- গল্প, দরজাটা বন্ধ করো।
সাড়া নেই। তাকে দেখাও যাচ্ছে না। উধাও হয়ে গেছে। তাই ভল্যুম খানিকটা বাড়িয়ে -
-
গল্পও -
গল্পওওও..
গল্পের বান্ধবী ময়রাদিদি রোয়াকে বসে আছে,
ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে। ভল্যুম বাড়ানোর পর সে মুখ বাড়িয়ে বলল - আরমান ইধর হ্যায়।
ইধার
হ্যায় তো সাড়া কিঁউ দেতা নহি – মনে ভাবতে ভাবতে দরজা পেরিয়ে বাইরে হাজির হয়েছি সে
নবাবপুত্তুর কি করছেন তা স্বচক্ষে দেখবার জন্যে। আমাকে দেখেই ময়রা তড়াক করে রক
থেকে রাস্তায় নেমে উত্তর দিকে মুখ করে আরমান ...... আরমান করে ডাকতে শুরু
করল। কোনো সাড়া নেই।
-
কিধার
গয়া?
-
আরমান
কুছ খোঁজ রহা হ্যাহ।
-
কেয়া?
-
কুছ
খো গয়া শায়দ।
-
কেয়া
খো গয়া।
-
মালুম
নহি।
-
সাইকেল
লেকে গয়া কেয়া?
-
সাইকেল
হি তো খো গয়া।
-
মানে?!
-
কুছ
দের পহলে আরমান উধার সাইকেল রাক্খা থা, চাবি দে কে রাক্খা থা। লেকিন আভি নহি
হ্যায়, কোই লেকে চলা গয়া!
ময়রা
ক্লাস সিক্স। আমাদের বাড়ির প্রায় কোনাকুনি বাড়িটা তার মামারবাড়ি। মামা
বাঙ্গালোরবাসী, তবে দাদু-দিদা এখানেই থাকেন। ডিসেম্বরের ছুটিতে ময়রা ও তার মাসতুতো
ভাই ইয়ুভান মামারবাড়িতে এসেছে। ইয়ুভান ক্লাস টু। গল্প ও আরমান একই ব্যক্তির ডাকনাম
আর ভালোনাম। সেও ক্লাস টু। ইদানিং সকাল দশটা থেকে রাত দশটা অবধি যেকোনো সময়ে
আশেপাশে যেকোনো জায়গায় – রাস্তায় রোয়াকে ছাদে সিঁড়িতে খাটের নিচে – এই তিনমূর্তিকে
নানান ক্রিয়াকাণ্ডে ব্যস্ত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। গল্প একেবারেই কাছাখোলা – বাড়ি
থেকে আটবার বেরোলে ষোলোবার দরজা হাট করে খোলা থাকে। ঘরে ঢুকে একটা আলো জ্বাললে
বেরোবার সময়ে আরেকটি আলো জ্বেলে রেখে বেরিয়ে যায়। তবে তর্কে সে অজেয়। প্রতিপক্ষকে
একেবারে ধ্বসিয়ে দেবে – যুক্তিতে নয়, দৈর্ঘ্যে। প্রতিটি কথার উত্তর তার মুখে মজুত।
ফলে ধৈর্যের শেষ সীমা পেরিয়ে, আজকাল তো চড়চাপড় ব্যান হয়ে গেছে তাই, প্রতিপক্ষ রণে
ভঙ্গ দেবে! এই যেমন, গল্প তার দ্বিচক্র যানটি বাড়ির সামনে রাস্তায় রাখবে – এপারে
বা ওপারে। তাকে অনেকবার বলা হয়েছে চক্কর মারা হয়ে গেলে রাস্তায় ফেলে না রেখে
সাইকেলটি বাড়িতে তুলে রাখতে।
-
কেন?সানিদাদা
বাইক রাস্তায় রাখে, পিকলুদাদা গাড়ি রাস্তায় রাখে, নান্টুজেঠু তার অটো রাস্তায়
রাখে, তোমার গাড়িও মাঝে মাঝে সারারাত রাস্তায় থাকে, তাহলে আমি কেন রাখবো না?
