৪০/৫০ ধাপ ওপরে পাহাড়ের কয়েকটা বিশাল বোল্ডারের খাঁজই মন্দির - সীতামাই- দুপাশে লব ও কুশ। পৌঁছনোর বারান্দা টাইলস বাঁধানো, পাশে রেলিং। সেই রেলিং, আশপাশের গাছের ডাল ও গুঁড়ি, এমনকি কোথাও কোথাও দড়ি বেঁধে তাতে অজস্র জরি-বর্ডারের লাল কাপড় বাঁধা - আকাঙ্ক্ষা পূরণের মানত। গাছের নিচে, পাথরের খাঁজে, চাতালে অসংখ্য মাটির ঘোড়া - আকাঙ্ক্ষা পুরণ হওয়ার নিবেদন হয়তো। সিলিং তৈরি করা বোল্ডারের নিচের পিঠ, আকাশমুখী ওপর পিঠ, পাহাড়ের বুকের জঙ্গল দেখে যখন নামছি তখন আটকে দিল বৃষ্টি। ওই বোল্ডারের আশ্রয়ে ৪৫ মিনিট দাঁড়িয়ে। বৃষ্টি কমছে না। পায়ের নিচে দিয়ে জলের ধারা বইছে। অগত্যা তার মধ্যেই ছাতা রেইনকোট নিয়ে পা টিপে টিপে নামা শুরু। জুতো নিচেই খুলে রেখে ওপরে উঠেছিলাম। মধুর আর আমার পাদুকা রাবার জাতীয় জিনিসের। সর্বাণীর স্নিকার্স - ততক্ষণে তারা রস টুসটুসে চমচম! চালক গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়েই পড়েছে। তাকে তুলে, গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা শুরু। এবার ফ্রেসকো। আসার সময়ে কাছেই একটা রেলিং ঘেরা জায়গার পাশে ফ্রেসকো লেখা বোর্ড দেখেছিলাম। সেখানে ঢুকলাম। বৃষ্টির ক্ষান্তি নেই। মধু বলল ও নেমে আগে দেখবে ফ্রেসকো কোথায়। তারপর আমরা নামব। সামনেই একটা উঁচু মনোলিথিক স্টোন, আশেপাশে ছোটোখাটো কয়েকটি। এগুলো তো রোদ-বৃষ্টিতে উন্মুক্ত। এখানে ফ্রেসকো হবে না। দুজন মহিলা ছাগল চরাতে চরাতে এর আড়ালে দাঁড়িয়ে। তাদের জিগেস করতে বলল এই রাস্তায় একটু এগিয়ে 'চিত্র' আছে।  এই জায়গাটা রাজার লুকোনো রত্নভাণ্ডার ছিল। এখানে চিত্র নেই। একটু এগিয়ে-কে আমরা ভুল বুঝলাম ফেরার রাস্তায় একটু এগিয়ে বলে। তাই ওই ফ্রেসকো লেখা সীমা থেকে বেরিয়ে এলাম। আরেকজন মহিলাকে দেখে আবার জিগেস করে বুঝতে পারলাম যে ওই ফ্রেসকো সীমানার ভেতরেই ওই মনোলিথিক পাথরটা ছাড়িয়ে মাটির রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে। আবার গাড়ি ঘোরাও। একটু এগিয়ে দেখি ডানদিকের বিশাল বোল্ডারের গায়ে খানিকটা রেলিং দেওয়া পাথরের ধাপ। মধু আর আমি ছাতা মাথায় এগোলাম। ওই বোল্ডারের পেছনদিকে আরেকটি বোল্ডার মাথার ওপর একটু ছাদের আড়াল দিয়েছে, তার গায়ে কয়েকটি লোহার খাম্বার সাপোর্ট।‌ সেখানে দুজন মহিলা আশ্রয় নিয়েছে, সঙ্গে তাদের ছাগল বাহিনী। তাদের সামনে ছাদের বোল্ডারে ওঠার একটা লোহার সিঁড়ি। সে সিঁড়ি মজবুত, কিন্তু তার উঁচু উঁচু ধাপের পা রাখার জায়গায় ফাঁক ফাঁক লোহার পাত আর ধাপের ঢাল ভেতর দিকে। সিঁড়ি, বৃষ্টি, ছাতা, ক্যামেরা সব সামলে ওপরে উঠে দেখি সিলিং -এ, সেও আরেকটি বোল্ডার, ফ্রেসকোর ধ্বংসাবশেষ - রং আর বেরং মিলিয়ে দুটি ঘোড়া আর কয়েকটি মানুষের উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছে মাত্র। রক্ষণাবেক্ষণের বড়োই অভাব। ছবি তুলে আবার কসরৎসহ নিচে নেমে ভিজে গুটিসুটি ছাগল বাহিনীর ছবি তোলা হল। একজন মহিলা আলাপী - কোথা থেকে এসেছি, ছবি দেখাও, আমাদের কিছু দেবে না গো... ইত্যাদি। সে সব মিটিয়ে এবার সোজা জাজপুরের দিকে।

পথে আবার সেই গোলাপী করবীর হাতছানি। এবার সর্বাণীর আগ্রহটা বেশি। বৃষ্টি একটু কমতে তারও একটা ডাল সংগ্রহ করা হল। জাজপুর স্টেশনের কাছাকাছি বড়ো গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ। তখন একটু ঘুরপথে জাজপুর পৌঁছলাম আমরা। ট্রেন আসবে ২ নং প্ল্যাটফর্মে। ৪টে নাগাদ আসার কথা, বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। লিফট ও ওভারব্রিজ দিয়ে আবার সেই আপার ক্লাস লেডিজ ওয়েটিং রুমে। ওয়েটিং রুমের দরজা ভেজিয়ে হুড়কোটা সামান্য টানা। আশপাশে নাম লেখার খাতা বা লোক কেউ নেই। তবে সেটা কোনো বাধাই নয়। তিন তারিখ ভোর রাতে আমাদের নাম তো লেখা হয়েইছিল। অতএব প্রবল অধিকার বোধে দরজা খুলে ঢুকে পড়লাম। 






জুলাই ৫, ২০২৫ (ঘরে ফেরার পর্ব)

