Wednesday, August 3, 2022

ভ্যালি অভ ফ্লাওয়ার্স ও হেমকুণ্ড সাহিব

 

July 16 – 25, 2022

১ম কিস্তি

জুলাই ১৬, ২০২২

আজ  সক্কাল সক্কাল সংসার ধর্মে ইস্তফা দিয়ে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পাহাড় টার্গেট করে। পাহাড় মানে হিমালয়। আর সেই হিমালয়ের উচ্চতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের এবারের আশাও বেশ উচ্চ। যাবার সংকল্প উত্তরাখণ্ডের ভ্যালি অভ ফ্লাওয়ার্স আর হেমকুণ্ড সাহেব! আমরা চারজন - দুজন অবসরপ্রাপ্ত, দুজন সামনের বছর পাবে। আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে চারজনের হাঁটু, কোমর, চোখ, কান, দাঁত (যে কটা করে আছে)। সবকটাই কার্যক্ষমতায় খামতিতে ভরপুর হলে কি হবে, সমস্যার মাহাত্ম্যে নিজেদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সদা সর্বদা প্রত্যেককে সজাগ রাখে। একটু যত্নআত্তি পেলে সাধারণত তেমন প্রব্লেম করে না। কিন্তু কখন যে অ্যাটেনশন সিকিং জেদি বাচ্চার মতো বেঁকে বসবে তা কেউ বলতে পারে না।  তবে ঘর-সংসার-ছানাপোনা-সোয়ামীকে ত্যাগ দিলেও এদের তো আর দেওয়া যায় না, তাই ..অগত্যা এই সব নিয়ে, পুঁটলি গুছিয়ে তৈরি হওয়া। আমরা বলতে মধুমিতা, সুজাতা, আমি (১৯৭৫শ্রী) ও সুজাতার প্রাক্তন কলিগ বর্ণনা। শেষ সময়ে আরও একজন যোগ দিয়েছে দলে - নিবেদিতা, মধুমিতার ছোটো বোন (১৯৮৪শ্রী)। নিবেদিতা দিল্লিবাসী। হরিদ্বার থেকে দলে যোগ দেবে।

১৬ ভোরে গৃহত্যাগ, ৮.৫০এ আকাশপথে শহরত্যাগ। ১৫ অবধি আমাদের যৌথ গবেষণার বিষয় ছিল লাগেজ কত কমানো যায় ও কি করে।  কয়েকটা আবিষ্কৃত ও নির্ধারিত নীতি হল - সুটকেস যতদূর সম্ভব পরিহার্য, ব্যাকপ্যাক বা রাকস্যাক আদরণীয়; আর কেউ ওষুধ, কেউ তেল, কেউ সাবান, কেউ ছুরি, কেউ আখরোট, কেউ চকলেট .......। পোশাক, গামছা আর ব্রাশ সবাই। 

আমাদের মধ্যে মধুমিতা তার জীবনের কম অংশই বাড়িতে কাটিয়েছে, বেশিটাই ও চলমান শরীরী - জলে-স্থলে-আকাশে, বা ড্রাইভিং সিটে/ পায়ের তলায় সর্ষে ও ব্যাকপ্যাক পিঠে।  তাই সেই সরষে চড়েই ১৫ রাতে আমার বাড়িতে।

ভোর ভোর স্নানপর্ব সেরে বেরিয়ে সাড়েছটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম বিমানবন্দর। এই সব বন্দর-