-
তোর
তো ছোটো সাইকেল, কে কবে তুলে নিয়ে চলে যাবে, তখন কি করবি?
-
আমি
চাবি দিয়ে রাখি।
-
তোর
ওই কুড়ি ইঞ্চি চাকার সাইকেল চাবি দেওয়া সমেত মাথায় তুলে নিয়ে চলে যাবে। সানির
বাইকটা চারশো সিসির, খুব ভারি, তুলে নিয়ে যেতে পারবে না।
-
যদি
মনে করে নিয়ে যাবে তাহলে তো পাঁচজন বাউন্সার ভাড়া করে এনে বাইক তুলে নিয়ে যেতে
পারে।
ব্যাস,
একবার এই যদির চক্রব্যূহে ঢুকে গেলে তো রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া বাঁচার রাস্তাই নেই!
ময়রা
ডেকে ডেকে হাল ছেড়ে দেবার পর পাশের গলি থেকে আবির্ভাব হল গল্পর। পাশের এই গলিতে
বহু মানুষের বাস। ঘর ও পথের তুলনায় বাসিন্দার সংখ্যা এতই বেশি যে সারাক্ষণই অগণিত
মানুষ ও তাদের সংসারের খানিকটা অংশ এই রাস্তার ওপরেই থাকে। পাড়ার দাদাদের
মোটরবাইক, ভাঙা বালতিতে পোঁতা তুলসীগাছ, কলাগাছ, বালতি ভরা সংসারের জল, পাখির
খাঁচা, বিকেলে রোলের দোকানের জন্যে পিঁয়াজ কুঁচোনো, ফুটপাতের রুটি-তরকারির দোকানের
আলু-পটল কাটা – কি নেই পথের এই এক্সটেন্ডেড সংসারে! তারই পাশ কাটিয়ে এই রাস্তা দিয়ে
সাইকেল, বাইক ও জঞ্জালের গাড়িও চলে। আর অবিরাম লোক। গুগল দেখায় না বটে, তবে দেখালে
এই রাস্তাকে সারাক্ষণ লাল রঙেই দেখাত। এত ব্যস্ততার একটা কারণ হল এই রাস্তা একটা
মোক্ষম শর্টকাট। সাইকেলের খোঁজে গল্প এই গলিতে গেছিল পরিক্রমায়।
-
কি
রে, তোর সাইকেল কোথায়?
-
দেখছো
তো খুঁজছি।
পরম
অবজ্ঞায় উত্তর ছুঁড়ে দিয়ে তিনি চরম ব্যস্ততায় ডানদিকে ঘুরে পার্কের দিকে চলে
গেলেন। ইতিমধ্যে ময়রা ও ইয়ুভানের – নেহি মিলা...কিধার গয়া... ইত্যাদি গুঞ্জনে দুটি
বাইক এখানে থেমে গেছে – একটি সানিদাদার আর অন্যটি তার বন্ধুর।
-কি হয়েছে? কি হয়েছে?
-সাইকেল উঠাকে লে
গয়া...
আমার ধুয়ো -গল্পর
সাইকেল চুরি গেছে।
-যেটা করে ও ঘুরে
বেড়ায়?
-হ্যাঁ। সানিবাবা,
তুই তো চিনিস ওর সাইকেলটা। একটু নজর রাখিস তো। কোথাও বা কাউকে যদি ওই সাইকেল নিয়ে
দেখিস।
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, চিনি
তো। ও এইখানটাতেই তো রেখে দেয়।
-ইধার সে হি তো উঠাকে
লে গয়া।
-ওর সাইকেল তো সবাই
চেনে। দীপ জানে?