জাজপুর স্টেশনে গরম খাবারের ব্যবস্থা নেই। আগে ছিল, করোনা কাল থেকে বন্ধ। আবার স্টেশনের বাইরে যাবারও ইচ্ছে নেই। তাই প্যাটিস, কফি, লস্যি দিয়ে লাঞ্চের কাজ চালানো হল। ট্রেনের রাইট টাইম চারটেয়। স্টেশনে কোনো ডিজিটাল বোর্ড নেই, শুধু প্ল্যাটফর্মের ওপর ট্রেনের নাম, নম্বর ও কম্পার্টমেন্টের নম্বর দেখানো ঝোলা বোর্ডগুলো ছাড়া। আমি আর মধুমিতা খুঁজতে বেরোলাম কোথায় আমাদের ট্রেনের রিয়েল টাইম খবর পাওয়া যাবে। একটা ক্রু রেস্টরুমের জানলা দিয়ে জিগেস করতে একজন ফোনে দেখে বললেন ট্রেন রিশিডিউল হয়েছে, উল্টোরথের কারণে। ট্রেন তো আসছে পুরী থেকে। মধুমিতার গুগল বলছে ৫৮ মিনিট লেট। একটু পরেই ঘোষণা হল বন্দে ভারত রিশিডিউল হয়ে ১ঘণ্টা ৫৬ মিনিট দেরিতে আসবে।‌ মানে হাওড়ায় সাড়ে আটটার অ্যারাইভাল সাড়ে দশটার আগে তো নয়ই। আজকাল রাতে হাওড়া স্টেশনে লাগাম-ছাড়া-দর-হাঁকা ট্যাক্সি ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। যাত্রী সাথী অ্যাপের পর থেকে ট্যাক্সিকে ট্যাক্সি-বে-তে ঢোকানোর জন্যে রাতে পুলিশ থাকে না। দিনের খবর জানি না। নতুন প্ল্যাটফর্ম কমপ্লেক্স থেকে বাসস্ট্যান্ড অনেক দূর। পিঠে হাতে ব্যাগ রয়েছে। আমার গাড়ি আসার কথা। এমতাবস্থায় মধুমিতা ও সর্বাণীকে বললাম রাতে আমাদের বাড়িতে থেকে যেতে, বাড়িতে বলে দিতে। দুজনেই রাজি হল। আমিও বাড়িতে জানিয়ে দিলাম। এবার নিশ্চিন্ত। সর্বাণী প্রস্তাব দিল লুডো খেলার। ওয়েটিং রুমে টেবিল বা টেনে নিয়ে মুখোমুখি বসার চেয়ার নেই। সব ভারি সোফা। আমি বললাম ওয়েটিং রুমের সামনেই প্ল্যাটফর্মে লোহার পিলার ঘিরে যে কালো পাথরের বসার জায়গা সেখানে গুছিয়ে পা তুলে বসে খেলব, উত্তর কলকাতার ফুটপাতে যে রকম তাস খেলা চলে, সেইরকম। পাব্লিক দাঁড়িয়ে গেলে বা দেখলে বা চাল দিতে সাহায্য করলেও কোনো অসুবিধে নেই। ওয়েটিং রুমে ততক্ষণে আরও ২/৩ জন এসে গেছেন। তাঁরাও আছেন। আর আমরা তো দরজার মুখোমুখি বসব। ব্যাগ নিয়ে অত দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।

বোর্ড পেতে লুডো খেলা শুরু হল। কেউ দাঁড়িয়ে গেল না, তবে আসতে যেতে সবারই নজর কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আমাদের দিকে। এমনকি ট্রেন থামলে ট্রেনের জানলা আর দরজার লোকজনও দেখছে। স্টেশনের এই লোহার পিলারগুলো দুপাশে রেল, মাঝখানটা ফাঁকা। পিলার ঘেরা এই চৌকো জায়গাটায় পিলারের একদিকে আমরা, অন্যদিকে এক ভদ্রলোক ঘুমোচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে পরিবারের লোকজনও আছে। লুডোর ছক্কার খটখট শব্দে তাঁর ঘুম ভাঙলো, তিনি আমাদের দিকে পাশ ফিরে প্রথমে কনুইয়ের ভরে আধশোয়া হয়ে পিলারের ফাঁক দিয়ে অবজার্ভ করতে লাগলেন। একটু পরে উঠে বসে পিলারের ফাঁকে মুণ্ডু প্রায় গলিয়ে পরিচালনা করতে লাগলেন। চালে গুনতে ভুল হলে, কার চাল তা ভুলে গেলে, পরপর কয়েকটি চাল পেয়ে মোটের হিসেবে ভুল করলে .... প্রভূত সাহায্য আসতে লাগল। কোন রং জিতবে তারও প্রেডিকশন হতে থাকল। মোট কথা, দারুণ জমে উঠল - কেউ কারুর ভাষা না বুঝলেও। আমি আবার একজনকে ছবি তুলে দিতে বললাম। এসব করতে করতে জানা গেল সাড়ে ছটার পরে ট্রেন ঢুকবে। আমাদের ওয়েটিং রুমের সহযাত্রীরা বলে গেলেন যে আমরা যেন আমাদের ব্যাগগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করি, ওঁরা এবার প্ল্যাটফর্মে যাচ্ছেন। আমরা এশিয়াডের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বলে ওনারা স্বেচ্ছায় আমাদের ব্যাগের‌ দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিলেন। এরপর সব গুটিয়ে গুছিয়ে ট্রেনে ওঠা। আমি উঠেই খোঁজ করলাম আমাদের ডিনার দেওয়া হবে কিনা।‌ অ্যাডেনডেন্ট বললেন - এখন বিকেলের স্ন্যাক্স দেওয়া হবে, আর ডিনারে খিচুড়ি। যাক বাবা, নিশ্চিন্ত, বাড়িতে কিছু আয়োজন করতে বলতে হবে না। এবার শুধু তিনটে কাজ - খাও, ঘুমোও আর পরের ট্রিপের প্ল্যান করো।

পুনশ্চ: রাত সাড়ে এগারোটায় ট্রেন হাওড়া পৌঁছেছিল।

কেওনঝড় জুলাই ৪, ২০২৬ (১, ২, ৩, ৪, ৫)

জুলাই ৪, ২০২৬ (১)



আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেরাই একটু চা তৈরি করে খেয়ে নিলাম, সঙ্গের কেক সহযোগে। তারপর এল বেডটি। সেটিও গলাধঃকরণ করে পান্থনিবাসের ছাদে গিয়ে তিনজনে মিলে হাত-পা-কোমর দুলিয়ে ছুঁড়ে টানটান করে নেওয়া হল। ঝর্ণাদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্যে এদের প্রচুর খাটাখাটনি হচ্ছে, তাই একটু ওয়ার্ম আপ। তারপর একটা ব্যালকনিতে গিয়ে খানিক বসা হল। এরপর চান করে তৈরি হওয়া ও ব্রেকফাস্ট করা। গাড়ি আসবে সকাল ৯টায়। 

এবার একটু খাবারদাবারের খবর দি। কাল দুপুরে পান্থনিবাসে লাঞ্চ করেছি - ভাত, মুসুর ডাল, আলু পটল ভাজা, মাছের ঝাল, আমের চাটনি। মাছ টাটকা, খাবার ভালো। রাতে রুটি আর মুরগির মাংস কষা। আজ সকালের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। ছিল উপমা, লুচি, আলুর তরকারি আর চা। আজ দুপুরে হালকা লাঞ্চ পথেই - ডবল ডিমের রোল। রাতে চাইনিজ খাওয়া হবে পান্থনিবাসেই। আর কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়া। 


সে এক সিঁড়িভাঙা দিন

জুলাই ৪, ২০২৫ (২)