ও স্টেশনে পৌঁছলেই মনটা যেন শরীরের আগে আগে ছোটে, ফলে শরীরটা বেশ ভারমুক্ত হালকা ফুরফুরে হয়ে যায়! ঢোকার গেটে সুজাতা দাঁড়িয়ে, আর বর্ণনার আবির্ভাব চেকইনের লাইনে। ষোলোকলা পূর্ণ! ফেব্রুয়ারিতে এই বন্দর দিয়েই নৈনিতাল গেছিলাম। এখন তো প্রযুক্তির কল্যাণে নানান রকম পরিবর্তন হয়। আগের বারের তুলনায় এ বারে যে তফাৎগুলো দেখলাম তা হল গাড়ি ঢোকার সময়ে গুমটি থেকে হাতে আর টাইম দেওয়া কাগজ ধরালো না। অর্থাৎ এই এলাকায় গাড়ি সময়সীমা অতিক্রম করলো কিনা তার নজরদারি যন্ত্রে/ক্যামেরায় হচ্ছে। আগেরবারেই দেখেছি চেক ইন ব্যাগেজ স্ক্যান বন্ধ হয়ে গেছে। তার নেগেটিভ দিকটা এবারে বুঝলাম - ঐ যে ব্যাগে তালা দেওয়া না থাকলে স্ক্যান করার সময়ে একটা ওয়ানওয়ে প্লাস্টিক রিবন দিয়ে জ়িপদুটো আটকে দিত - সেই ফেসিলিটিটা আর নেই। এদিকে আমাদের রাকস্যাক আর ব্যাকপ্যাক। আমার একটা ছোটো নম্বর লক আছে। কিন্তু মধু ওই ননরিবনের অপেক্ষায় ছিল। কিছু একটা না আটকালে তো চেন খুলে নাড়িভুঁড়ি ছড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা। আমার ব্যাগে সেলোটেপ আছে। অতএব বের করো। ছুরিটাও চাই সেলোটেপ কাটার জন্যে। চেকইনের লম্বা লাইনের মাঝখানে ট্রলির ওপর দুটো ব্যাগ রেখে দুজনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই দুরূহ কাজটা সম্পন্ন করতে করতে এগোনো! হিপ হিপ হুররে লেভেলে করে ফেললাম! লেভেল আ্যাচিভ করার প্রমাণ হল কেউ পেছন থেকে গালাগালি দেয়নি।  আরেকটা তফাৎ হল - যে মেশিনটা থেকে শরশয্যায় ভীষ্মের জলপান সিস্টেমে সরাসরি মুখে খাবার জল পৌঁছে যায় সেটাতে আর হাত দিয়ে সুইচ টিপে জল বের করতে হয় না। হাতটা সুইচের সামনে নিয়ে গেলেই সেন্সার বাকি কাজটা করে দেয়।

সিকিউরিটি চেক পেরিয়ে লাউঞ্জে ব্রেকফাস্ট। এই সকালের দিকে লাউঞ্জে মাঝেমধ্যে বেশ ভীড় হয়। আজও সেই রকম একটা দিন। ফলে বুফেতে কখনও প্লেটের সাপ্লাই নেই, কখনও বাটির, কখনও আবার কোনো আইটেম ডিশের। এইসব মুশকিলে পড়লে মানুষের ইনোভেটিভ ইনসটিংক্ট জেগে উঠে বলে ওঠে - উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত, প্রাপ্য, ভক্ষ্য চ! তারই তাড়নায় মধু কাগজের গ্লাসে চিকেন সুপ খেল আর আমি উত্তপম জড়িয়ে চিকেন সসেজ খেলাম। হাই কোয়ালিটি মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ! ট্রাই করলে নিরাশ হবে না, গুরু নানকের দিব্যি বলছি। সুজাতা কফি মেশিনের বোতামের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গিয়ে কফিলাটের সঙ্গে এক্সট্রা দুধ মেশালো, তারপর তাতে একটা আরামের চুমুক মেরে বলল - দারুণ খেতে হয়েছে, (ইতি গজ..) শুধু যা কফি বলে বোঝা যাচ্ছে না! আর বর্ণনা এতই স্বল্পাহারী যে আমরা লজ্জায় আর ওর প্লেটের দিকে তাকানো বয়কট করলাম।

এসবের শেষে ইতিমধ্যে বোর্ডিং, ফ্লাইং কমপ্লিট। এবার দিল্লিতে ল্যান্ডিং হতে চলেছে। আমাদের আরেকটা অ্যাচিভমেন্ট হল - এবার পুরো প্রসেসটাই আমরা পেপারলেস করতে পেরেছি। অর্থাৎ পরের জেনারেশন খুব একটা হ্যাটা করতে পারবে না! ঘড়িতে এখন ১১.১৫। আবার যখন সময় সুযোগ হবে ........

