কেওনঝড়
জুলাই ৩, ২০২৫ (১)
মেঘ না চাইতেই জলের মতো কাল রাতে চেন্নাই মেলে উঠে দেখি আমাদের তিনজনেরই লোয়ার বার্থ! ঘটনাটা হল আমাদের প্রাণ কাঁদছিল বর্ষায় বেড়ানোর জন্যে। দুটো প্ল্যান ক্যানসেল হল - একটা বুকিং সমস্যায়, অন্যটা তাপমাত্রার পায়ে গড় করে। ৩ নংএ আছে কেওনঝড়। কিন্তু টিকিট কাটার আগের দিন কম্পুটারে আঁতিপাতি খুঁজেও রাতের কোনো ট্রেনে জুলাইয়ে ১৮ পর্যন্ত ওয়েটিং লিস্টে ১৭-র নিচে কোনো টিকিট দেখলাম না। সেটা জানিয়ে দিলাম মধুমিতা, সর্বাণীকে। এই ট্যুরে, যদি ট্যুর হয় তো তবে ৩য় জন আমি। টিকিট করবে মধুমিতা। পরেরদিন বিকেলে মধুমিতা জানালো - টিকিট হয়ে গেছে। চেন্নাই মেল, কনফার্মড। হল কি করে?! ২টো হয়েছে সিনিয়র সিটিজেন কোটায়, ১টা সিংগল ওম্যান কোটায়, তবে সব এক কম্পার্টমেন্টেই।
গতকাল, জুলাই ২-এ ট্রেন ছেড়েছে হাওড়া স্টেশন থেকে রাত ১১.৪৫-এ, একেবারে রাইট টাইম। তারপরই মেঘ-জলের চমৎকারিত্ব। ট্রেনে উঠেই শোয়ার পর্ব। আমাদের কম্পার্টমেন্টের এসি এতই বেশি ঠাণ্ডা যে বোঝা যাচ্ছে না তার দায়িত্বটা কি - জ্যান্ত মানুষ তাজা রাখা, না মরা মানুষ তাজা রাখা। যাই হোক, সেই ঠাণ্ডায় মাথা ঠাণ্ডা হতে এটা স্পষ্ট হল যে টিকিটটা মন দিয়ে দেখলে ও তার সঙ্গে কোন কোটার টিকিট সেটা লজিকালি যোগ করলে আগেই বোঝা যেত যে আমাদের লোয়ার বার্থ পাওয়াই স্বাভাবিক। তবে অত ভাবাভাবি করলে আজকের সারপ্রাইজ বেচারা মাঠে মারা যেত!
ভোর ৪.৩০-য়, একেবারে রাইট টাইমে ট্রেন নামালো জাজপুর কেওনঝড় জংশন স্টেশন। আকাশ অন্ধকার। স্টেশনের মহিলা ওয়েটিং রুমে শুধুই আমরা। প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে তৈরি হয়ে, সর্বাণীর করা কেক খেয়ে, চায়ের খোঁজে গিয়ে স্টেশনপরিস্কাররত কর্মীর থেকে শুনলাম প্ল্যাটফর্মের মা ভবানী চায়ের দোকানটি খুলবে ৬টায়, কারণ তার মালিক দোকান বন্ধ করে শুয়েছে সাড়ে তিনটেয়! জাজপুর জংশন স্টেশন, লম্বা প্লাটফর্ম, পরিচ্ছন্ন, দুটি ওভারব্রিজ, লিফট আছে। কিন্তু ঝাঁ চকচকেওলা নাকউঁচুপনা নেই। প্লাটফর্মের কালো পাথর বাঁধানো বসার জায়গাগুলো দেখলে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।
আলো ফুটলো। আমাদের গাড়ি এলো। আগেই বুক করা ছিল। স্টেশন থেকে পিকআপ, দুদিন সব দ্রষ্টব্য ঘুরিয়ে দেখাবে, তৃতীয় দিনেও দুটো জায়গা দেখিয়ে স্টেশনে ড্রপ করবে। স্করপিও জিপ, নেবে সাড়ে বারো হাজার। চালকের নাম তপন। প্রায় ছটা নাগাদ যাত্রা শুরু। পথে গাড়ি থামিয়ে চা-বিস্কুট।