গাড়ির চাকা গড়ালো। আজ প্রথম গন্তব্য খণ্ডধার জলপ্রপাত, ৫৬ কিমি। নিকটতম পয়েন্টে গাড়ি রেখে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম খণ্ডধারের দিকে। গুগলে দেখেছি এটি কোরাপানি নালার জলপ্রপাত, বৈশিষ্ট্যে অনেকটা উঁচু, ৫০০ ফিট। আজ আকাশ বড় অনিশ্চিত - ঝিরঝিরে বৃষ্টি প্রায় লেগেই আছে। মধুমিতা আর সর্বাণী নিয়েছে ছাতা, আমি রেইনপোঞ্চ। তবে আমাদের থেকেও প্রোটেকশন বেশি দরকার মধুর ক্যামেরার। তাই ওকে বললাম রেইনপোঞ্চটা পরে ক্যামেরাটা তার ভেতরে নিয়ে নিতে। রাজি হল। ওর ছাতাটা নিলাম আমি। দূর থেকে দেখলাম ছোটোখাটো ধাপের চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পাহাড়ের বুকে। মোট ১৭৫টি ধাপ। দুপাশে গাছের ডালের মতো বাহারি কংক্রিটের রেলিং, মাঝে মাঝে  কংক্রিটের বসার জায়গা। দুপাশে বর্ষার ঘন জঙ্গল। গাছ থেকে টুপটাপ জল পড়েই যাচ্ছে। নয়তো আকাশ থেকে বৃষ্টি। আশপাশ পাহাড়ের ঢেউ দিয়ে ঘেরা, পাহাড়ের ওপরের লেভেলটা মেঘে ঢাকা। বেশ দূর থেকেই চোখে পড়ল অনেক উঁচু থেকে নিচে ঝাঁপ দেওয়া জলের প্রপাত। ওপরে উঠতে তা যখন চোখের সামনে এল তখন তার ছড়িয়ে পড়া জলকণায় আমরা নাস্তানাবুদ। অনেক উঁচু থেকে একটিই প্রচণ্ড ধারায় তীব্র গতিতে জল যেন চোখকান বুজে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। পড়তে পড়তে তার আবার হাওয়ার সঙ্গে খুনসুটি চলছে - হাওয়ার টানে জলের শরীরে আলপনা দেওয়া চলছে। দেখে মনে হচ্ছে জলপরীর সাদা ওড়নায় হাওয়ায় ঢেউ উঠেছে।‌ নিরাপদ দূরত্ব থেকে ক্যামেরা বাঁচিয়ে ছবি তোলা হল। কিন্তু সেখান থেকে দেখাই যাচ্ছে না জলপরীর পা ফেলা নাচের মঞ্চটা। সেটা আবার একটু নিচে, নামতে হবে। কিন্তু ভিজে যাব পুরো। এখানে জলের আনাগোনা সব দিক থেকে। অথচ না দেখলেও জীবন ব্যর্থ। মধুকে বললাম তুই আগে যা। ও তো পোঞ্চতে প্যাক করা। আমাদের কাছে ক্যামেরা দিয়ে ও গিয়ে ঘুরে এল। তখন ওই পোঞ্চটা আমি পরে, আপাদমস্তক ঢেকে চললাম। সঙ্গে সর্বাণী। কাছাকাছি যেতেই চশমা পুরো ঝাপসা হয়ে টপটপ জল ঝরতে লাগল। মাথার ঢাকনাটা খুলে উড়ে যাবার জোগাড়। তাকে ধরতে দুহাত তুলতেই হাতার ফাঁক দিয়ে জলকণারা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরের খবর নিতে। পৃথিবীতে যখন এই সব ঘটে চলেছে তখন অবশ্য আমি জন্নতে - দেখছি ঊর্বশী-মেনকার দ্রুত পায়ের কাজের নৃত্য শৈলী। ওই নকশাকাটা হালকা রেশমের ওড়না নিচের জল ছুঁয়েই কি প্রচণ্ড গতিতে ঘূর্ণি তুলে হৈ হৈ করে ছুটে চলেছে দিকবিদিকশূন্য কে জানে কোথায়! এ সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কি দেখিলাম! কি দেখিলাম!! চর্মচক্ষু সার্থক হইল!!!





জুলাই ৪, ২০২৫ (৩)

এবার গন্তব্য গোনাসিকা। কেওনঝড় থেকে এর দূরত্ব ৩৩ কিমি। আমরা অবশ্য আসছি খণ্ডধার থেকে। সাধারণ বিশ্বাসে বলে এখানে পাহাড়ের ওপর গোরুর নাসিকা থেকে বৈতরণী নদীর জন্ম হচ্ছে। এটাই বৈতরণীর উৎস। এখানেও সিঁড়ি ভাঙা। ধাপের সংখ্যা ১৪৮। ওঠা নামায় দ্বিগুণ। এখানেও নিচু ধাপের চওড়া সিঁড়ি, কোথাও কোথাও মাথার ওপর ছাউনিও আছে। আশপাশে ঘন পাথুরে জঙ্গল। সেখানে এপাশ ওপাশে পাথরের ফাঁক দিয়ে ছোটো ছোটো জলের‌ ধারা বইছে। ওপরে উঠে একটি ছোটো ঘরের মতো মন্দির। তার সামনে নন্দীর অবস্থান। ভেতরে একজন পূজারী রয়েছেন। কয়েকটি দেবদেবীমূর্তী। একটি গোমুখ। তার নাসিকার দুই ছিদ্র দিয়ে অবিরাম জলের ধারা বয়ে চলেছে। আর আছে একটি গাছ, যাকে বলে বৃক্ষ। সেটি দুভাগ হয়ে ঘরের জানলা ফুঁড়ে দুই বিপরীত দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তারপর কোন গাছের দু'ডালের ফাঁকে নিজের ভার রেখে গলে গিয়ে, কোন গাছের গলা জড়িয়ে, আবার কার প্রায় কোলে চড়ে সে এক বিচিত্র বিস্তারে নিজেকে মেলে‌ ধরেছে। বহু প্রাচীন বৃক্ষ। কি গাছ জানিনা। ওই মন্দির কাম ঘরের মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট বস্তুই বেশি, বৃক্ষটি ছাড়া। তবে গতকাল যে বৈতরণী দেখে এসেছি ভীমকুণ্ডে তার উৎস এই গোনাসিকার ধারা বললে তেমন বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। হয়ত এই ধারাটিও বৈতরণীর অংশ হয়েছে, যার থেকে ভক্তজনের বিশ্বাসে এটাই উৎস হয়ে গেছে। ভক্তি আর যুক্তি তো হাত ধরে চলে না। অতএব ভক্তিতে কি না হয়! নামার সময় পাহাড়ের এক গুহার মুখও দেখলাম।





জুলাই ৪, ২০২৫ (৪)

এরপরের গন্তব্য সানাঘাগরা, যেটি পান্থনিবাস থেকে মাত্র ৫ কিমি দূরত্বে। সানাঘাগরাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পার্ক, পিকনিক স্পট, সেখানে জলাশয় আছে, তার মাঝখানে শিব বসে আছেন,  নিমীলিত চোখ। তাঁকে ঘিরে বোটিং -এর ব্যবস্থা। বোট ওল্টালে শিব চোখ খোলেন কি জানা নেই, তবে অল্প সাঁতরে তাঁর কোলে উঠে পড়া যায়। পার্ক সাজানো। কয়েকটি খাবারের দোকান আছে। প্রচুর আচার সাজানো থরে থরে। এসব ছাড়িয়ে আরও খানিক এগোলে সিঁড়ি শুরু। এখানে প্রথমে ওঠা, তারপর শেষের দিকে নেমে জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছনো। ধাপ মোট ১৭০। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চওড়া,নিচু নিচু ধাপ। যত অবধি উঠতে হয় সেই উচ্চতায়ও বিশাল পার্ক, সেখানে আছে সানাঘাগরা নেচার ক্যাম্প। থাকা যায়, তবে আমরা তো অতটা সময় পকেটে নিয়ে আসিনি। অতএব সানাঘাগরা দেখে ফেরা।

চড়াই পেরিয়ে উৎরাই সিঁড়ির শেষে বাঁদিকের পাথরের ফাঁক ফুঁড়ে বুলেটের মতো প্রবল শক্তি ও গতিতে জলপ্রপাতের আত্মপ্রকাশ। তারপর প্লাঞ্জপুলে ঘূর্ণি তুলে প্রবল বিক্রমে কয়েক মিটার এগিয়েই একটা বটলনেকের মতো পাথরের খাঁজ দিয়ে আবার কয়েক ফুট নিচে আছাড় খেয়ে আরেকবার ফুঁসে উঠছে। দুটো লেভেলে জলপ্রপাত। তীব্র গতিশক্তির। সিঁড়ির নিচের চত্বরে দাঁড়ালে ১৫ সেকেন্ডে আধাভিজে। বর্ষার ফুল ফ্লাশ প্রপাতের কি ভীষণ সৌন্দর্য! সানা মানে ছোটো। গুগল বলছে এটি সান মছকন্ডন নদীর ওপর একটি ছোটো জলপ্রপাত। নদীর নামের উচ্চারণ ঠিক লিখলাম না ভুল তা জানিনা, তবে জলপ্রপাতটি যে বর্ষায় আদৌ ছোটো নেই সেটা একশো ভাগ খাঁটি।

