Sunday, June 13, 2021

 লুকোচুরি খেলার বাধাবিঘ্ন


আজ রিনার ছেলে বুবকা এসেছিল। কাল ও ফিনল্যান্ড ফিরে যাচ্ছে। তাই ওর কলকাতার স্পেশাল অ্যাট্রাকশন গল্পকে বাই বাই করতে এসেছিল। অনেক জাপটাজাপটি, কোস্তাকুস্তি, ধস্তাধস্তির পর দুজনে ঠিক করল এবার লুকোচুরি খেলবে। বুবকা দোতলার বারান্দা আর গল্পর ঘর বাদে একটা সীমানা নির্দিষ্ট করে দিল লুকোবার পরিসর হিসেবে। বারান্দা বৃষ্টিতে ভিজে, তাই ঐ দিকটা বাদ। প্রথমে চোর হবে বুবকা, লুকোবে গল্প। বুবকা ওয়ান থেকে ফাইভ অবধি গুনে খুঁজতে শুরু করবে। খেলা শুরু হল। গল্প তিনতলা যাবার সিঁড়ির চাতালে লুকিয়েছে। বুবকা জোরে জোরে গুনছে। ফাইভ বলা মাত্র ওপর থেকে প্রশ্ন - তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছো? আমরা দর্শক কাম আম্পায়াররা সবাই হেসে উঠলাম। বললাম - এরকম করে সাড়া দিলে তো ও বুঝতে পেরে যাবে তুই কোথায় লুকিয়েছিস। কথা বলবি না। দ্বিতীয় দফার খেলা শুরু। এবার শর্ত হল টেন অবধি গুনতে হবে। তাই সই। বুবকার চোখ বন্ধ। গল্প লুকোলো নান্দিকের ঘরে। বুবকা গুনতে গুনতে যেই টেনে পৌঁছলো অমনি ঘর থেকে - এবার এসো। আবার সমবেত হাসি। তখন গল্প নিজেই হালুম বলে লাফিয়ে হাজির। আবার তাকে বোঝানো - ওরে, মুখ বুজে চুপ করে লুকিয়ে থাকবি যতক্ষণ না তোকে খুঁজে পায় বুবকা। তখন সে বলে - আমার তো অন্ধকারে ভয় করে! তখন পরামর্শ দেওয়া হল - সব ঘরে আলো জ্বেলে দে তাহলে। শুনে বলে- তাহলে আর লুকোনো হবে কি করে! অগত্যা অন্য খেলায় সুইচ ওভার!

09/06/2021

 একটি অকরুণ করোনা কাহিনি


আজ সকালে আমার পিসতুতো দাদাকে ফোন করলাম। দাদার করোনা হয়েছিল। উপসর্গ ছিল পেট ছেড়ে দেওয়া এবং অসম্ভব দুর্বলতা। বয়স ৮0র এপাশ ওপাশ। ভ্যাকসিনের দুটো ডোজই যথাসময়ে নেওয়া হয়েছে। 4/5 দিন বেলভিউতে কাটিয়ে দুদিন আগে বাড়ি ফিরেছে। বাড়িতে দু ছেলে, দু বৌমা, একটি নাতি। বৌদি অনেক আগেই গত। দাদার বাড়িটা নিজস্ব, নিজের করা, হলেও সে কিন্তু গাড়ি-পাইপ-ড্রেসিংগাউন-শাওয়ার-টাওয়েল-ব্রেডবাটার- ওমলেট-পোচ-অ্যাটাচডবাথ অভ্যস্ত বেলভিউ পাব্লিক নয়। বরং দাদার ক্লাস হলো সাইকেল-রুটি-গুড়-মাখন-পাঁউরুটি-মামলেট-তেল-গামছা-মগ-বালতি-পাতকো-গঙ্গায়ডুব-হেগো-শকড়ি-আঁশ- এঁটো সমন্বিত। দাদা কোনোদিন হাসপাতালে যায়নি, লকডাউনের আগে অবধি সাইকেলেই আত্মীয়-বন্ধুদের খোঁজ খবর নিত। খাটিয়ে মানুষ ছিল। কারুর কাছে টাকা ধার নিতে বাধ্য হলে শোধ না করা অবধি নিশ্চিন্তে ঘুমোতো না। খাওয়াদাওয়ার জোরালো পছন্দ অপছন্দ বা লাক্সারি কোনোটাই নেই। পরারও না। নিয়মিত কোনো ওষুধ খেতে হয়না। ডাক্তারের কাছেও যায় না। পাড়ায় এক দাঁতের ডাক্তার আছেন। তার কাছে অন্য নানা কাজে গেলেও চিকিৎসার জন্যে কখনো যায়নি। আর আছে ডাক্তার মামাতো বোন। কোনো অসুবিধে হলে তার সঙ্গে গল্পসল্প করে, তবে ওষুধপত্রে ভরসা করে না। পায়পায়ের সমস্যা আছে, হাঁটু থেকে গোড়ালি অবধি দুটো পা-ই বেঁকে গেছে। তাই হাঁটে একটু হেলেদুলে। তবে এর জন্যে সাইকেল চালাতে কোনো অসুবিধে নেই, তাই এ নিয়ে তার মাথা ব্যথাও নেই। নিজেই বলে - ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যায় পায়ের এই অবস্থা। আমার ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা হতে একদিন জিগেস করলাম যে তোমার ইউরিক অ্যাসিড কত? বলে - জানিনা তো। -পরীক্ষা করিয়েছিলে তো? 