১ম কিস্তির শেষ অংশ

 

দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের এক নম্বর টার্মিনাল। এখান থেকে গন্তব্য নিউ দিল্লি রেলস্টেশন। হাতে সময় আছে - ট্রেন ৩.২০তে। তাই এয়ারপোর্টে বসেই একটা কমন ওয়ালেট তৈরি করা হল খরচাখরচের জন্যে। সবাই তাতে কন্ট্রিবিউট করলাম। আর তার গুরুদায়িত্ব নিল বর্ণনা। এয়ারপোর্ট থেকে বেরোবার মুখে বন্দুকধারী ভাইসাহাবকে মেট্রো স্টেশনটা কোথায় জিগেস করতে খানিক দূরের নীল সাইনবোর্ডটা দেখিয়ে দিলেন। দুটো ট্রলি ঠেলে সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে হাওয়াতে ধুলোর ঘূর্ণি উঠল, আকাশে মেঘের কালো ভ্রূকুটি। তাড়াতাড়ি মেট্রোর শেডের নিচে সেঁধোলাম আর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। চত্বরটা সন্দেহজনকভাবে ফাঁকা। লোকজনকে জিগেস করে জানা গেল এটা ফাস্টট্র্যাক মেট্রোর স্টেশন নয়। সেটা হল অ্যারোসিটি স্টেশন। এই স্টেশন থেকেও নিউ দিল্লি যাওয়া যাবে - লাইন বদলে বদলে - জনকপুরী হয়ে - ঢেঁসকেল দিয়ে কটক - সময়ও অনেক বেশি। যাদের জিগেস করলাম তারা হলেন ট্যাক্সিওলা। স্বভাবতই তাঁরা বললেন - আড়াইশ টাকায় তাঁরা এখুনি অ্যারোসিটি পৌঁছে দেবেন। এটাই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। কারণ এয়ারপোর্টের শাটলবাসে লাগবে দুশো টাকা। বৃষ্টি কমেছে, কিন্তু থামেনি। তাই দরকষাকষির বৃথা চেষ্টা করেও আমরা রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু তারপরেই বুঝলাম ওদের গাড়ি এখানে নেই। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি পর্যন্ত  হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে। বৃষ্টিতে হাঁটবোই যদি তো এয়ারপোর্টেই ফিরব আবার, কতদূরে ট্যাক্সি আছে তা জানা নেই - সেখানে কেন যাব? এখন বৃষ্টি প্রায় ধরে এসেছে। অতএব আমরা প্রবল প্রতিবাদ করে ট্যাক্সিওলাকে ত্যাগ করে উল্টোদিকে হাঁটা দিলাম। এবার শাটলবাস, মাথাপিছু ৪০টাকা ভাড়া, আর পরের স্টপেজই হল অ্যারোসিটি!

এরপরের গল্পটা সোজাসাপ্টা - অ্যারোসিটি টু নিউ দিল্লি স্টেশন, সেখান থেকে ৩.২০তে হরিদ্বারগামী জন শতাব্দী । মাঝে ঝোলা থেকে বের করে মশলা ছোলা, রাষ্ট্রপত্নীর আরবী খেঁজুর (মিসেস কোবিন্দ পাঠিয়েছেন মধুমিতাকে), লজেন্স, আর স্টল থেকে কেক আর চাও আছে। আর আছে মাঝেমাঝে বৃষ্টি - ঝিরঝির থেকে ঝমঝম। এই সিজ়নে বৃষ্টিকে ডজ করে করেই এগোতে হবে। স্টেশন থেকে রিক্সা নিয়ে শ্রী গুরু সি়ং সভা গুরুদোয়ারা। আমাদের জন্যে ঘর রাখা ছিল। বাথরুমসহ তিনজনের ঘর, আরেকজন একটু চেপেচুপে হয়ে গেল এক বিছানায়। বাথরুমে কমোড! রাতে লঙ্গরে খানিকটা খেলাম, আর বাইরে থেকে রামদানার চাক এনে মিষ্টিমুখ করে শুতে গেলাম।

২য় কিস্তি

জুলাই ১৭, ২০২২

রাত বারোটায় তারিখ বদলে যায়। আর তারিখের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ললাটলিখনেরও বদল হল! সেই বদলটা বোঝা গেল আটটা বাজার পর। আপাতত ভোরের সূর্য দেখা যাক।