বৃষ্টির ঝিরি ঝিরি তো চলছেই। তারই মধ্যে এগরোল খেয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম বড়াঘাগরার দিকে।

সানাঘাগরা পার্কে প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ২০/-, আর ড্রাইভারসহ গাড়ির ৫০/-।





জুলাই ৪, ২০২৫ (৫)

সানাঘাগরার পার্ক থেকে বেরিয়ে হাইওয়ে পেরিয়ে বড়াঘাগরা যাবার রাস্তায় ঢুকতে হয়।‌ প্রায় ৫ কিমি। গুগল বলছে এটাও মচ্ছকন্ডন নদীর ওপর। ঠিক কি ভুল জানিনা। বড়াঘাগরার প্লাঞ্জপুলটি বিশাল। দেখে বোঝা যায় আগে বড়াঘাগরা সত্যি বড়ো ছিল, এখন সে তুলনায় ক্ষীণতনু। প্রায় ৬০ মিটার উঁচু থেকে ঝর্ণার জল নামছে। আগে যতগুলো জলপ্রপাত দেখে এলাম সে তুলনায় একটু দুবলা-পাতলা। জলের ধারার পেছনের পাথর এখানে দৃশ্যমান। এই দৌর্বল্যের কারণ হল বাঁধ। ঝর্ণার ওপরে এক বিশাল রিজার্ভার রয়েছে, সেখান থেকে জল নিয়ন্ত্রিত হয়ে ঝর্ণার পথে যাচ্ছে। ঝর্ণার প্লাঞ্জপুল থেকে ওপর অবধি সিঁড়ির ধাপ ১২২টি। আর ওই লেভেল থেকে রিজার্ভার অবধি আরও ৭৫টি। ৭৫ ধাপ উঠে, রিজার্ভার দেখে, আবার নামতে হয়েছিল। তবে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার ওই লেভেলে উঠে গিয়েছিল বলে ১২২ ধাপ আর নামতে হয়নি। বড়াঘাগরায় গাড়ির এন্ট্রি ফি ৫০/-। সারাদিনের পরে এবার পান্থনিবাসে ফেরা। আজ রাতে চাইনিজ - এগচাওমিন ও চিলি চিকেন।

কেওনঝড় (জুলাই ৩, ২০২৫ (১, ২, ৩ ))

 কেওনঝড়

জুলাই ৩, ২০২৫ (১)






মেঘ না চাইতেই জলের মতো কাল রাতে চেন্নাই মেলে উঠে দেখি আমাদের তিনজনেরই লোয়ার বার্থ! ঘটনাটা হল আমাদের প্রাণ কাঁদছিল বর্ষায় বেড়ানোর জন্যে। দুটো প্ল্যান ক্যানসেল হল - একটা বুকিং সমস্যায়, অন্যটা তাপমাত্রার পায়ে গড় করে। ৩ নংএ আছে কেওনঝড়। কিন্তু টিকিট কাটার আগের দিন কম্পুটারে আঁতিপাতি খুঁজেও রাতের কোনো ট্রেনে জুলাইয়ে ১৮ পর্যন্ত ওয়েটিং লিস্টে ১৭-র নিচে কোনো টিকিট দেখলাম না। সেটা জানিয়ে দিলাম মধুমিতা, সর্বাণীকে। এই ট্যুরে, যদি ট্যুর হয় তো তবে ৩য় জন আমি। টিকিট করবে মধুমিতা। পরেরদিন বিকেলে মধুমিতা জানালো - টিকিট হয়ে গেছে। চেন্নাই মেল, কনফার্মড। হল কি করে?! ২টো হয়েছে সিনিয়র সিটিজেন কোটায়, ১টা সিংগল ওম্যান কোটায়, তবে সব এক কম্পার্টমেন্টেই। 

গতকাল, জুলাই ২-এ ট্রেন ছেড়েছে হাওড়া স্টেশন থেকে রাত ১১.৪৫-এ, একেবারে রাইট টাইম। তারপরই মেঘ-জলের চমৎকারিত্ব। ট্রেনে উঠেই শোয়ার পর্ব। আমাদের কম্পার্টমেন্টের এসি এতই বেশি ঠাণ্ডা যে বোঝা যাচ্ছে না তার দায়িত্বটা কি - জ্যান্ত মানুষ তাজা রাখা, না মরা মানুষ তাজা রাখা। যাই হোক, সেই ঠাণ্ডায় মাথা ঠাণ্ডা হতে এটা স্পষ্ট হল যে টিকিটটা মন দিয়ে দেখলে ও তার সঙ্গে কোন কোটার টিকিট সেটা লজিকালি যোগ করলে আগেই বোঝা যেত যে আমাদের লোয়ার বার্থ পাওয়াই স্বাভাবিক। তবে অত ভাবাভাবি করলে আজকের সারপ্রাইজ বেচারা মাঠে মারা যেত!

ভোর ৪.৩০-য়, একেবারে রাইট টাইমে ট্রেন নামালো জাজপুর কেওনঝড় জংশন স্টেশন। আকাশ অন্ধকার। স্টেশনের মহিলা ওয়েটিং রুমে শুধুই আমরা। প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে তৈরি হয়ে, সর্বাণীর করা কেক খেয়ে, চায়ের খোঁজে গিয়ে স্টেশনপরিস্কাররত কর্মীর থেকে শুনলাম প্ল্যাটফর্মের মা ভবানী চায়ের দোকানটি খুলবে ৬টায়, কারণ তার মালিক দোকান বন্ধ করে শুয়েছে সাড়ে তিনটেয়! জাজপুর জংশন স্টেশন, লম্বা প্লাটফর্ম, পরিচ্ছন্ন, দুটি ওভারব্রিজ, লিফট আছে। কিন্তু ঝাঁ চকচকেওলা নাকউঁচুপনা নেই। প্লাটফর্মের কালো পাথর বাঁধানো বসার জায়গাগুলো দেখলে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

আলো ফুটলো। আমাদের গাড়ি এলো। আগেই বুক করা ছিল। স্টেশন থেকে পিকআপ, দুদিন সব দ্রষ্টব্য ঘুরিয়ে দেখাবে, তৃতীয় দিনেও দুটো জায়গা দেখিয়ে স্টেশনে ড্রপ করবে। স্করপিও  জিপ, নেবে সাড়ে বারো হাজার। চালকের নাম তপন। প্রায় ছটা নাগাদ যাত্রা শুরু। পথে গাড়ি থামিয়ে চা-বিস্কুট।