প্রথম দ্রষ্টব্য মা তারিণী মন্দির। বিশাল খোলামেলা মন্দির, তার আরও বিশাল চত্বর। মন্দিরের মাঝখানের গোল চত্বরে মূর্তি। প্রতিষ্ঠিত শীতলা ঠাকুরের মতো - গোল পাথরে টকটকে লাল রঙের ওপর সোনালী ধাতুর চোখ-নাক-মুখ। অবয়বের কোনো ফর্ম নেই। সেই গোল ঘিরে বিশাল চওড়া খোলা গোল বারান্দা। সেখানে ভিড় সামলানোর স্টিলরডের ভক্ত-চ্যানেল, গেট সবই আছে। আমরা যখন গেছি তখন একেবারেই ফাঁকা। ঠাকুরকে ঘিরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ৪/৫ জন পুরোহিত বসে। তাঁরা ভক্তদের থেকে ডালা নিয়ে পুজো করে তাদের হাতে ফেরৎ দিচ্ছে। তাঁদের প্রত্যেকের সামনেই ঠুকে নারকেল ভাঙার একটা করে লোহার যন্ত্র। সেগুলি থেকে বিরামহীন ফটফট শব্দ হয়েই চলেছে। নারকেল সহযোগে পুজো দেওয়াই রীতি। পুরো মন্দিরটি পরিস্কার ঝকঝকে। সদ্য রেনোভেশন হয়েছে বোঝা যায়। মূল মন্দিরের দরজার বাইরে দুদিকে দুটি অসুর নিধনরত দেবীমূর্তি। সেই অসুরদের পেটের মাঝখানে ১টি করে গর্ত - কোকোনাট-বে। ওখানে নারকেল দিয়ে দিলে তা গড়গড় করে সুড়ঙ্গপথে যথাস্থানে পৌঁছে যায়! মন্দিরের বাইরের চত্বরে ১টি বিশাল কলসের ওপর ১টা উপযুক্ত মাপের ডাব - কংক্রিটের। কলসটি পানীয় জলের। তার গায়ে কল ও গাঁথা বেসিন। আর বাইরের ফটকের কাছে, ভেতর দিকেই, বিনামূল্যে জুতো রাখার জায়গা। মন্দিরের গায়ে, ফটকের মাথায়, মূল ফটকে, দরজায় কারুকাজ তো আছেই।
জুলাই ৩, ২০২৫ (২)
এবার তারিণী মন্দির থেকে ১২ কিমি দূরের ঝর্ণা গুণ্ডিচা ঘাই বা ঘাগি। জাজপুর থেকে কেওনঝড়ের দূরত্ব ১১৪ কিমি মতো। পথ এনএইচ ২০ আর স্টেট হাইওয়ে। এই দূরত্ব অতিক্রম করার পথে আশেপাশেই পড়ে তারিণী মন্দির, গুণ্ডিচা ঘাই আর ভীমকুণ্ড। আমরা এই তিনটে তাই যাবার পথেই দেখব আজ।
গুণ্ডিচা ঘাই একটি ঝর্ণা মহেন্দ্রতনয়া নদীর ওপর। নায়াগ্রা বা ভারতের আথিরাপল্লীর ছোটো সংস্করণ এটি। এর উচ্চতা ও প্রস্থ দুইই আছে। জল অনেকগুলি ধারায় ভাগ হয়ে উঁচু থেকে পড়ছে। তার আগে নদীর আসছে বেশ খানিকটা প্রায় সমতল পাথুরে ভূমি পেরিয়ে। এই বর্ষায় ঝর্ণার ফুল ফ্লাশ। সুন্দর বাঁধানো সিঁড়ি রেলিংসহ নেমে গেছে ঝর্ণার নিচে অবধি। বাতাসে জলকণার হুড়োহুড়ি। সিঁড়ির ধাপে পাঁচ মিনিট দাঁড়ালে নিজে স্যাঁতস্যাঁতে পাঁপড় হয়ে যাবে। ওখানে ছবি তোলা হল - সে ছবিতেও জলকণা আমাদের ঢেকে দিচ্ছে। সিঁড়ি থেকে উঠে ঝর্ণার সামনে, ক'হাত দূরেই একটা তিনতলা ভিউ পয়েন্ট। আরও আছে ঝর্ণার নিচে যে নদীটা তৈরি হচ্ছে সেটার ওপর দিয়ে একটা ব্রিজ। সেই ব্রিজের এক পাশেও ভিউ পয়েন্ট, সেখান থেকে দেখা যায় ঝর্ণার শুরুর আগের পাথুরে পথটাও। আশপাশে কয়েকটা দোকানপাটও আছে, তবে কিছুই খোলেনি তখনও। কি অনাবিল সৌন্দর্য তাই!