রাতে ফিসফিস শুনে ঘুম ভাঙলো। সুজাতা আর মধু কার ফোনে কতটা চার্জ হলো, এরপর অন্য ফোনটা লাগিয়ে দে .... ইত্যাদি সমাজসেবায় ব্যস্ত। ঘরে দুটো প্লাগপয়েন্ট, কিন্তু একটার কানেকশন নড়বড়ে। অতএব ওয়ান আফটার দ্য আদার, তার ওপর আছে ক্যামেরার চার্জার! তাই সারা রাতই কর্মকাণ্ড চলছে। তারপর আধো ঘুমে শুনতে পারছি একজনের পর অন্য জন বাথরুমে ঢুকল। খানিক পর, কতক্ষণ পর কে জানে, একটা চোখ কষ্টেসৃষ্টে ফাঁক করে দেখি দুজনে দুদিকে মুখ করে টানটান বসে আছে। পুজো বা যোগব্যায়াম কিছু একটা করছে হয়তো! ঐ সব আমার সিলেবাসের বাইরে। আবার পরে পিটপিটে চোখে দেখলাম দুজনেই শুয়ে পড়েছে, ঘুমোচ্ছে। তখন আমার মনে হল, দুজনেরই তো তাহলে চানটান কমপ্লিট। বর্ণনা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। অতএব আমাকে সেরে নিতে হবে। যদিও এখনও অন্ধকার তবুও সেরে রাখা তো ভালো। উঠে পড়লাম। চানটান সেরে একেবারে সকালে বেরোবার পোশাক পরে আবার শুয়ে পড়লাম বর্ণনার পাশে। আবার খানিক পরে ঘুমটা পাতলা হতে শুনি সুজাতা বা মধু জিগেস করছে - কটা বাজে? অন্যজন বলছে - চারটে চল্লিশ! কি হল?!

পরবর্তী খবরে জানা গেল, আমার আধাঘুমন্ত মগজ প্রচুর অনিয়ন্ত্রিত কাজকর্ম করেছে। মধু-সুজাতা তখন চানটান করেনি, শুধুই সমাজসেবা আর ব্লাডার খালি করেছিল। আরও পরে গভীর গবেষণায় জানা গেল আমার পুণ্যস্নানের মুহূর্তটি ছিল রাত দুটো মতো!

রাত কাবার। আমরা তৈরি। গাড়ি বুক করা আছে সাতটায়। নিবেদিতা বুক করেছে। গাড়ি এখনও রিপোর্ট করেনি নিবেদিতার হোটেলে। কোনো অ্যাডভান্সও নেয়নি। ঘনঘন ফোন চালাচালি। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে। টেনশন চড়ছে।  শেষমেশ জানা গেল ওরা গাড়ি দিতে পারছে না।  আমরা তখন চায়ের খোঁজে রাস্তায়। চা শেষ করেই চলো  গুরদোয়ারার অফিসে - ওরা যদি কোনো গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে পারে। ওরা একটা ট্রাভেল্স -এর ডিরেকশন দিল। গেলাম সেখানে। কোনারক ট্রাভেল্স। তারা বলল - হ্যাঁ, গাড়ি হবে, ট্যাভেরা, এখুনি হবে, এই দশ মিনিটে এখানে এসে যাবে। তবে যাওয়া-আসা বুক করতে হবে। গাড়ি গোবিন্দঘাটে নামিয়ে অপেক্ষা করবে, যা ২/৩ দিন লাগবে, তারপর সেখান থেকে তুলে, ঘুরিয়ে ছেড়ে দেবে। ফেরার পথে আমরা যাব গোবিন্দঘাট থেকে বদ্রীনাথ, তারপর হৃষিকেশ। টাকা অ্যাডভান্স করে পাশের দোকানে ব্রেকফাস্ট করতে ঢুকলাম। বলা হল, খেয়ে ঐ গাড়িতেই আমরা গুরদোয়ারা গিয়ে ব্যাগেজ তুলে বেরিয়ে যাব। Everything agreed uponখাওয়া হল – আলু-পরাঠা আর দই। ট্রাভেল্সের অফিসে বলল গাড়ি তো এই রাস্তায় ঢুকতে দিচ্ছে না, কাওয়ারিয়া-র জন্যে। তাই পেছনের রাস্তা দিয়ে গুরদোয়ারা চলে যাবে। তোমরা চলে যাও। গেলাম। সব গুছিয়ে নিয়ে গেটের কাছে চেয়ারে বসে আছি। গাড়ির দেখা নাই রে, গাড়ির দেখা নাই! ওদের অফিসে বলতে ওরাও ফোন করল। আরও বলল ঐ ট্রাভেল্সের লোক এদের সেক্রেটারি। দশ মিনিটে গাড়ি আসছে - তারপরে একবার বলে পেট্রলপাম্পে গেছে, একবার বলে গ্যারেজে গ্যাছে সামান্য কিছু রিপেয়ারের জন্যে, আবার কখনও বলে জ্যামে আটকা আছে। তবে প্রতিবারই বলে দস মিনট মে আ জায়েগী। এই করে করে পাক্কা তিন ঘন্টা কাটল।