প্রথম দ্রষ্টব্য মা তারিণী মন্দির। বিশাল খোলামেলা মন্দির, তার আরও বিশাল চত্বর। মন্দিরের মাঝখানের গোল চত্বরে মূর্তি। প্রতিষ্ঠিত শীতলা ঠাকুরের মতো - গোল পাথরে টকটকে লাল রঙের ওপর সোনালী ধাতুর চোখ-নাক-মুখ। অবয়বের কোনো ফর্ম নেই। সেই গোল ঘিরে বিশাল চওড়া খোলা গোল বারান্দা। সেখানে ভিড় সামলানোর স্টিলরডের ভক্ত-চ্যানেল, গেট সবই আছে। আমরা যখন গেছি তখন একেবারেই ফাঁকা। ঠাকুরকে ঘিরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ৪/৫ জন পুরোহিত বসে। তাঁরা ভক্তদের থেকে ডালা নিয়ে পুজো করে তাদের হাতে ফেরৎ দিচ্ছে। তাঁদের প্রত্যেকের সামনেই ঠুকে নারকেল ভাঙার একটা করে লোহার যন্ত্র। সেগুলি থেকে বিরামহীন ফটফট শব্দ হয়েই চলেছে। নারকেল সহযোগে পুজো দেওয়াই রীতি। পুরো মন্দিরটি পরিস্কার ঝকঝকে। সদ্য রেনোভেশন হয়েছে বোঝা যায়। মূল মন্দিরের দরজার বাইরে দুদিকে দুটি অসুর নিধনরত দেবীমূর্তি। সেই অসুরদের পেটের মাঝখানে ১টি করে গর্ত - কোকোনাট-বে। ওখানে নারকেল দিয়ে দিলে তা গড়গড় করে সুড়ঙ্গপথে যথাস্থানে পৌঁছে যায়! মন্দিরের বাইরের চত্বরে ১টি বিশাল কলসের ওপর ১টা উপযুক্ত মাপের ডাব - কংক্রিটের। কলসটি পানীয় জলের। তার গায়ে কল ও গাঁথা বেসিন।‌ আর বাইরের ফটকের কাছে, ভেতর দিকেই, বিনামূল্যে জুতো রাখার জায়গা। মন্দিরের গায়ে, ফটকের মাথায়, মূল ফটকে, দরজায় কারুকাজ তো আছেই।







জুলাই ৩, ২০২৫ (২)

এবার তারিণী মন্দির থেকে ১২ কিমি দূরের ঝর্ণা গুণ্ডিচা ঘাই বা ঘাগি। জাজপুর থেকে কেওনঝড়ের দূরত্ব ১১৪ কিমি মতো। পথ এনএইচ ২০ আর স্টেট হাইওয়ে। এই দূরত্ব অতিক্রম করার পথে আশেপাশেই পড়ে তারিণী মন্দির, গুণ্ডিচা ঘাই আর ভীমকুণ্ড। আমরা এই তিনটে তাই যাবার পথেই দেখব আজ।

গুণ্ডিচা ঘাই একটি ঝর্ণা মহেন্দ্রতনয়া নদীর ওপর। নায়াগ্রা বা ভারতের আথিরাপল্লীর ছোটো সংস্করণ এটি। এর উচ্চতা ও প্রস্থ দুইই আছে। জল অনেকগুলি ধারায় ভাগ হয়ে উঁচু থেকে পড়ছে। তার আগে নদীর আসছে বেশ খানিকটা প্রায় সমতল পাথুরে ভূমি পেরিয়ে। এই বর্ষায় ঝর্ণার ফুল ফ্লাশ। সুন্দর বাঁধানো সিঁড়ি রেলিংসহ নেমে গেছে ঝর্ণার নিচে অবধি। বাতাসে জলকণার হুড়োহুড়ি। সিঁড়ির ধাপে পাঁচ মিনিট দাঁড়ালে নিজে স্যাঁতস্যাঁতে পাঁপড় হয়ে যাবে। ওখানে ছবি তোলা হল - সে ছবিতেও জলকণা আমাদের ঢেকে দিচ্ছে। সিঁড়ি থেকে উঠে ঝর্ণার সামনে, ক'হাত দূরেই একটা তিনতলা ভিউ পয়েন্ট। আরও আছে ঝর্ণার নিচে যে নদীটা তৈরি হচ্ছে সেটার ওপর দিয়ে একটা ব্রিজ। সেই ব্রিজের এক পাশেও ভিউ পয়েন্ট, সেখান থেকে দেখা যায় ঝর্ণার শুরুর আগের পাথুরে পথটাও। আশপাশে কয়েকটা দোকানপাটও আছে, তবে কিছুই খোলেনি তখনও। কি অনাবিল সৌন্দর্য তাই!




জুলাই ৩, ২০২৫ (৩)

এবার ভীমকুণ্ড। প্রথমে ১২ কিমি গিয়ে আবার তারিণী মন্দির। তার আশপাশে কোথাও ব্রেকফাস্ট করে ভীমকুণ্ডের পথে। রাস্তার ধারে বড় হোটেলের একটা আউটলেট - স্টিলের কাউন্টার - গরম গরম খাবার সার্ভ করছে। আমরা ইডলি আর ধোসা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম।

ভীমকুণ্ডে প্রবেশমূল্য ১০/-। বড় গেট, ঢোকার লোহার রিভলভিং দরজা, ওয়েটিং রুম, পরিস্কার টয়লেট। আর ভেতরে ঢুকে লম্বা একটা ব্রিজের শেষে তিনতলা ভিউ পয়েন্ট। প্রত্যেকটা তলার চারপাশ ঘিরে বারান্দা। ঘুরে ঘুরে ভীমকণ্ডের পুরোটা দেখার জন্যে। 

ভীমকুণ্ড ভীমের মতোই বিশাল। বৈতরণী নদী বয়ে আসছে প্রস্তরসঙ্কুল নদীখাত ধরে। তারপর পাথরের ওই রকম ফর্মেশনের কারণে অজস্র ধারায় ভাগ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা ধারাই পাথরের অসমান লেভেলে লাম্ফঝম্প করে একটা আরেকটার সঙ্গে মিশছে। সবশেষে বড় বড় দুতিনটি ধারায় জড়ো হয়ে বড় বড় দুতিনটি প্রচণ্ড স্রোতের সঙ্গম। এই বর্ষায় প্রতিটি ধারাই অত্যন্ত সজীব। ভীমকুণ্ডের বিশাল বিস্তার, কিন্তু উচ্চতা নেই। স্রোতের তীব্রতা যেন বাঁধের ছাড়া জল। আর এই এত সৌন্দর্যের ফ্রেমের চারিদিকে ঘন সবুজ জঙ্গলের পাড়। অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতি!

এবার গন্তব্য ওডিশা টুরিজিমের পান্থনিবাস, কেওনঝড়। আমরা সেখানে থাকব আগামী দুদিন। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় একটা বাজল। শহরের একটু বাইরে, হাইওয়ের ওপর, পেছনে পাহাড়ের চালচিত্রে খোলামেলা পান্থনিবাস। প্রচুর গাছপালা। এখান থেকে গুণ্ডিচা ঘাই ৫৬ কিমি, আর ভীমকুণ্ড ৫০ কিমি। আজকে আর ডেরার বাইরে নয়। বিশ্রাম। বিশ্রামের সময় কথায় কথায় চলে এল নন্দিনীর কথা। ওরও আসার কথা। ছিল। কিন্তু পাকেচক্রে জড়িয়ে আটকে গেল! আমরা মিস করছি। ওও করছে নিশ্চয়ই।সর্বাণী লুডোর বোর্ড এনেছে। চারজন হলে ভালো হয়। ওকে যে অনলাইনে ডাকব তারও ভরসা নেই, কারণ এখানে কানেকশন এই আছে, এই নেই!

