Tuesday, July 8, 2025

কেওনঝড় জুলাই ৫, ২০২৬ (১ম ও শেষপর্ব)

 জুলাই ৫, ২০২৫ (১)











আজ আমাদের ফেরার দিন। বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে ফিরব জাজপুর স্টেশন থেকে। তার আগে পথে দেখব সীতাবিঞ্জি আর পাহাড়ের গায়ে ফ্রেস্কো। ব্রেকফাস্ট সেরে, বিল মিটিয়ে ঘরেই বসে আছি। আজ ছিল লুচি, আলুকুমড়োর তরকারি আর চিঁড়ের পোলাও। 

গাড়ি এলেই বেরিয়ে পড়ব।  গাড়ির দেরি হচ্ছে। ফোন করতে জানা গেল আজ অন্য গাড়ি, অন্য ড্রাইভার আসবে। গত দুদিনের গাড়ি বিয়েবাড়িতে গিয়ে ফিরতে পারেনি। পান্থনিবাসের একটি সুগন্ধী ডবল টগরের ও খুদি খুদি ফুলের বোগেনভেলিয়ার গাছ খুব পছন্দ হয়েছিল আমাদের তিনজনেরই। আহা যদি কটা ডাল পাওয়া যেত! এই বর্ষায় হয়ত লেগেও যেত। সকালে একজন স্টাফকে সে কথা বলেছিলামও, মানে আবেদন। আমরা তখনও ঘর থেকে নামিনি। সেই কর্মী আমাদের দরজায় নক করে, আমাদের ব্যাগগুলো সব নামিয়ে দিয়ে, কোথায় হাওয়া হয়ে গেলেন। তারপর দেখি একটা ঠিকঠাক কাটার দিয়ে ঠিকঠাক ডাল খুঁজে কেটে আমাদের দিলেন। মধুমিতার ভাঁড়ারে বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক বিনব্যাগ ছিল, ওগুলো ওর ক্যামেরার ব্যাগের বর্ষাতি। তারই তিনখানা ও বার করল তিনজনের জন্যে। ততক্ষণে গাড়িও হাজির। সবাইয়ের কাছে বিদায় নিয়ে পোঁটলা পুঁটলি বৃক্ষশাখাসম্পদ আগলে গাড়িতে অধিষ্ঠিত হতে গাড়িও যাত্রা শুরু করল, সঙ্গে বৃষ্টিও তার রেগুলেটর ফুলস্পিড করে দিল।

সীতাবিঞ্জির পথে যাচ্ছি এন এইচ ২০ ধরে। রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডারে বাহারি কলকে আর করবীর ঝোপ। কলকে হলুদ, সাদা আর হলুদ ফুলের অন্দরমহলে কমলা ছোপ। করবী তাজা গোলাপী, সাদা, লাল আর লাল-গোলাপীর মাঝের একটা শেড। কত রঙের! খুব লোভ হচ্ছে। বৃষ্টি পুরো এনার্জি নিয়ে নেচে চলেছে। একটা সময় সব কিছুর সমাপতন ঘটল - বৃষ্টি প্রায় নেই, ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার জন্যে নেমে গেল। আর ডানদিকের ডিভাইডারে তখন কলকের তিনটে রং-ই হাতছানি দিচ্ছে। আমিও চট করে নেমে পড়লাম। তিনটে গাছের তিনটে ডাল ভেঙে নিয়ে, ডিকি খুলিয়ে তুলে দিয়ে আবার ছুট। 