-না, হয়ে ওঠেনি। 

-ডাক্তারের কাছে গেছিলে? 

-ডাক্তার তো ইউরিক অ্যাসিডই বলবে। আমার বন্ধুর শালার দাদাকে তাই বলেছিল। তাই আর যাইনি। দাদা মন খোলা মানুষ, সমান আগ্রহে হাঁড়ির খবর পরিচিত অপরিচিত সবাইকে দিয়ে বেড়ায়। আমাদের খুব ভালোবাসে। আমরাও ভালোবাসি। তার মধ্যে আমি ওর খুব লেগপুল করি। ও সেটা খুব খোলা মনে এনজয় করে। দাদার বিশ্বাস পৃথিবীর মধ্যে সর্বোত্তম জাতি হল গন্ধবেনে। আর ঠাকুর দেবতার মধ্যে সবচেয়ে ম্যাজিকাল হলেন ওদের কালীতলার মা কালী। 


এ হেন আমার দাদা বেলভিউতে পৌঁছলেন কি করে! ছোটো ছেলে পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর। তারই বাবা হিসেবে চিকিৎসার এই সরকারি সুযোগসুবিধে। তবে দাদার যদি বেলভিউয়ের আভিজাত্য বা চিকিৎসা মূল্য সম্বন্ধে বিন্দু মাত্র ধারণা দাদার থাকতো, তাহলে, করোনার দিব্যি, দাদা যেত না, বলত - আমার আশি বছর বয়স, আমার পেছনে এত খরচ করা চলবেই না! 


শুনলাম বেলভিউতে দ্বিতীয় দিন থেকেই দাদা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছে। তৃতীয় রাতে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। এই তো দিব্যি সুস্থ রয়েছি, আবার কাউকে ডেকে তুলবো মাঝ রাতে - এই সবা বিবেচনা করে সে বেডের উঁচু রেলিং ডিঙিয়ে নামতে গিয়ে পপাত চ  হলেও ভভাঙ চ বা মমার চ হয়নি। নিজের সুস্থতার এবম্বিধ প্রমাণাদি দাখিল পূর্বক সে ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরেছে। 

আজ ফোন করলাম। 

-কি গো, কেমন আছ?

-ভালোই আছি রে। দেখ, আমার তো দুটো ডোজই হয়ে গেছিল। আমার কেন করোনা হল বল তো? 

-দুটো ডোজ হয়েছিল বলেই তো ফিরে এলে। নইলে তো আমাদের সকলকে মনে মনেই বাই বাই করতে হত তোমাকে। 

-তাই না! ঠিকই বলেছিস। 

-কেমন লাগলো বেলভিউ? বেড়ানো কেমন হল? 

-সে আর বলিস না। সব ঝকঝকে পরিস্কার। অ্যাটাচড বাথরুম। নার্সরা খুব ভালো। আমি তো মা বলে ডাকতুম। আমার মেয়ের মতো তো সব। ডাক্তাররা কি ভালো। কি নরম করে কথা বলেন। খাওয়াদাওয়া কত ভালো। আমি মাংস খাইনি। রুচি ছিল না, বুঝলি তো। মাছটা খেয়েছি। বড়ো বড়ো পিস মাছ দিত। তা বাঙালি মানুষ, মাছটাই খেতুম। ব্যবস্থা পত্র খুব ভালো। 

-একেবারে ফাইভ স্টার হোটেল, বল? 