Monday, October 23, 2023

অথ ফার্স্টক্লাসকথা (22/10/23)

অথ ফার্স্টক্লাসকথা


 আমার বন্ধু সপরিবারে রাজস্থান ভ্রমণে যাচ্ছেন আপাতত একটি ইচ্ছাপূরণের আনন্দ নিয়ে। ভ্রমণ শেষে ফিরবেন ডবল ইচ্ছাপূরণের তুরীয়ানন্দে ভরপুর হয়ে। ২য় ইচ্ছাপূরণ তো রাজস্থান ভ্রমণ। আর ১মটি হল রেলের ফার্স্টক্লাস এসিতে ভ্রমণ। তাঁর এই বার্তাই আমার অনেক স্মৃতিকে উসকে দিল আর আমিও কিছু কথা উগরে দিলাম।


আমাদের ছোটোবেলায় রেলে এসির আবির্ভাব কি হয়েছিল? ফাস্টোকেলাশ ছিল। একবার সেই ফাস্টোকেলাশে বাঁকুড়া গিয়েছিলাম। পিসতুতো দাদার সঙ্গে দাদার শ্বশুরবাড়িতে। সেই দাদা তখন রেলের উঁচু কেলাশের টিটিই। সেদিন  অবিশ্যি দাদার রথ দেখা কলাবেচা দুইই ছিল, নাকি শুধুই বৌ দেখা ছিল তা আর আজ মনে নেই। অন-ডিউটি দাদার সঙ্গে একবার পুরী গেছিলাম - রথ দেখা-কলাবেচা সিস্টেমে। তবে সেবার কোন কেলাশে তা মনে নেই। সে সব সুদূর শৈশব! তার পর প্রথম এরোপ্লেন চড়া! ইস্কুল থেকে ১৫আগস্ট বা ২৬ জানুয়ারি, মনে নেই সঠিক। শুধু মনে আছে অনেক গর্জনসহ যখন আকাশে উড়লাম তখন গতিবেগের অংক গুলিয়ে ফেলে নিচের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখে ভেবেছি এটা কি তাজমহল! সে ছিল ১৫ মিনিটের অভিজ্ঞতা! তারপর দেখলাম আস্তে আস্তে রেলের জানলা সিল হল শীত ও আতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য। তখন আমরা পাবলিক প্লেসে শুধু ট্র্যাফিক নয় তেজ ও মরুৎ এই দুই ভূতকেও কন্ট্রোল করা শুরু করলাম। এর সঙ্গেই শুরু  হল শ্রেণীবিভেদের যুগ - দুনম্বর এসি, তিননম্বর এসি, এসি চেয়ারকার আর ফাস্টোকেলাশ এসি। আমার আওতায় তখন চেয়ারকার আর তিননম্বর। তবে স্টেশনে কেউ যদি টা টা করতে আসত তখন আমার খুব দুঃখ হত জানলা খুলে গল্প করা আর চাকা গড়াতে শুরু করলে শেষবার হাত মেলানো যায় না বলে। তাছাড়া সারা পথ জুড়েই জানলার রডের ফাঁক দিয়ে চায়ের ভাঁড়, কলার ছড়া, ছোলা-পিঁয়াজ বা লুচি-আলুর তরকারির শালপাতার ঠোঙা গ্রহণ-বর্জনেও নিষেধাজ্ঞা জারি হল। এর আগের যুগে স্টেশনে নামা সহযাত্রীর দিকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিলে সেটাও ঐ চ্যানেলে যাতায়াত করেই ভরে উঠত। হ্যাঁ, তখনও দ্বিতীয় ভূত অপ আমাদের হাতে বোতলবন্দী হয়নি। এর পরের যুগ ওড়ার যুগ।  যখন মহীশূরের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অভ ইন্ডিয়ান ল্যাংগুয়েজেসের আমন্ত্রণে ওঁদের আয়োজিত উইন্টার স্কুলে  টিউটরিং করতে যাচ্ছি ওঁরা বললেন উড়ে আসতে। সে কি আনন্দ! তখনও কিন্তু  চাকুরিক্ষেত্রে পদমর্যাদা অনুযায়ী আমার যত্রতত্র ওড়া ধার্য হয়নি। ওই উইন্টার স্কুল ছিল আন্তর্জাতিক স্তরের, দেশ-বিদেশ থেকে বহু বিদ্বান বিশেষজ্ঞেরা উড়ে আসবেন। সেখানে আমি দুদিন ধরে রেলে চড়ে বিধ্বস্ত হয়ে এসে হাজির হব, সেটাতে হয়ত তাঁদের সম্মানহানি হত, তাই আমাকে উড়তে বলা! তা সে যে কারণেই হোক উড়ে যাওয়ার কথা শুনেই আমি তো মনে মনে উড়ছিই। এরপর হাতে এল ওড়ার টিকিট - উঁহু, এখনকার মতো দৃশ্য-স্পর্শ-গন্ধহীন নয় মোটেই। ব্যাংকের চেকবইয়ের মতো বাঁধানো চার পাতার চকচকে ঝকঝকে টিকিট - কভার পেজে স্বাগত-ভঙ্গিমায় এয়ার ইন্ডিয়ার জমকালো মহারাজা! বাগে পেয়েই মহারাজাকে চকাস চকাস করে কটা চুমু খেয়ে নিলাম। এদিকে তো তখন হরিণাম চলছে পড়াশুনো নিয়ে। এরপরে অনেকবারই মহীশূর গেছি, প্রতিবারই উড়ানে, কারণ ততদিনে আমি উড়ানানুমতি মাফিক পদমর্যাদা অর্জন করেছি। কিন্তু প্রথমবারের মতো এমন থ্রিলিং আর কখনও লাগেনি। আর এরপর তো উড়ান-ব্যবসায়ে যুগান্তকারী বিবর্তন এসে উড়ান ব্যাপারটাই বহু মানুষের পকেটের নাগালে চলে এল! এখন তো প্রায়শই দেখা যায় রেলের ফাস্টোকেলাশ  এরোপ্লেনের চেয়েও দামি! তার ওপর রেল আবার খাবার-দাবারের ছুতমার্গে বিচরণ করে। ফলে এত নিরামিষ ভ্রমণ, হজম হওয়া কঠিন! রেলভ্রমণের যুগবিভাগে কাঁচের সিল করা জানলা যদি আধুনিক যুগ হয় তো নিরামিষ ফাস্টোকেলাশকে অনায়াসে উত্তর-আধুনিক আখ্যা দেওয়া যেতেই পারে। 