এই ফাঁকে কাওয়ারিয়া হয়ে যাক।  কাওয়ার মানে বাঁক, কাওয়ারি হল যে কাঁধে বাঁক নেয়, আর পুরো শব্দটা বহুবচনের রূপ। শ্রাবণ মাসে শিবের মাথায় জল ঢালার ব্যাপার। তারকেশ্বর, দেওঘরের মতো হরিদ্বারের গঙ্গা থেকে জল নিয়ে মিরাটে বাবার মাথায়। পুরো হরিদ্বার ঠাসা ভীড়, সাধারণ মানুষের গেরুয়াপরা ভীড়, গেরুয়া ফ্ল্যাগসহ। শহরের প্রধান রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ। পুলিশ গাড়িতে বসে মাইকে নানান নির্দেশ দিচ্ছে। আর রাস্তার দুপাশে দোকানও বসেছে সেই রকম - গেরুয়া বারমুডা থেকে রুদ্রাক্ষের মালা, গাঁজার কলকে অবধি। ২৬ অবধি চলবে এরকম। গাড়ির গণ্ডগোলের অন্যতম হেতু কাওয়ারিয়া।

আড়াই ঘন্টার মাথায় মধু আর আমি আবার সেই অফিসে গেলাম দেখতে যে তাদের ঝাঁপ খোলা না বন্ধ। খোলা। এবং শোনা গেল যে তাদের গাড়ির রিপেয়ারের কাজই চলছে, আরও আধঘন্টা লাগবে। তাই ওরা অন্য কোনো কোম্পানির গাড়ি ঠিক করছে আমাদের জন্যে। এইসব ঝামেলা মিটিয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত বেরোলাম, সাতটার বদলে বারোটায়। বারোটায় বেরোলে আর সেদিন গোবিন্দঘাট পৌঁছনো যায় না। দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ পেরিয়ে কর্ণপ্রয়াগে থামা হল। কর্ণপ্রয়াগে ড্রাইভারই তার চেনা একটা হোটেলে দাঁড় করালো। রাতটুকু কাটানোর মতো ঘর। তিনটে খাট, রেলের কামরার এসি বাঙ্কের সাইজের। আর কিছু নেই ঘরে। পার বেড ২০০ টাকা। আমরা ৫ জন। বলল, দুটো ঘরে ছ''টা বেড। তাই আমাদের ১২০০ দিতে হবে।  শুরু হল বার্গেইন! আমরা বলি আমরা তো ৫টা নেব। সে বলে, আচ্ছা ১১০০দাও, ১০০ কমালুম। মধু বলে, আরে তুমি তো ১০০ বাড়ালে! সে রাজি নয়। আমরা বললুম- তুমি কোনো মহিলাকে ওটা অ্যালট করে দাও। সুজাতা বলল, ঐ বেডটা তুমি বের করে নাও। সে ছেলে হেসেই কুল পায় না। শেষ অবধি ঐ ১০০০এই রফা হল।