-ঠিক বলেছিস, তাই হবে। ছোটো ছেলেই তো সব ব্যবস্থা করেছে। কি করে করল কে জানে! 

-আর জানতে হবে না তোমাকে। এখানে কদিন থেকে একটা কিন্তু ভবিষ্যতের লাভ হল। 

-কি লাভ? কি লাভ? 

-এইবার যখন চিত্র গুপ্তের সামনে দাঁড়াবে তখন তুমি তাকে বুঝিয়ে বলতে পারবে যে তোমার কি রকম ঘর আর খাতির চাই। বলবে মর্ত্যের বেলভিউয়ের মতো। আমার অভ্যেস কিন্তু ঐটাই। 

-টানা লম্বা হাসি।

- এখন কেমন আছো সেটা বল। 

-ভালো আছি। তবে প্রচুর ওষুধ খেতে হচ্ছে। ওটাই খুব চাপ হয়ে যাচ্ছে। 

-ওষুধ কে দিচ্ছে হিসেব করে টাইমে টাইমে? 

-ছোটো বৌমা আর ছোটো ছেলে। 

-কিনে আনছেও তারাই। তাহলে চাপ তো তারা নিচ্ছে। তোমার চাপটা কোথায়? 

-আমায় খেতে হচ্ছে। অত ওষুধ খেতে ইচ্ছে করে না। 

-তুমি ওষুধ মনে করে খাচ্ছো কেন? মনে করবে সিঙাড়া খাচ্ছো। সেটা ভালো না লাগলে ভাববে ফিশফ্রাই খাচ্ছো। 

-(হাসি) নাহলে কি মিষ্টি খাচ্ছি ভাববো? 

-না, যে সে মিষ্টি নয়। ভাববে কালীতলার পেসাদ খাচ্ছো। তাহলে ফেলতেও পারবে না, অপছন্দও করতে পারবে না। 

- প্রাণ খোলা হা হা হা... 

31/05/2021

 মিত্রাকে -

আমাদের ঝুলির সব রকম ভালো

      তোরই জন্যে তোলা ছিল। 

কি মিষ্টি দেখতে দ্যাখ-

মুখের হাসিটা তো

                ভুবনমোহিনী! 

      কথা বললে কলস্বিনী-

মনের গভীর থেকে 

শব্দ-বাক্য উঠে এসে

কত বছর পরে পরে

আদরে জড়িয়ে ধরে। 

ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ ভাঙে

                  কৈশোর গাঙে -

রোদ চিকচিকে কথায়-

                  পুরানো সেই...... 

কোন সে মেয়েবেলা থেকেই

      সংসার সংসার সংসার! 

তবু ওর নেই কোনো অন্ধকার। 

কালি-ঝুলি-মান- অভিমান, 

    পাওয়া না-পাওয়ার গান

কিছুই জড়াতে পারেনি ফাঁসে-

                      কত অনায়াসে

তাই সব ফেলে এত তাড়াতাড়ি

একাই দিতে হবে পাড়ি

বয়স থমকে থাকার দেশে? 

   যাচ্ছিস কত নম্বর বাসে? 

             পৌঁছে খবর দিস। 

     মিত্রা, সিট পেয়েছিস?

11/05/2021

করোনাকাল 

কে যে কোন দিকে 'আসি'

বলল-  তার দিকে ঘাড় 

ফেরাতে না ফেরাতেই

হাত নেড়ে 'বাই' বলল

অন্য কেউ, অন্য দিকে-

ইতিমধ্যে 'এলাম রে'-

শুনলাম কি চেনা কণ্ঠে? 

'আজ তবে আসি' চেনা 

গলা এও! নৈঃশব্দের

শব্দে স্তব্ধ দিন রাত! 

সাড়া দিতে দিতে, হাত

নাড়তে নাড়তে ক্লান্ত

মন, অসাড় মনন। আরও

কত বাকি! সার বেঁধে

মিছিলে চলেছে কত

সুসময়, চেনা মুখ, 

স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা। 

মানুষ তো নয়, যেন

সংখ্যাতীত ঝরাপাতা-

শীতের শুরুর মতো, 

ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে

নিঃসীমে নিঃশেষ হয়ে!

01/05/2021