Sunday, October 22, 2023

আমার পঞ্চমীযাপন (2023)

আমার পঞ্চমীযাপন


এদিকে সবাই সারারাত ধরে সম্বচ্ছরের মর্নিং ওয়াকে নেমে পড়েছে। আমিই বা পিছিয়ে পড়ি কেন? একে আনন্দবাজার পড়ি না। দুইয়ে কোনো পিছিয়ে পড়ার কম্পিটিশনও হচ্ছে না। তিনে ভীড়ে গা মাসাজ করি না। এই তিন যেন ত্রিনয়নে চোখ মেরে দুয়ো দিচ্ছে! কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়! তাই সকাল পৌনে ছটা নাগাদ বাজারে যাবার পার্সটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বিকে পাল অ্যাভিনিউয়ে দাঁড়িয়ে আছি, একটা বাস চাই, হাওড়ার বাস। আশপাশে দেখছি কত স্কুটি চড়া দম্পতি, বন্ধু জোড়ায় জোড়ায় এসে মণ্ডপে ঢুকছে। এরা পুরোনো জামায়, আমার  মতো। অটো দাঁড় করিয়ে  হাঁটু খারাপ মা ও  ঢকঢকে বাবাকে নিয়ে মেয়ে নামছে - এরাও পুরোনো জামায়। জন চারেক এল সাইকেলে - দেখে মনে হল মিস্ত্রি বা সাফাইকর্মী। আমরা তো পোশাকেই বিচার করি। তবে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যারা নামছে তারা, বিশেষ করে তরুণীরা, একেবারে র্্যাম্পের ঝলমলানি, শুধু সারা রাতের ক্লান্তিতে একটু ম্লান। একটু দাঁড়াতে হল। একটা জানলার ধারে সিটওলা মিনিবাস পেলাম। গিয়ে নামলাম হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে স্টেশনের গা ঘেঁসে। এবার ব্রিজের দিকে হাঁটা। রাস্তা পার হতে হলে কিন্তু খুব জটিল ট্রাফিক!

শুনেছি, ছবিও দেখেছি হাওড়া ব্রিজে আল্পনা দেওয়া হয়েছে। এটা রথ দেখা। আর আজ অবধি কোনোদিন কলকাতার সিগনেচার হাওড়া ব্রিজ হেঁটে পার হইনি - এটা কলা বেচা! রাস্তা পারের জটিলতা যতদূর সম্ভব কম ঘাড়ে নিয়ে পৌঁছলাম ব্রিজের ডানদিকের মানে স্টেশনের দিকের ফুটপাতে। কি চওড়া ফুটপাত! দুদিকে রেলিং - ডানদিকে নদী, বাঁয়ে রাক্ষুসে ট্রাফিক! মাঝখানটা কিন্তু দারুণ থ্রিলিং। দেখলাম আরও কয়েকজন এমনই ছিটেল - ছবি তুলতে এসেছে ব্রিজে। আমিও কটা ছবি তুললাম। পথের দুধারে লম্বা করে আল্পনা, কদিনে কিছুটা মলিন। ছবিতে একটা বড়ো গোল সেন্টার পিসও দেখেছিলাম। কিন্তু সেটা খুঁজে পেলাম না। চাকায় চাকায় উঠে গেছে? কে জানে। কলকাতার দিকে শেষ প্রান্তে জগন্নাথ ঘাটের সিঁড়ি পেরিয়ে দেখি বাঁদিকের রেলিং আরও শক্তপোক্ত, কোনো কাটা নেই। অথচ আমি তো দক্ষিণ কলকাতায় যাব না, রাস্তা পেরোনো জরুরি। ফুলওলাদের জিগেস করতে বলল আবার ব্রিজের শুরুতে ফিরে গেলে পেরোতে পারব, নয়তো রেলিং টপকে! সামনে কোনো কাটা নেই!! রেলিং ধরে খানিক দাঁড়ালাম - পাশে একজন পুং সদ্য পেরিয়ে বস্তাটা রেলিংএ রেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, তার পেছনে আরও একটি পুং রেলিংএ চড়ে বসে আছে বস্তা সমেত। আমার সামনে একজোড়া মা-মেয়ে ওপার থেকে ছুটে রাস্তা পেরিয়ে এল। ওদের বস্তা নেই। ভাবলাম ওরা রেলিং পেরিয়ে ফুটপাতে উঠবে। নাঃ, বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝলাম বস্তাই হল রেলিং টপকানোর পাসপোর্ট। আমার পাসপোর্ট নেই! তবে আপাতত আমার আশেপাশে এরা আমাকে একটা ক্ষণস্থায়ী কভার দিচ্ছে এবং সামনে কোনো পুলিশ দেখছি না। অতএব দুগ্গা দুগ্গা বলে রেলিংএ উঠে পড়লাম। রেলিংএর উচ্চতা আমার চিবুক অবধি। চড়লাম, সামিট করে ওপাশে নেমে নিরীহতম মুখ করে মা-মেয়ের পাশে দাঁড়ালাম। এবার রাস্তা পার হওয়া। পাঁচটা রাস্তা পরপর বিছোনো। ! ৩+২ হিসেবে পেরোতে হবে। মাঝে কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা নেই, দাঁড়ালেই একেবারে ক্রিকেটের বলের মতো ছক্কা হাঁকিয়ে দেবে! ফ্লাইওভারের মুখটায়। একটায় গাড়ি বন্ধ হয় তো অন্যটায় চালু হয়। অদেখা সিগন্যালবৃন্দের শেষ ও শুরুর মাঝে যাহোক করে অক্ষত অবস্থায় পার হলাম। খানিক পরে সোবাবাজার সোবাবাজার হাঁকতে হাঁকতে যে মিনিটা এল তার গায়ে বিকে পাল লেখা দেখে উঠে পড়লাম। ওমা! একটু পরেই সেটা (নিমতলা) শ্মশান মুখী না হয়ে গণেশটকির দিকে ঘুরলো! 