লোকমুখে সীতাবিঞ্জি লব-কুশের জন্মস্থান, যদিও ওখানকার গেরুয়াধারীরা বাল্মীকি আশ্রমের খোঁজ জানেন না। পাহাড়ের গায়ে চওড়া বাঁধানো টাইলসের সিঁড়ি। বর্ষায় পিছলে যাবার সম্ভাবনা। ৪০/৫০ ধাপ ওপরে পাহাড়ের কয়েকটা বিশাল বোল্ডারের খাঁজই মন্দির - সীতামাই- দুপাশে লব ও কুশ। পৌঁছনোর বারান্দা টাইলস বাঁধানো, পাশে রেলিং। সেই রেলিং, আশপাশের গাছের ডাল ও গুঁড়ি, এমনকি কোথাও কোথাও দড়ি বেঁধে তাতে অজস্র জরি-বর্ডারের লাল কাপড় বাঁধা - আকাঙ্ক্ষা পূরণের মানত। গাছের নিচে, পাথরের খাঁজে, চাতালে অসংখ্য মাটির ঘোড়া - আকাঙ্ক্ষা পুরণ হওয়ার নিবেদন হয়তো। সিলিং তৈরি করা বোল্ডারের নিচের পিঠ, আকাশমুখী ওপর পিঠ, পাহাড়ের বুকের জঙ্গল দেখে যখন নামছি তখন আটকে দিল বৃষ্টি। ওই বোল্ডারের আশ্রয়ে ৪৫ মিনিট দাঁড়িয়ে। বৃষ্টি কমছে না। পায়ের নিচে দিয়ে জলের ধারা বইছে। অগত্যা তার মধ্যেই ছাতা রেইনকোট নিয়ে পা টিপে টিপে নামা শুরু। জুতো নিচেই খুলে রেখে ওপরে উঠেছিলাম। মধুর আর আমার পাদুকা রাবার জাতীয় জিনিসের। সর্বাণীর স্নিকার্স - ততক্ষণে তারা রস টুসটুসে চমচম! চালক গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়েই পড়েছে। তাকে তুলে, গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা শুরু। এবার ফ্রেসকো। আসার সময়ে কাছেই একটা রেলিং ঘেরা জায়গার পাশে ফ্রেসকো লেখা বোর্ড দেখেছিলাম। সেখানে ঢুকলাম। বৃষ্টির ক্ষান্তি নেই। মধু বলল ও নেমে আগে দেখবে ফ্রেসকো কোথায়। তারপর আমরা নামব। সামনেই একটা উঁচু মনোলিথিক স্টোন, আশেপাশে ছোটোখাটো কয়েকটি। এগুলো তো রোদ-বৃষ্টিতে উন্মুক্ত। এখানে ফ্রেসকো হবে না। দুজন মহিলা ছাগল চরাতে চরাতে এর আড়ালে দাঁড়িয়ে। তাদের জিগেস করতে বলল এই রাস্তায় একটু এগিয়ে 'চিত্র' আছে।  এই জায়গাটা রাজার লুকোনো রত্নভাণ্ডার ছিল। এখানে চিত্র নেই। একটু এগিয়ে-কে আমরা ভুল বুঝলাম ফেরার রাস্তায় একটু এগিয়ে বলে। তাই ওই ফ্রেসকো লেখা সীমা থেকে বেরিয়ে এলাম। আরেকজন মহিলাকে দেখে আবার জিগেস করে বুঝতে পারলাম যে ওই ফ্রেসকো সীমানার ভেতরেই ওই মনোলিথিক পাথরটা ছাড়িয়ে মাটির রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে। আবার গাড়ি ঘোরাও। একটু এগিয়ে দেখি ডানদিকের বিশাল বোল্ডারের গায়ে খানিকটা রেলিং দেওয়া পাথরের ধাপ। মধু আর আমি ছাতা মাথায় এগোলাম। ওই বোল্ডারের পেছনদিকে আরেকটি বোল্ডার মাথার ওপর একটু ছাদের আড়াল দিয়েছে, তার গায়ে কয়েকটি লোহার খাম্বার সাপোর্ট।‌ সেখানে দুজন মহিলা আশ্রয় নিয়েছে, সঙ্গে তাদের ছাগল বাহিনী। তাদের সামনে ছাদের বোল্ডারে ওঠার একটা লোহার সিঁড়ি। সে সিঁড়ি মজবুত, কিন্তু তার উঁচু উঁচু ধাপের পা রাখার জায়গায় ফাঁক ফাঁক লোহার পাত আর ধাপের ঢাল ভেতর দিকে। সিঁড়ি, বৃষ্টি, ছাতা, ক্যামেরা সব সামলে ওপরে উঠে দেখি সিলিং -এ, সেও আরেকটি বোল্ডার, ফ্রেসকোর ধ্বংসাবশেষ - রং আর বেরং মিলিয়ে দুটি ঘোড়া আর কয়েকটি মানুষের উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছে মাত্র। রক্ষণাবেক্ষণের বড়োই অভাব। ছবি তুলে আবার কসরৎসহ নিচে নেমে ভিজে গুটিসুটি ছাগল বাহিনীর ছবি তোলা হল। একজন মহিলা আলাপী - কোথা থেকে এসেছি, ছবি দেখাও, আমাদের কিছু দেবে না গো... ইত্যাদি। সে সব মিটিয়ে এবার সোজা জাজপুরের দিকে।