এ পর্যন্ত অনেক ছড়ালাম। এবার একটু গোটাতে চেষ্টিত হই। ২০১৮ সাল, বেড়াতে গেছি শ্রীলংকা। ২০১৮ মানে পৃথিবীতে তখন কোভিড-পূর্ব যুগ চলছে এবং ভারতীয় রেলের আধুনিক যুগ। আমরা তিনমূর্তি - আমার ইস্কুলের পায়ে-চাকা বন্ধু মধুমিতা, আমার ছোটো বোন যার পায়ে চাকা থাকলেও তার চাকুরির সৌজন্যে হুট বলতে তা পাংচার হয় সেই কাজল আর আমি। আমাদের তিনজনেরই দৃঢ় ধারণা যে মোটামুটি সারা পৃথিবী জুড়ে না হোক অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় এখন রেলের আধুনিক যুগ চলছে এবং সেটা ভারতীয় রেলের মডেলেই। আমরা ফিরব শ্রীলংকার দক্ষিণের শহর মাতারা, তারাপীঠের ব্রাঞ্চ নয় কিন্তু, থেকে কলম্বোয়, রেলে চড়ে। টিকিট করতে গিয়ে দেখলাম ফাস্টোকেলাশ আর ২য় শ্রেণী আছে। ফাস্টোকেলাশের টিকিটও রয়েছে। দামের তফাৎ অনেকটা থাকলেও আমাদের সাধ্যের মধ্যেই ফাস্টোকেলাশ। তাছাড়া ওটাই আমাদের ভ্রমণের অবশিষ্টাংশ, এর পর ঘরে ফেরা, হাতে যা টাকাকড়ি আছে তাতে শখটা মেটানোই যায়। অতএব কালবিলম্ব না করে ফাস্টোর টিকিট বুকিং করা হল। ট্রেন যাবে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে। তেমন গরমের দিন না হলেও হিউমিডিটি যথেষ্ট বেশি। ফাস্টোতে আরামে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে কলম্বো পৌঁছে যাব। নির্দিষ্ট দিনে মালপত্তর ও অশেষ উত্তেজনা নিয়ে ইস্টিশনে দাঁড়িয়ে আছি ট্রেনের অপেক্ষায়। জিগেস করে জেনে নিয়েছি প্ল্যাটফর্মের কোথায় অবস্থান করবে ফাস্টো। তবে শান্তিনিকেতন-কলকাতা যাতায়াতের পথে এসি চেয়ারকারের যে চাহিদা আর ভীড় দেখেছি তার কিছুই এখানে নেই। এবার ট্রেনে ওঠার পালা। ফাস্টোকেলাশ হল ট্রেনের একদম সামনে, ইঞ্জিনের পরেই। দূর থেকে কামরার গা দেখে আলাদা করে চেনা যায় না তার ফাসটোত্ব। উঠলাম। পুরো ট্রেন জোড়া ২য় শ্রেণী দেখতে দেখতে প্ল্যাটফর্ম পেরিয়েছি - গদি আঁটা লম্বা লম্বা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সিট, সব কামরাই প্রায় ফাঁকা। ফাসটোতে চেয়ারকারের মতো দুদিকে ভাগ করা ছোটো ছোটো সিট। দেওয়ালে ছোটো ছোটো দেওয়াল পাখা। জানলা সিল করা নয়। এসি???? না, শ্রীলংকার রেলে এখনও আধুনিক যুগ আসে নাই! তাহলে ফাসটোর বিশেষত্বটা কি? টয়লেট আছে। সে তো সব কামরাতেই আছে। আর আছে কামরার শেষভাগে একটা বেশ বড়োসড়ো লাগেজরুম। সেখানে ব্যাগপত্তর রেখে যাত্রীরা ঝাড়াহাতপা হয়ে নিজের সিটে পাখার হাওয়া খেতে খেতে কোস্টাল সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ভ্রমণ করবেন। কয়েকটা জানলায় অক্ষত পর্দা আছে, বাকিরা বঞ্চনার শিকার। যাদের পর্দা আছে তাদের আবার পর্দার তার ঢিলে, ফলে পুরো পর্দাটি জড়ো হয়ে মাঝখানে ঝুল্যমান। কয়েকটি পাখা চালু, বাকিরা অচল অনড়। এখন দুপুরের মার্তণ্ড মাথার ওপরে। পরে তিনি পশ্চিমমুখী হবেন। তখন বাঁদিকের জানলা দিয়ে উপকূলীয় সৌন্দর্যের সঙ্গে রোদ ফ্রি। ডানদিকের সারিতে সমুদ্র না থাকলেও ফ্রি কিন্তু ফ্রিলি তার স্পর্শ বুলিয়ে যাবে। আমরা তিনমূর্তি ছাড়া আর জন চারেক যাত্রী, তারাও বিদেশি, তারা বিতর্কবিহীনভাবে হয় সাদা নয় কালো, আমাদের মতো দুরঙের মিশেলে 'যে জন আছে মাঝখানে ' মার্কা নয়। তবে বাইরের রঙে যতই তফাৎ থাক মগজে যে সবাই এক গোত্রীয় তা বলাই বাহুল্য! এই হল রাবণীয় ফাস্টোকেলাশ! অসীম হতাশা নিয়ে লটবহর আশপাশেই গুছিয়ে নিয়ে জানলার পর্দা হাত দিয়ে টেনে রোদ্দুর আড়াল করে সিটে থিতু হলাম। কামরা এতটাই ফাঁকা যে পেছনের অদৃশ্যমান লাগেজরুমে জিনিসপত্র রাখাটা সমীচীন বোধ হল না। ট্রেন ছাড়লো। খানিক পরে বোঝা গেল ইঞ্জিনটি কয়লার। ফাস্টোকে সীমাহীন ধোঁয়া ও কয়লার গুঁড়ো উপহার দিতে সে না চাইতেই কল্পতরু। তার সঙ্গে আছে মাঝেমাঝে ঘটঘটঘটঘট করে পিলে চমকানো শব্দ। ইঞ্জিন যেন বিদেশী অতিথিদের দুহাতে কালো হীরের দ্রব্যগুণ উপহার দিতে দিতে অট্টহাস্য করতে করতে চলেছে! 

সব জিনিসেরই ভালোমন্দ আছে। শুধু একদিকের আখ্যান শোনালে তো সবাই একচোখো বলবে। কিন্তু আমার তো দুটোর জায়গায় চারটে চোখ। তাই একটু অন্যদিকে দেখি।

দুপুর থেকে বিকেল অবধি অনেক ঘাম ঝরিয়ে, হাঁসফাঁস করে, নানা বিভঙ্গে রোদ এড়িয়ে, কয়লা-কজ্জলিত চোখ রগড়ে শেষ অবধি বিকেলের মরা রোদে যে সূর্যাস্তটি সেটা কিন্তু সত্যিই ফাস্টোকেলাশ!  রঙ ছড়িয়ে আকাশ আর সমুদ্দুরকে একাকার করে শ্রীলংকার সুয্যিদেব এক পা এক পা করে পাটে নামতে নামতে টুপ করে ডুব দিলেন। কি অপূর্ব কি অপূর্ব! এই পাওয়াটা সব কষ্ট পুষিয়ে দেয়। যদিও দ্বিতীয় শ্রেণী থেকেও একই দৃশ্য একই ভাবে দেখা যেত! 


ফাস্টোকেলাসের ধরনধারন দেখে কাজল খানিকটা শোকে-তাপে মুহ্যমান ছিল। আর মধু কয়েকবারই বলেছিল - চল, পেছনের কোনো কামরায় চলে যাই। আমি একটুও রাজি হইনি। প্রেস্টিজ কা সওয়াল বলে কথা! ফাস্টোর টিকিটে সেকেন্ডে চড়েছি - দেশে ফিরে এই গল্প করলে লোকে হয়তো ভাববে নামিয়ে দিয়েছে! তার চেয়ে একটু কষ্ট করে ফাসটোতেই শেষ অবধি  টিঁকে থাকতে পারলে ফিরে তো কলার তুলে বলতে পারব! তবে কলার তোলাটা আগেই হয়ে গেছে, বলে ফেলাটা আজ সারলাম। এটা কনফিডেনশিয়াল - পাঁচকান না হলেই ভালো!

Sunday, October 22, 2023

আমার পঞ্চমীযাপন (2023)

আমার পঞ্চমীযাপন


এদিকে সবাই সারারাত ধরে সম্বচ্ছরের মর্নিং ওয়াকে নেমে পড়েছে। আমিই বা পিছিয়ে পড়ি কেন? একে আনন্দবাজার পড়ি না। দুইয়ে কোনো পিছিয়ে পড়ার কম্পিটিশনও হচ্ছে না। তিনে ভীড়ে গা মাসাজ করি না। এই তিন যেন ত্রিনয়নে চোখ মেরে দুয়ো দিচ্ছে! কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়! তাই সকাল পৌনে ছটা নাগাদ বাজারে যাবার পার্সটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বিকে পাল অ্যাভিনিউয়ে দাঁড়িয়ে আছি, একটা বাস চাই, হাওড়ার বাস। আশপাশে দেখছি কত স্কুটি চড়া দম্পতি, বন্ধু জোড়ায় জোড়ায় এসে মণ্ডপে ঢুকছে। এরা পুরোনো জামায়, আমার  মতো। অটো দাঁড় করিয়ে  হাঁটু খারাপ মা ও  ঢকঢকে বাবাকে নিয়ে মেয়ে নামছে - এরাও পুরোনো জামায়। জন চারেক এল সাইকেলে - দেখে মনে হল মিস্ত্রি বা সাফাইকর্মী। আমরা তো পোশাকেই বিচার করি। তবে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যারা নামছে তারা, বিশেষ করে তরুণীরা, একেবারে র্্যাম্পের ঝলমলানি, শুধু সারা রাতের ক্লান্তিতে একটু ম্লান। একটু দাঁড়াতে হল। একটা জানলার ধারে সিটওলা মিনিবাস পেলাম। গিয়ে নামলাম হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে স্টেশনের গা ঘেঁসে। এবার ব্রিজের দিকে হাঁটা। রাস্তা পার হতে হলে কিন্তু খুব জটিল ট্রাফিক!

