Tuesday, July 8, 2025

কেওনঝড় জুলাই ৪, ২০২৬ (১, ২, ৩, ৪, ৫)

জুলাই ৪, ২০২৬ (১)



আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেরাই একটু চা তৈরি করে খেয়ে নিলাম, সঙ্গের কেক সহযোগে। তারপর এল বেডটি। সেটিও গলাধঃকরণ করে পান্থনিবাসের ছাদে গিয়ে তিনজনে মিলে হাত-পা-কোমর দুলিয়ে ছুঁড়ে টানটান করে নেওয়া হল। ঝর্ণাদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্যে এদের প্রচুর খাটাখাটনি হচ্ছে, তাই একটু ওয়ার্ম আপ। তারপর একটা ব্যালকনিতে গিয়ে খানিক বসা হল। এরপর চান করে তৈরি হওয়া ও ব্রেকফাস্ট করা। গাড়ি আসবে সকাল ৯টায়। 

এবার একটু খাবারদাবারের খবর দি। কাল দুপুরে পান্থনিবাসে লাঞ্চ করেছি - ভাত, মুসুর ডাল, আলু পটল ভাজা, মাছের ঝাল, আমের চাটনি। মাছ টাটকা, খাবার ভালো। রাতে রুটি আর মুরগির মাংস কষা। আজ সকালের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। ছিল উপমা, লুচি, আলুর তরকারি আর চা। আজ দুপুরে হালকা লাঞ্চ পথেই - ডবল ডিমের রোল। রাতে চাইনিজ খাওয়া হবে পান্থনিবাসেই। আর কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়া। 


সে এক সিঁড়িভাঙা দিন

জুলাই ৪, ২০২৫ (২)

গাড়ির চাকা গড়ালো। আজ প্রথম গন্তব্য খণ্ডধার জলপ্রপাত, ৫৬ কিমি। নিকটতম পয়েন্টে গাড়ি রেখে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম খণ্ডধারের দিকে। গুগলে দেখেছি এটি কোরাপানি নালার জলপ্রপাত, বৈশিষ্ট্যে অনেকটা উঁচু, ৫০০ ফিট। আজ আকাশ বড় অনিশ্চিত - ঝিরঝিরে বৃষ্টি প্রায় লেগেই আছে। মধুমিতা আর সর্বাণী নিয়েছে ছাতা, আমি রেইনপোঞ্চ। তবে আমাদের থেকেও প্রোটেকশন বেশি দরকার মধুর ক্যামেরার। তাই ওকে বললাম রেইনপোঞ্চটা পরে ক্যামেরাটা তার ভেতরে নিয়ে নিতে। রাজি হল। ওর ছাতাটা নিলাম আমি। দূর থেকে দেখলাম ছোটোখাটো ধাপের চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পাহাড়ের বুকে। মোট ১৭৫টি ধাপ। দুপাশে গাছের ডালের মতো বাহারি কংক্রিটের রেলিং, মাঝে মাঝে  কংক্রিটের বসার জায়গা। দুপাশে বর্ষার ঘন জঙ্গল। গাছ থেকে টুপটাপ জল পড়েই যাচ্ছে। নয়তো আকাশ থেকে বৃষ্টি। আশপাশ পাহাড়ের ঢেউ দিয়ে ঘেরা, পাহাড়ের ওপরের লেভেলটা মেঘে ঢাকা। বেশ দূর থেকেই চোখে পড়ল অনেক উঁচু থেকে নিচে ঝাঁপ দেওয়া জলের প্রপাত। ওপরে উঠতে তা যখন চোখের সামনে এল তখন তার ছড়িয়ে পড়া জলকণায় আমরা নাস্তানাবুদ। অনেক উঁচু থেকে একটিই প্রচণ্ড ধারায় তীব্র গতিতে জল যেন চোখকান বুজে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। পড়তে পড়তে তার আবার হাওয়ার সঙ্গে খুনসুটি চলছে - হাওয়ার টানে জলের শরীরে আলপনা দেওয়া চলছে। দেখে মনে হচ্ছে জলপরীর সাদা ওড়নায় হাওয়ায় ঢেউ উঠেছে।‌ নিরাপদ দূরত্ব থেকে ক্যামেরা বাঁচিয়ে ছবি তোলা হল। কিন্তু সেখান থেকে দেখাই যাচ্ছে না জলপরীর পা ফেলা নাচের মঞ্চটা। সেটা আবার একটু নিচে, নামতে হবে। কিন্তু ভিজে যাব পুরো। এখানে জলের আনাগোনা সব দিক থেকে। অথচ না দেখলেও জীবন ব্যর্থ। মধুকে বললাম তুই আগে যা। ও তো পোঞ্চতে প্যাক করা। আমাদের কাছে ক্যামেরা দিয়ে ও গিয়ে ঘুরে এল। তখন ওই পোঞ্চটা আমি পরে, আপাদমস্তক ঢেকে চললাম। সঙ্গে সর্বাণী। কাছাকাছি যেতেই চশমা পুরো ঝাপসা হয়ে টপটপ জল ঝরতে লাগল। মাথার ঢাকনাটা খুলে উড়ে যাবার জোগাড়। তাকে ধরতে দুহাত তুলতেই হাতার ফাঁক দিয়ে জলকণারা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরের খবর নিতে। পৃথিবীতে যখন এই সব ঘটে চলেছে তখন অবশ্য আমি জন্নতে - দেখছি ঊর্বশী-মেনকার দ্রুত পায়ের কাজের নৃত্য শৈলী। ওই নকশাকাটা হালকা রেশমের ওড়না নিচের জল ছুঁয়েই কি প্রচণ্ড গতিতে ঘূর্ণি তুলে হৈ হৈ করে ছুটে চলেছে দিকবিদিকশূন্য কে জানে কোথায়! এ সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কি দেখিলাম! কি দেখিলাম!! চর্মচক্ষু সার্থক হইল!!!





