অথ ফার্স্টক্লাসকথা
আমার বন্ধু সপরিবারে রাজস্থান ভ্রমণে যাচ্ছেন আপাতত একটি ইচ্ছাপূরণের আনন্দ নিয়ে। ভ্রমণ শেষে ফিরবেন ডবল ইচ্ছাপূরণের তুরীয়ানন্দে ভরপুর হয়ে। ২য় ইচ্ছাপূরণ তো রাজস্থান ভ্রমণ। আর ১মটি হল রেলের ফার্স্টক্লাস এসিতে ভ্রমণ। তাঁর এই বার্তাই আমার অনেক স্মৃতিকে উসকে দিল আর আমিও কিছু কথা উগরে দিলাম।
আমাদের ছোটোবেলায় রেলে এসির আবির্ভাব কি হয়েছিল? ফাস্টোকেলাশ ছিল। একবার সেই ফাস্টোকেলাশে বাঁকুড়া গিয়েছিলাম। পিসতুতো দাদার সঙ্গে দাদার শ্বশুরবাড়িতে। সেই দাদা তখন রেলের উঁচু কেলাশের টিটিই। সেদিন অবিশ্যি দাদার রথ দেখা কলাবেচা দুইই ছিল, নাকি শুধুই বৌ দেখা ছিল তা আর আজ মনে নেই। অন-ডিউটি দাদার সঙ্গে একবার পুরী গেছিলাম - রথ দেখা-কলাবেচা সিস্টেমে। তবে সেবার কোন কেলাশে তা মনে নেই। সে সব সুদূর শৈশব! তার পর প্রথম এরোপ্লেন চড়া! ইস্কুল থেকে ১৫আগস্ট বা ২৬ জানুয়ারি, মনে নেই সঠিক। শুধু মনে আছে অনেক গর্জনসহ যখন আকাশে উড়লাম তখন গতিবেগের অংক গুলিয়ে ফেলে নিচের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখে ভেবেছি এটা কি তাজমহল! সে ছিল ১৫ মিনিটের অভিজ্ঞতা! তারপর দেখলাম আস্তে আস্তে রেলের জানলা সিল হল শীত ও আতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য। তখন আমরা পাবলিক প্লেসে শুধু ট্র্যাফিক নয় তেজ ও মরুৎ এই দুই ভূতকেও কন্ট্রোল করা শুরু করলাম। এর সঙ্গেই শুরু হল শ্রেণীবিভেদের যুগ - দুনম্বর এসি, তিননম্বর এসি, এসি চেয়ারকার আর ফাস্টোকেলাশ এসি। আমার আওতায় তখন চেয়ারকার আর তিননম্বর। তবে স্টেশনে কেউ যদি টা টা করতে আসত তখন আমার খুব দুঃখ হত জানলা খুলে গল্প করা আর চাকা গড়াতে শুরু করলে শেষবার হাত মেলানো যায় না বলে। তাছাড়া সারা পথ জুড়েই জানলার রডের ফাঁক দিয়ে চায়ের ভাঁড়, কলার ছড়া, ছোলা-পিঁয়াজ বা লুচি-আলুর তরকারির শালপাতার ঠোঙা গ্রহণ-বর্জনেও নিষেধাজ্ঞা জারি হল। এর আগের যুগে স্টেশনে নামা সহযাত্রীর দিকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিলে সেটাও ঐ চ্যানেলে যাতায়াত করেই ভরে উঠত। হ্যাঁ, তখনও দ্বিতীয় ভূত অপ আমাদের হাতে বোতলবন্দী হয়নি। এর পরের যুগ ওড়ার যুগ। যখন মহীশূরের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অভ ইন্ডিয়ান ল্যাংগুয়েজেসের আমন্ত্রণে ওঁদের আয়োজিত উইন্টার স্কুলে টিউটরিং করতে যাচ্ছি ওঁরা বললেন উড়ে আসতে। সে কি আনন্দ! তখনও কিন্তু চাকুরিক্ষেত্রে পদমর্যাদা অনুযায়ী আমার যত্রতত্র ওড়া ধার্য হয়নি। ওই উইন্টার স্কুল ছিল আন্তর্জাতিক স্তরের, দেশ-বিদেশ থেকে বহু বিদ্বান বিশেষজ্ঞেরা উড়ে আসবেন। সেখানে আমি দুদিন ধরে রেলে চড়ে বিধ্বস্ত হয়ে এসে হাজির হব, সেটাতে হয়ত তাঁদের সম্মানহানি হত, তাই আমাকে উড়তে বলা! তা সে যে কারণেই হোক উড়ে যাওয়ার কথা শুনেই আমি তো মনে মনে উড়ছিই। এরপর হাতে এল ওড়ার টিকিট - উঁহু, এখনকার মতো দৃশ্য-স্পর্শ-গন্ধহীন নয় মোটেই। ব্যাংকের চেকবইয়ের মতো বাঁধানো চার