শুনেছি, ছবিও দেখেছি হাওড়া ব্রিজে আল্পনা দেওয়া হয়েছে। এটা রথ দেখা। আর আজ অবধি কোনোদিন কলকাতার সিগনেচার হাওড়া ব্রিজ হেঁটে পার হইনি - এটা কলা বেচা! রাস্তা পারের জটিলতা যতদূর সম্ভব কম ঘাড়ে নিয়ে পৌঁছলাম ব্রিজের ডানদিকের মানে স্টেশনের দিকের ফুটপাতে। কি চওড়া ফুটপাত! দুদিকে রেলিং - ডানদিকে নদী, বাঁয়ে রাক্ষুসে ট্রাফিক! মাঝখানটা কিন্তু দারুণ থ্রিলিং। দেখলাম আরও কয়েকজন এমনই ছিটেল - ছবি তুলতে এসেছে ব্রিজে। আমিও কটা ছবি তুললাম। পথের দুধারে লম্বা করে আল্পনা, কদিনে কিছুটা মলিন। ছবিতে একটা বড়ো গোল সেন্টার পিসও দেখেছিলাম। কিন্তু সেটা খুঁজে পেলাম না। চাকায় চাকায় উঠে গেছে? কে জানে। কলকাতার দিকে শেষ প্রান্তে জগন্নাথ ঘাটের সিঁড়ি পেরিয়ে দেখি বাঁদিকের রেলিং আরও শক্তপোক্ত, কোনো কাটা নেই। অথচ আমি তো দক্ষিণ কলকাতায় যাব না, রাস্তা পেরোনো জরুরি। ফুলওলাদের জিগেস করতে বলল আবার ব্রিজের শুরুতে ফিরে গেলে পেরোতে পারব, নয়তো রেলিং টপকে! সামনে কোনো কাটা নেই!! রেলিং ধরে খানিক দাঁড়ালাম - পাশে একজন পুং সদ্য পেরিয়ে বস্তাটা রেলিংএ রেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, তার পেছনে আরও একটি পুং রেলিংএ চড়ে বসে আছে বস্তা সমেত। আমার সামনে একজোড়া মা-মেয়ে ওপার থেকে ছুটে রাস্তা পেরিয়ে এল। ওদের বস্তা নেই। ভাবলাম ওরা রেলিং পেরিয়ে ফুটপাতে উঠবে। নাঃ, বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝলাম বস্তাই হল রেলিং টপকানোর পাসপোর্ট। আমার পাসপোর্ট নেই! তবে আপাতত আমার আশেপাশে এরা আমাকে একটা ক্ষণস্থায়ী কভার দিচ্ছে এবং সামনে কোনো পুলিশ দেখছি না। অতএব দুগ্গা দুগ্গা বলে রেলিংএ উঠে পড়লাম। রেলিংএর উচ্চতা আমার চিবুক অবধি। চড়লাম, সামিট করে ওপাশে নেমে নিরীহতম মুখ করে মা-মেয়ের পাশে দাঁড়ালাম। এবার রাস্তা পার হওয়া। পাঁচটা রাস্তা পরপর বিছোনো। ! ৩+২ হিসেবে পেরোতে হবে। মাঝে কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা নেই, দাঁড়ালেই একেবারে ক্রিকেটের বলের মতো ছক্কা হাঁকিয়ে দেবে! ফ্লাইওভারের মুখটায়। একটায় গাড়ি বন্ধ হয় তো অন্যটায় চালু হয়। অদেখা সিগন্যালবৃন্দের শেষ ও শুরুর মাঝে যাহোক করে অক্ষত অবস্থায় পার হলাম। খানিক পরে সোবাবাজার সোবাবাজার হাঁকতে হাঁকতে যে মিনিটা এল তার গায়ে বিকে পাল লেখা দেখে উঠে পড়লাম। ওমা! একটু পরেই সেটা (নিমতলা) শ্মশান মুখী না হয়ে গণেশটকির দিকে ঘুরলো! 

- এটা বি কে পাল যাবে না?

- না, আমি কি বিকে পাল বলে হেঁকেছি?

- বাসের গায়ে যে লেখা রয়েছে?

- ক'বছর হয়ে গেল ঐ রাস্তায় যায় না।

- আমিও এই পথে রোজ যাই না।

- এটা সোবাবাজার যাবে।

- শোভাবাজার মেট্রো স্টেশন - তাই তো?

- হ্যাঁ।

- স্টেশন তো বলেননি!

- স্টেশন বলতে হবে?? ওটা কি সোবাবাজার নয়?

- না, নয়। আমায় নাবিয়ে দিন। 

মালাপাড়ার মুখে নেবে ভাবলাম আমার এক দিদিমা তো হাওড়ায় ট্রেন থেকে নেবে হেঁটেই আমাদের বাড়ি আসতেন। ছোটোবেলায় গ্রামের আরও আত্মীয়দের হাওড়া থেকে হেঁটে আসতে শুনেছি। আমিও না হয় হাঁটি আজ। তারপর গুটি গুটি পায়ে এগোতে শুরু করলাম। পথে দুবার থেমেছি । পাথুরেঘাটা থেকে জোড়াবাগানের মোড় অবধি খৈনিবংশীয়  রাজত্ব। প্রায় ৯০% দোকানেই লম্বা লম্বা তামাক পাতা হাত মেশিনে কুঁচিয়ে বিক্রি হয়। আর এই সব ডিটেলস জানতে আমার ৬৫ বছর লেগে গেল! এই অঞ্চলে এক মহিলা একটি বন্ধ দোকানের সামনের পাথরে বসে মাথা আঁচড়াচ্ছিলেন। পাশে জায়গা ছিল। সেই  বনলতা খৈনির পাশে কিছুক্ষণ বসেছি। দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে দুমুখ হেসেছি। আসবার সময় তাঁকে বলেও এসেছি। আর একবার- আহিরীটোলা প্যান্ডেলের কাছাকাছি বিকে পাল অ্যাভিনিউয়ের মাঝমধ্যিখানে এক জটিল-মস্তিষ্ক দুর্গা কোনো অদৃশ্য অসুরের উদ্দেশে অভিধান বহির্ভূত শব্দসহ প্রচুর চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছিল। হাতে একটি হ্যান্ডলবিহীন হাতপাখা।  ইচ্ছে করলেই যানজটরূপেণ সংস্থিতা হয়ে যেতে পারে। তা আমি পাশের দোকান থেকে একটা ছোটো কেক কিনে তাকে দিয়ে বললাম - এত চ্যাঁচায়? শরীর খারাপ করবে তো। কিছু খাওনি তো এখনও? এটা খাও। সে কেকের আগে থতমত খেয়ে নিয়ে কেকটা নাড়াচাড়া করতে করতে রাস্তার ধারে চলে গেল। আমিও সফল ট্রাফিক কন্ট্রোল সেরে আমাদের ঠাকুরকে সুপ্রভাত জানিয়ে বাড়ি ফিরলাম।