-জানিনা। আমি তো এই
সবে জানতে পারলাম।
দীপ সানির বন্ধু,
গল্পের সদ্য কলেজ শেষ করা মামাতো দাদা। শুধু সানি নয়, দীপ, সানি আর পাপাই এ পাড়ার
থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। গল্পের মা আজ বাড়িতে। শনিবার তার অফিস বন্ধ থাকে। সে নিজের
ঘরে হয় দিবানিদ্রা নয়তো ওটিটিতে মগ্ন। আমি ওপরে উঠে তার দরজা নেড়ে এ হেন দু:সংবাদ
দিলাম। সে শুনে নির্বিকারভাবে বলল
–বেশ হয়েছে। তুমি নাতিকে
নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে এখন বিশ্রাম নিতে যাও।
সে নাহয় যাচ্ছি।
কিন্তু এর কোনো তাপ-উত্তাপ নেই কেন? সাইকেল গেল মানে কেউ নজর রেখেছে। আর নজর রেখে
থাকলে সে তো আর সাইকেলেই শেষ হবে না। বরং বলা যায় যে সাইকেল দিয়ে শুরু হল। এ তো
উটকো ঝামেলা এল পাড়ায়! নাতিকে নিয়ে মাথা নাহয় না ঘামালাম। কিন্তু এই ঝামেলার
ভাবনাটা তো মাথায় ঝামেলা করছে!
রাস্তায় এখন
তিনমূর্তির লাগাতার অনুসন্ধান পর্ব চলছে। কে সাইকেল তুলে নিয়ে গিয়ে কোন রাস্তায়
তার মালিকের জন্যে সাজিয়ে রেখে দিয়েছে সেই সন্ধানে গরুখোঁজায় ব্যস্ত তিনজনে। প্রায়
আধঘণ্টা পর শুনি রোয়াকে তিনজনের গলা পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে কি সাইকেল পাওয়া গেল? কিন্তু
কথাবার্তায় তেমন উচ্ছ্বাস নেই, বরং একটু তর্কাতর্কি চলছে। কি হল? আবার উঁকি দিলাম।
ওপরের বারান্দা থেকে আলোচনায় আড়ি পেতে বোঝা গেল যে সাইকেলের দেখা পাওয়া গেছে
পাপাইদাদাদের কোলাপসিবল গেটের ভেতরে। গেটে চাবি দেওয়া। সাইকেল দেখতে পেয়ে এবং সেটি
তালাচাবির মধ্যে থাকায় ওরা একদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত। তবে ওদের এই মুহূর্তের প্রশ্ন হল
– অপহরণটা কে করল? ময়রাদিদির মতে – পাপাইদাদাই করেছে, আবার কে? ইয়ুভান পুরো ঘেঁটে
গেছে, বলছে – পাপাইদাদা তো অত ছোটো সাইকেলে চড়তেই পারবে না, ও কেন করবে? আর গল্প
বলছে –চুরি হয়নি। পাপাইদাদা চুরি করতেই পারে না। এখানে নিশ্চয়ই অন্য ব্যাপার আছে।
যে ব্যাপারই থাক
আপাতত ওরা সাইকেল হাতে পাচ্ছে না, সে তো চাবির ভেতর। দরজা নেড়ে ডাকতেও ভরসা পাচ্ছে
না, কারণ কি করে কি হল তা এখনও বোধগম্য নয়। শেষ অবধি ঠিক হল যে ওরা দীপদাদার
শরণাপন্ন হয়ে পাপাইদাদাকে ফোন করাবে। দীপদাদাও বাড়িতে নেই। ফিরুক। এখন অপেক্ষা।
-কি হল, তুমি ঘরে
যাওনি? তখন থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছো?
-না রে, এই তো আবার
এলাম। জানিস, ওরা না পাপাইয়ের বাড়িতে সাইকেলটা দেখতে পেয়েছে।
-পাবেই তো! এই ভরদুপুরবেলা,
রাস্তায় কেউ কোত্থাও নেই, শুধু সাইকেলটা পড়ে আছে দেখে দীপ ওটা তুলে নিয়ে গিয়ে
পাপাইদের বাড়িতে রেখে এসেছে তো। তারপর পাপাইকে আর আমাকে বলে বেরিয়ে গেছে। খুঁজুক।
ওই সাইকেল চুরি করা যায় কিনা বুঝুক। আর চুরি গেলে কেমন লাগে দেখুক। যাও যাও, তুমি
এখন ঘরে ঢোকো। বাকিটা দীপ বুঝে নেবে!
-----