জুলাই ৪, ২০২৫ (৩)

এবার গন্তব্য গোনাসিকা। কেওনঝড় থেকে এর দূরত্ব ৩৩ কিমি। আমরা অবশ্য আসছি খণ্ডধার থেকে। সাধারণ বিশ্বাসে বলে এখানে পাহাড়ের ওপর গোরুর নাসিকা থেকে বৈতরণী নদীর জন্ম হচ্ছে। এটাই বৈতরণীর উৎস। এখানেও সিঁড়ি ভাঙা। ধাপের সংখ্যা ১৪৮। ওঠা নামায় দ্বিগুণ। এখানেও নিচু ধাপের চওড়া সিঁড়ি, কোথাও কোথাও মাথার ওপর ছাউনিও আছে। আশপাশে ঘন পাথুরে জঙ্গল। সেখানে এপাশ ওপাশে পাথরের ফাঁক দিয়ে ছোটো ছোটো জলের‌ ধারা বইছে। ওপরে উঠে একটি ছোটো ঘরের মতো মন্দির। তার সামনে নন্দীর অবস্থান। ভেতরে একজন পূজারী রয়েছেন। কয়েকটি দেবদেবীমূর্তী। একটি গোমুখ। তার নাসিকার দুই ছিদ্র দিয়ে অবিরাম জলের ধারা বয়ে চলেছে। আর আছে একটি গাছ, যাকে বলে বৃক্ষ। সেটি দুভাগ হয়ে ঘরের জানলা ফুঁড়ে দুই বিপরীত দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তারপর কোন গাছের দু'ডালের ফাঁকে নিজের ভার রেখে গলে গিয়ে, কোন গাছের গলা জড়িয়ে, আবার কার প্রায় কোলে চড়ে সে এক বিচিত্র বিস্তারে নিজেকে মেলে‌ ধরেছে। বহু প্রাচীন বৃক্ষ। কি গাছ জানিনা। ওই মন্দির কাম ঘরের মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট বস্তুই বেশি, বৃক্ষটি ছাড়া। তবে গতকাল যে বৈতরণী দেখে এসেছি ভীমকুণ্ডে তার উৎস এই গোনাসিকার ধারা বললে তেমন বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। হয়ত এই ধারাটিও বৈতরণীর অংশ হয়েছে, যার থেকে ভক্তজনের বিশ্বাসে এটাই উৎস হয়ে গেছে। ভক্তি আর যুক্তি তো হাত ধরে চলে না। অতএব ভক্তিতে কি না হয়! নামার সময় পাহাড়ের এক গুহার মুখও দেখলাম।





জুলাই ৪, ২০২৫ (৪)