- এটা বি কে পাল যাবে না?

- না, আমি কি বিকে পাল বলে হেঁকেছি?

- বাসের গায়ে যে লেখা রয়েছে?

- ক'বছর হয়ে গেল ঐ রাস্তায় যায় না।

- আমিও এই পথে রোজ যাই না।

- এটা সোবাবাজার যাবে।

- শোভাবাজার মেট্রো স্টেশন - তাই তো?

- হ্যাঁ।

- স্টেশন তো বলেননি!

- স্টেশন বলতে হবে?? ওটা কি সোবাবাজার নয়?

- না, নয়। আমায় নাবিয়ে দিন। 

মালাপাড়ার মুখে নেবে ভাবলাম আমার এক দিদিমা তো হাওড়ায় ট্রেন থেকে নেবে হেঁটেই আমাদের বাড়ি আসতেন। ছোটোবেলায় গ্রামের আরও আত্মীয়দের হাওড়া থেকে হেঁটে আসতে শুনেছি। আমিও না হয় হাঁটি আজ। তারপর গুটি গুটি পায়ে এগোতে শুরু করলাম। পথে দুবার থেমেছি । পাথুরেঘাটা থেকে জোড়াবাগানের মোড় অবধি খৈনিবংশীয়  রাজত্ব। প্রায় ৯০% দোকানেই লম্বা লম্বা তামাক পাতা হাত মেশিনে কুঁচিয়ে বিক্রি হয়। আর এই সব ডিটেলস জানতে আমার ৬৫ বছর লেগে গেল! এই অঞ্চলে এক মহিলা একটি বন্ধ দোকানের সামনের পাথরে বসে মাথা আঁচড়াচ্ছিলেন। পাশে জায়গা ছিল। সেই  বনলতা খৈনির পাশে কিছুক্ষণ বসেছি। দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে দুমুখ হেসেছি। আসবার সময় তাঁকে বলেও এসেছি। আর একবার- আহিরীটোলা প্যান্ডেলের কাছাকাছি বিকে পাল অ্যাভিনিউয়ের মাঝমধ্যিখানে এক জটিল-মস্তিষ্ক দুর্গা কোনো অদৃশ্য অসুরের উদ্দেশে অভিধান বহির্ভূত শব্দসহ প্রচুর চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছিল। হাতে একটি হ্যান্ডলবিহীন হাতপাখা।  ইচ্ছে করলেই যানজটরূপেণ সংস্থিতা হয়ে যেতে পারে। তা আমি পাশের দোকান থেকে একটা ছোটো কেক কিনে তাকে দিয়ে বললাম - এত চ্যাঁচায়? শরীর খারাপ করবে তো। কিছু খাওনি তো এখনও? এটা খাও। সে কেকের আগে থতমত খেয়ে নিয়ে কেকটা নাড়াচাড়া করতে করতে রাস্তার ধারে চলে গেল। আমিও সফল ট্রাফিক কন্ট্রোল সেরে আমাদের ঠাকুরকে সুপ্রভাত জানিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

No comments:

Post a Comment