পাতার চকচকে ঝকঝকে টিকিট - কভার পেজে স্বাগত-ভঙ্গিমায় এয়ার ইন্ডিয়ার জমকালো মহারাজা! বাগে পেয়েই মহারাজাকে চকাস চকাস করে কটা চুমু খেয়ে নিলাম। এদিকে তো তখন হরিণাম চলছে পড়াশুনো নিয়ে। এরপরে অনেকবারই মহীশূর গেছি, প্রতিবারই উড়ানে, কারণ ততদিনে আমি উড়ানানুমতি মাফিক পদমর্যাদা অর্জন করেছি। কিন্তু প্রথমবারের মতো এমন থ্রিলিং আর কখনও লাগেনি। আর এরপর তো উড়ান-ব্যবসায়ে যুগান্তকারী বিবর্তন এসে উড়ান ব্যাপারটাই বহু মানুষের পকেটের নাগালে চলে এল! এখন তো প্রায়শই দেখা যায় রেলের ফাস্টোকেলাশ এরোপ্লেনের চেয়েও দামি! তার ওপর রেল আবার খাবার-দাবারের ছুতমার্গে বিচরণ করে। ফলে এত নিরামিষ ভ্রমণ, হজম হওয়া কঠিন! রেলভ্রমণের যুগবিভাগে কাঁচের সিল করা জানলা যদি আধুনিক যুগ হয় তো নিরামিষ ফাস্টোকেলাশকে অনায়াসে উত্তর-আধুনিক আখ্যা দেওয়া যেতেই পারে।
এ পর্যন্ত অনেক ছড়ালাম। এবার একটু গোটাতে চেষ্টিত হই। ২০১৮ সাল, বেড়াতে গেছি শ্রীলংকা। ২০১৮ মানে পৃথিবীতে তখন কোভিড-পূর্ব যুগ চলছে এবং ভারতীয় রেলের আধুনিক যুগ। আমরা তিনমূর্তি - আমার ইস্কুলের পায়ে-চাকা বন্ধু মধুমিতা, আমার ছোটো বোন যার পায়ে চাকা থাকলেও তার চাকুরির সৌজন্যে হুট বলতে তা পাংচার হয় সেই কাজল আর আমি। আমাদের তিনজনেরই দৃঢ় ধারণা যে মোটামুটি সারা পৃথিবী জুড়ে না হোক অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় এখন রেলের আধুনিক যুগ চলছে এবং সেটা ভারতীয় রেলের মডেলেই। আমরা ফিরব শ্রীলংকার দক্ষিণের শহর মাতারা, তারাপীঠের ব্রাঞ্চ নয় কিন্তু, থেকে কলম্বোয়, রেলে চড়ে। টিকিট করতে গিয়ে দেখলাম ফাস্টোকেলাশ আর ২য় শ্রেণী আছে। ফাস্টোকেলাশের টিকিটও রয়েছে। দামের তফাৎ অনেকটা থাকলেও আমাদের সাধ্যের মধ্যেই ফাস্টোকেলাশ। তাছাড়া ওটাই আমাদের ভ্রমণের অবশিষ্টাংশ, এর পর ঘরে ফেরা, হাতে যা টাকাকড়ি আছে তাতে শখটা মেটানোই যায়। অতএব কালবিলম্ব না করে ফাস্টোর টিকিট বুকিং করা হল। ট্রেন যাবে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে। তেমন গরমের দিন না হলেও হিউমিডিটি যথেষ্ট বেশি। ফাস্টোতে আরামে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে কলম্বো পৌঁছে যাব। নির্দিষ্ট দিনে মালপত্তর ও অশেষ উত্তেজনা নিয়ে ইস্টিশনে দাঁড়িয়ে আছি ট্রেনের অপেক্ষায়। জিগেস করে জেনে নিয়েছি প্ল্যাটফর্মের কোথায় অবস্থান করবে ফাস্টো। তবে শান্তিনিকেতন-কলকাতা যাতায়াতের পথে এসি চেয়ারকারের যে চাহিদা আর ভীড় দেখেছি তার কিছুই এখানে নেই। এবার ট্রেনে ওঠার পালা। ফাস্টোকেলাশ হল ট্রেনের একদম সামনে, ইঞ্জিনের পরেই। দূর থেকে কামরার গা দেখে আলাদা করে চেনা যায় না তার ফাসটোত্ব। উঠলাম। পুরো ট্রেন জোড়া ২য় শ্রেণী দেখতে দেখতে প্ল্যাটফর্ম পেরিয়েছি - গদি আঁটা লম্বা লম্বা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সিট, সব কামরাই প্রায় ফাঁকা। ফাসটোতে চেয়ারকারের মতো দুদিকে ভাগ করা ছোটো ছোটো সিট। দেওয়ালে ছোটো ছোটো দেওয়াল