জুলাই ৩, ২০২৫ (৩)
এবার ভীমকুণ্ড। প্রথমে ১২ কিমি গিয়ে আবার তারিণী মন্দির। তার আশপাশে কোথাও ব্রেকফাস্ট করে ভীমকুণ্ডের পথে। রাস্তার ধারে বড় হোটেলের একটা আউটলেট - স্টিলের কাউন্টার - গরম গরম খাবার সার্ভ করছে। আমরা ইডলি আর ধোসা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম।
ভীমকুণ্ডে প্রবেশমূল্য ১০/-। বড় গেট, ঢোকার লোহার রিভলভিং দরজা, ওয়েটিং রুম, পরিস্কার টয়লেট। আর ভেতরে ঢুকে লম্বা একটা ব্রিজের শেষে তিনতলা ভিউ পয়েন্ট। প্রত্যেকটা তলার চারপাশ ঘিরে বারান্দা। ঘুরে ঘুরে ভীমকণ্ডের পুরোটা দেখার জন্যে।
ভীমকুণ্ড ভীমের মতোই বিশাল। বৈতরণী নদী বয়ে আসছে প্রস্তরসঙ্কুল নদীখাত ধরে। তারপর পাথরের ওই রকম ফর্মেশনের কারণে অজস্র ধারায় ভাগ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা ধারাই পাথরের অসমান লেভেলে লাম্ফঝম্প করে একটা আরেকটার সঙ্গে মিশছে। সবশেষে বড় বড় দুতিনটি ধারায় জড়ো হয়ে বড় বড় দুতিনটি প্রচণ্ড স্রোতের সঙ্গম। এই বর্ষায় প্রতিটি ধারাই অত্যন্ত সজীব। ভীমকুণ্ডের বিশাল বিস্তার, কিন্তু উচ্চতা নেই। স্রোতের তীব্রতা যেন বাঁধের ছাড়া জল। আর এই এত সৌন্দর্যের ফ্রেমের চারিদিকে ঘন সবুজ জঙ্গলের পাড়। অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতি!
এবার গন্তব্য ওডিশা টুরিজিমের পান্থনিবাস, কেওনঝড়। আমরা সেখানে থাকব আগামী দুদিন। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় একটা বাজল। শহরের একটু বাইরে, হাইওয়ের ওপর, পেছনে পাহাড়ের চালচিত্রে খোলামেলা পান্থনিবাস। প্রচুর গাছপালা। এখান থেকে গুণ্ডিচা ঘাই ৫৬ কিমি, আর ভীমকুণ্ড ৫০ কিমি। আজকে আর ডেরার বাইরে নয়। বিশ্রাম। বিশ্রামের সময় কথায় কথায় চলে এল নন্দিনীর কথা। ওরও আসার কথা। ছিল। কিন্তু পাকেচক্রে জড়িয়ে আটকে গেল! আমরা মিস করছি। ওও করছে নিশ্চয়ই।সর্বাণী লুডোর বোর্ড এনেছে। চারজন হলে ভালো হয়। ওকে যে অনলাইনে ডাকব তারও ভরসা নেই, কারণ এখানে কানেকশন এই আছে, এই নেই!











No comments:
Post a Comment