এরপরের গন্তব্য সানাঘাগরা, যেটি পান্থনিবাস থেকে মাত্র ৫ কিমি দূরত্বে। সানাঘাগরাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পার্ক, পিকনিক স্পট, সেখানে জলাশয় আছে, তার মাঝখানে শিব বসে আছেন,  নিমীলিত চোখ। তাঁকে ঘিরে বোটিং -এর ব্যবস্থা। বোট ওল্টালে শিব চোখ খোলেন কি জানা নেই, তবে অল্প সাঁতরে তাঁর কোলে উঠে পড়া যায়। পার্ক সাজানো। কয়েকটি খাবারের দোকান আছে। প্রচুর আচার সাজানো থরে থরে। এসব ছাড়িয়ে আরও খানিক এগোলে সিঁড়ি শুরু। এখানে প্রথমে ওঠা, তারপর শেষের দিকে নেমে জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছনো। ধাপ মোট ১৭০। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চওড়া,নিচু নিচু ধাপ। যত অবধি উঠতে হয় সেই উচ্চতায়ও বিশাল পার্ক, সেখানে আছে সানাঘাগরা নেচার ক্যাম্প। থাকা যায়, তবে আমরা তো অতটা সময় পকেটে নিয়ে আসিনি। অতএব সানাঘাগরা দেখে ফেরা।

চড়াই পেরিয়ে উৎরাই সিঁড়ির শেষে বাঁদিকের পাথরের ফাঁক ফুঁড়ে বুলেটের মতো প্রবল শক্তি ও গতিতে জলপ্রপাতের আত্মপ্রকাশ। তারপর প্লাঞ্জপুলে ঘূর্ণি তুলে প্রবল বিক্রমে কয়েক মিটার এগিয়েই একটা বটলনেকের মতো পাথরের খাঁজ দিয়ে আবার কয়েক ফুট নিচে আছাড় খেয়ে আরেকবার ফুঁসে উঠছে। দুটো লেভেলে জলপ্রপাত। তীব্র গতিশক্তির। সিঁড়ির নিচের চত্বরে দাঁড়ালে ১৫ সেকেন্ডে আধাভিজে। বর্ষার ফুল ফ্লাশ প্রপাতের কি ভীষণ সৌন্দর্য! সানা মানে ছোটো। গুগল বলছে এটি সান মছকন্ডন নদীর ওপর একটি ছোটো জলপ্রপাত। নদীর নামের উচ্চারণ ঠিক লিখলাম না ভুল তা জানিনা, তবে জলপ্রপাতটি যে বর্ষায় আদৌ ছোটো নেই সেটা একশো ভাগ খাঁটি।

বৃষ্টির ঝিরি ঝিরি তো চলছেই। তারই মধ্যে এগরোল খেয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম বড়াঘাগরার দিকে।

সানাঘাগরা পার্কে প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ২০/-, আর ড্রাইভারসহ গাড়ির ৫০/-।





জুলাই ৪, ২০২৫ (৫)

সানাঘাগরার পার্ক থেকে বেরিয়ে হাইওয়ে পেরিয়ে বড়াঘাগরা যাবার রাস্তায় ঢুকতে হয়।‌ প্রায় ৫ কিমি। গুগল বলছে এটাও মচ্ছকন্ডন নদীর ওপর। ঠিক কি ভুল জানিনা। বড়াঘাগরার প্লাঞ্জপুলটি বিশাল। দেখে বোঝা যায় আগে বড়াঘাগরা সত্যি বড়ো ছিল, এখন সে তুলনায় ক্ষীণতনু। প্রায় ৬০ মিটার উঁচু থেকে ঝর্ণার জল নামছে। আগে যতগুলো জলপ্রপাত দেখে এলাম সে তুলনায় একটু দুবলা-পাতলা। জলের ধারার পেছনের পাথর এখানে দৃশ্যমান। এই দৌর্বল্যের কারণ হল বাঁধ। ঝর্ণার ওপরে এক বিশাল রিজার্ভার রয়েছে, সেখান থেকে জল নিয়ন্ত্রিত হয়ে ঝর্ণার পথে যাচ্ছে। ঝর্ণার প্লাঞ্জপুল থেকে ওপর অবধি সিঁড়ির ধাপ ১২২টি। আর ওই লেভেল থেকে রিজার্ভার অবধি আরও ৭৫টি। ৭৫ ধাপ উঠে, রিজার্ভার দেখে, আবার নামতে হয়েছিল। তবে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার ওই লেভেলে উঠে গিয়েছিল বলে ১২২ ধাপ আর নামতে হয়নি। বড়াঘাগরায় গাড়ির এন্ট্রি ফি ৫০/-। সারাদিনের পরে এবার পান্থনিবাসে ফেরা। আজ রাতে চাইনিজ - এগচাওমিন ও চিলি চিকেন।

No comments:

Post a Comment