পাখা। জানলা সিল করা নয়। এসি???? না, শ্রীলংকার রেলে এখনও আধুনিক যুগ আসে নাই! তাহলে ফাসটোর বিশেষত্বটা কি? টয়লেট আছে। সে তো সব কামরাতেই আছে। আর আছে কামরার শেষভাগে একটা বেশ বড়োসড়ো লাগেজরুম। সেখানে ব্যাগপত্তর রেখে যাত্রীরা ঝাড়াহাতপা হয়ে নিজের সিটে পাখার হাওয়া খেতে খেতে কোস্টাল সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ভ্রমণ করবেন। কয়েকটা জানলায় অক্ষত পর্দা আছে, বাকিরা বঞ্চনার শিকার। যাদের পর্দা আছে তাদের আবার পর্দার তার ঢিলে, ফলে পুরো পর্দাটি জড়ো হয়ে মাঝখানে ঝুল্যমান। কয়েকটি পাখা চালু, বাকিরা অচল অনড়। এখন দুপুরের মার্তণ্ড মাথার ওপরে। পরে তিনি পশ্চিমমুখী হবেন। তখন বাঁদিকের জানলা দিয়ে উপকূলীয় সৌন্দর্যের সঙ্গে রোদ ফ্রি। ডানদিকের সারিতে সমুদ্র না থাকলেও ফ্রি কিন্তু ফ্রিলি তার স্পর্শ বুলিয়ে যাবে। আমরা তিনমূর্তি ছাড়া আর জন চারেক যাত্রী, তারাও বিদেশি, তারা বিতর্কবিহীনভাবে হয় সাদা নয় কালো, আমাদের মতো দুরঙের মিশেলে 'যে জন আছে মাঝখানে ' মার্কা নয়। তবে বাইরের রঙে যতই তফাৎ থাক মগজে যে সবাই এক গোত্রীয় তা বলাই বাহুল্য! এই হল রাবণীয় ফাস্টোকেলাশ! অসীম হতাশা নিয়ে লটবহর আশপাশেই গুছিয়ে নিয়ে জানলার পর্দা হাত দিয়ে টেনে রোদ্দুর আড়াল করে সিটে থিতু হলাম। কামরা এতটাই ফাঁকা যে পেছনের অদৃশ্যমান লাগেজরুমে জিনিসপত্র রাখাটা সমীচীন বোধ হল না। ট্রেন ছাড়লো। খানিক পরে বোঝা গেল ইঞ্জিনটি কয়লার। ফাস্টোকে সীমাহীন ধোঁয়া ও কয়লার গুঁড়ো উপহার দিতে সে না চাইতেই কল্পতরু। তার সঙ্গে আছে মাঝেমাঝে ঘটঘটঘটঘট করে পিলে চমকানো শব্দ। ইঞ্জিন যেন বিদেশী অতিথিদের দুহাতে কালো হীরের দ্রব্যগুণ উপহার দিতে দিতে অট্টহাস্য করতে করতে চলেছে!
সব জিনিসেরই ভালোমন্দ আছে। শুধু একদিকের আখ্যান শোনালে তো সবাই একচোখো বলবে। কিন্তু আমার তো দুটোর জায়গায় চারটে চোখ। তাই একটু অন্যদিকে দেখি।
দুপুর থেকে বিকেল অবধি অনেক ঘাম ঝরিয়ে, হাঁসফাঁস করে, নানা বিভঙ্গে রোদ এড়িয়ে, কয়লা-কজ্জলিত চোখ রগড়ে শেষ অবধি বিকেলের মরা রোদে যে সূর্যাস্তটি সেটা কিন্তু সত্যিই ফাস্টোকেলাশ! রঙ ছড়িয়ে আকাশ আর সমুদ্দুরকে একাকার করে শ্রীলংকার সুয্যিদেব এক পা এক পা করে পাটে নামতে নামতে টুপ করে ডুব দিলেন। কি অপূর্ব কি অপূর্ব! এই পাওয়াটা সব কষ্ট পুষিয়ে দেয়। যদিও দ্বিতীয় শ্রেণী থেকেও একই দৃশ্য একই ভাবে দেখা যেত!
ফাস্টোকেলাসের ধরনধারন দেখে কাজল খানিকটা শোকে-তাপে মুহ্যমান ছিল। আর মধু কয়েকবারই বলেছিল - চল, পেছনের কোনো কামরায় চলে যাই। আমি একটুও রাজি হইনি। প্রেস্টিজ কা সওয়াল বলে কথা! ফাস্টোর টিকিটে সেকেন্ডে চড়েছি - দেশে ফিরে এই গল্প করলে লোকে হয়তো ভাববে নামিয়ে দিয়েছে! তার চেয়ে একটু কষ্ট করে ফাসটোতেই শেষ অবধি টিঁকে থাকতে পারলে ফিরে তো কলার তুলে বলতে পারব! তবে কলার তোলাটা আগেই হয়ে গেছে, বলে ফেলাটা আজ সারলাম। এটা কনফিডেনশিয়াল - পাঁচকান না হলেই ভালো!
No comments:
Post a Comment