পথে আবার সেই গোলাপী করবীর হাতছানি। এবার সর্বাণীর আগ্রহটা বেশি। বৃষ্টি একটু কমতে তারও একটা ডাল সংগ্রহ করা হল। জাজপুর স্টেশনের কাছাকাছি বড়ো গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ। তখন একটু ঘুরপথে জাজপুর পৌঁছলাম আমরা। ট্রেন আসবে ২ নং প্ল্যাটফর্মে। ৪টে নাগাদ আসার কথা, বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। লিফট ও ওভারব্রিজ দিয়ে আবার সেই আপার ক্লাস লেডিজ ওয়েটিং রুমে। ওয়েটিং রুমের দরজা ভেজিয়ে হুড়কোটা সামান্য টানা। আশপাশে নাম লেখার খাতা বা লোক কেউ নেই। তবে সেটা কোনো বাধাই নয়। তিন তারিখ ভোর রাতে আমাদের নাম তো লেখা হয়েইছিল। অতএব প্রবল অধিকার বোধে দরজা খুলে ঢুকে পড়লাম। 






জুলাই ৫, ২০২৫ (ঘরে ফেরার পর্ব)

জাজপুর স্টেশনে গরম খাবারের ব্যবস্থা নেই। আগে ছিল, করোনা কাল থেকে বন্ধ। আবার স্টেশনের বাইরে যাবারও ইচ্ছে নেই। তাই প্যাটিস, কফি, লস্যি দিয়ে লাঞ্চের কাজ চালানো হল। ট্রেনের রাইট টাইম চারটেয়। স্টেশনে কোনো ডিজিটাল বোর্ড নেই, শুধু প্ল্যাটফর্মের ওপর ট্রেনের নাম, নম্বর ও কম্পার্টমেন্টের নম্বর দেখানো ঝোলা বোর্ডগুলো ছাড়া। আমি আর মধুমিতা খুঁজতে বেরোলাম কোথায় আমাদের ট্রেনের রিয়েল টাইম খবর পাওয়া যাবে। একটা ক্রু রেস্টরুমের জানলা দিয়ে জিগেস করতে একজন ফোনে দেখে বললেন ট্রেন রিশিডিউল হয়েছে, উল্টোরথের কারণে। ট্রেন তো আসছে পুরী থেকে। মধুমিতার গুগল বলছে ৫৮ মিনিট লেট। একটু পরেই ঘোষণা হল বন্দে ভারত রিশিডিউল হয়ে ১ঘণ্টা ৫৬ মিনিট দেরিতে আসবে।‌ মানে হাওড়ায় সাড়ে আটটার অ্যারাইভাল সাড়ে দশটার আগে তো নয়ই। আজকাল রাতে হাওড়া স্টেশনে লাগাম-ছাড়া-দর-হাঁকা ট্যাক্সি ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। যাত্রী সাথী অ্যাপের পর থেকে ট্যাক্সিকে ট্যাক্সি-বে-তে ঢোকানোর জন্যে রাতে পুলিশ থাকে না। দিনের খবর জানি না। নতুন প্ল্যাটফর্ম কমপ্লেক্স থেকে বাসস্ট্যান্ড অনেক দূর। পিঠে হাতে ব্যাগ রয়েছে। আমার গাড়ি আসার কথা। এমতাবস্থায় মধুমিতা ও সর্বাণীকে বললাম রাতে আমাদের বাড়িতে থেকে যেতে, বাড়িতে বলে দিতে। দুজনেই রাজি হল। আমিও বাড়িতে জানিয়ে দিলাম। এবার নিশ্চিন্ত। সর্বাণী প্রস্তাব দিল লুডো খেলার। ওয়েটিং রুমে টেবিল বা টেনে নিয়ে মুখোমুখি বসার চেয়ার নেই। সব ভারি সোফা। আমি বললাম ওয়েটিং রুমের সামনেই প্ল্যাটফর্মে লোহার পিলার ঘিরে যে কালো পাথরের বসার জায়গা সেখানে গুছিয়ে পা তুলে বসে খেলব, উত্তর কলকাতার ফুটপাতে যে রকম তাস খেলা চলে, সেইরকম। পাব্লিক দাঁড়িয়ে গেলে বা দেখলে বা চাল দিতে সাহায্য করলেও কোনো অসুবিধে নেই। ওয়েটিং রুমে ততক্ষণে আরও ২/৩ জন এসে গেছেন। তাঁরাও আছেন। আর আমরা তো দরজার মুখোমুখি বসব। ব্যাগ নিয়ে অত দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।

বোর্ড পেতে লুডো খেলা শুরু হল। কেউ দাঁড়িয়ে গেল না, তবে আসতে যেতে সবারই নজর কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আমাদের দিকে। এমনকি ট্রেন থামলে ট্রেনের জানলা আর দরজার লোকজনও দেখছে। স্টেশনের এই লোহার পিলারগুলো দুপাশে রেল, মাঝখানটা ফাঁকা। পিলার ঘেরা এই চৌকো জায়গাটায় পিলারের একদিকে আমরা, অন্যদিকে এক ভদ্রলোক ঘুমোচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে পরিবারের লোকজনও আছে। লুডোর ছক্কার খটখট শব্দে তাঁর ঘুম ভাঙলো, তিনি আমাদের দিকে পাশ ফিরে প্রথমে কনুইয়ের ভরে আধশোয়া হয়ে পিলারের ফাঁক দিয়ে অবজার্ভ করতে লাগলেন। একটু পরে উঠে বসে পিলারের ফাঁকে মুণ্ডু প্রায় গলিয়ে পরিচালনা করতে লাগলেন। চালে গুনতে ভুল হলে, কার চাল তা ভুলে গেলে, পরপর কয়েকটি চাল পেয়ে মোটের হিসেবে ভুল করলে .... প্রভূত সাহায্য আসতে লাগল। কোন রং জিতবে তারও প্রেডিকশন হতে থাকল। মোট কথা, দারুণ জমে উঠল - কেউ কারুর ভাষা না বুঝলেও। আমি আবার একজনকে ছবি তুলে দিতে বললাম। এসব করতে করতে জানা গেল সাড়ে ছটার পরে ট্রেন ঢুকবে। আমাদের ওয়েটিং রুমের সহযাত্রীরা বলে গেলেন যে আমরা যেন আমাদের ব্যাগগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করি, ওঁরা এবার প্ল্যাটফর্মে যাচ্ছেন। আমরা এশিয়াডের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বলে ওনারা স্বেচ্ছায় আমাদের ব্যাগের‌ দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিলেন। এরপর সব গুটিয়ে গুছিয়ে ট্রেনে ওঠা। আমি উঠেই খোঁজ করলাম আমাদের ডিনার দেওয়া হবে কিনা।‌ অ্যাডেনডেন্ট বললেন - এখন বিকেলের স্ন্যাক্স দেওয়া হবে, আর ডিনারে খিচুড়ি। যাক বাবা, নিশ্চিন্ত, বাড়িতে কিছু আয়োজন করতে বলতে হবে না। এবার শুধু তিনটে কাজ - খাও, ঘুমোও আর পরের ট্রিপের প্ল্যান করো।

পুনশ্চ: রাত সাড়ে এগারোটায় ট্রেন হাওড়া পৌঁছেছিল।

No comments:

Post a Comment