অন্যান্য খবর হল - হৃষিকেশে প্রচুর জ্যাম পেলাম। বিকেল অবধি কাঠফাটা রোদ, খুব গরম। বিকেলের পর স্বস্তি পেলাম। রাস্তায় চাকা পাংচার। তাকে বদলানো, পথে দোকান থেকে তাকে সারানো। এইসবই ছিল ললাট লিখন। নিজের এরিয়ায় মহাদেবের পারফরম্যান্স যাচ্ছেতাই। কোনো মুশকিলের আসান করতে পারেন নি, উপরন্তু চেলাচামুণ্ডা দিয়ে সব ভণ্ডুল করে সেখানে সেখানে বসে বা দাঁড়িয়ে আছেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে। কতটা গঞ্জিকা সেবন করে কে জানে!

---------  

৩য় কিস্তি

১৮/৭/২২

কর্ণপ্রয়াগ থেকে গোবিন্দঘাট, এনএইচ সেভেন ধরে প্রায় ১০০ কিমি। সেখান থেকে পুলনা গ্রাম, ৩ কিমি। এই পুলনা থেকে ঘাংঘারিয়ার যাত্রা শুরু। ১০ কিমি। যাঁরা ট্রেক করেন তাঁরা এইখান থেকেই হাঁটা শুরু করেন। অন্য অপশন হল – ঘোড়া আর পিট্টু। পিট্টু হল ঝুড়িতে বসা, সেই ঝুড়ি বাহক তার পিঠে বয়ে নিয়ে যাবে। সব রকম যাত্রীকেই ঘাংঘারিয়াতে দু’রাত থাকতে হবে। প্রথম রাত কাটিয়ে ২য় দিনে ভ্যালি অভ ফ্লাওয়ার্স এবং ২য় রাত কাটিয়ে ৩য় দিনে হেমকুণ্ড সাহিব। অথবা উল্টোটা। তবে যারা মূলত তীর্থযাত্রী তাদের অনেকেই ভ্যালিতে যায় না। আর যারা মূলত ট্যুরিস্ট তারা দু’জায়গাতেই যায়। আমরা তো ধর্মেও আছি জিরাফেও আছি।  যাক গে, প্রসঙ্গে ফিরি। এইসব স্টার্টিং পয়েন্টগুলো থেকে যাত্রা তো ভোরভোরই শুরু হয়। বেলা হয়ে গেলে ঘোড়া ইত্যাদি পাওয়া যায় কিনা জানা নেই। তার ওপর নিবেদিতা, মানে মিষ্টি, হাঁটবে। দেরিতে শুরু করলে পৌঁছতেও দেরি হবে। তাছাড়া ভোরে যত সঙ্গী পাবে বেলাতেও কি তা পাবে? জানা নেই।  তাই কালকের বিলম্ব মেক আপ করার জন্যে ঠিক হলো ভোর পাঁচটায় স্টার্ট করব। চান সেরে পাঁচটার আবছায়া অন্ধকারে গাড়ির চাকা গড়ালো।  ১ম দাঁড়ানো চামোলির গরুড়গঙ্গাতে। একটা ছোটো রেস্টুরেন্ট। তার পাশ দিয়ে গরুড়গঙ্গা নামছে ধাপে ধাপে ঝর্ণা হয়ে। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম, পা ছাড়ালাম, আশপাশ দেখলাম, ছবি তুললাম। রেস্টুরেন্টে চা ছাড়া কিছু খাইনি। টয়লেট ব্যবহার করলাম। ড্রাইভার মনীশ ব্রেকফাস্ট করল। আমরা খেলাম সঙ্গের ড্রাইফ্রুটস আর রডোডেনড্রন জুস। কাল রাতে যে হোটেলে ছিলাম সেখানে রডোডেনড্রন জুসের সিল করা দু’লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছিল। নতুন জিনিস। টেস্ট তো করতেই হবে। অতএব নিয়ে নাও। এখন সিল ভেঙে বোতল থেকে সবাই সিপ করে করে খাও। চারদিন ধরে খেয়ে শেষ করেছি দু’লিটারকে। পিপলকোটি জোশীমঠ সব পেরিয়ে গোবিন্দঘাট পৌঁছলাম প্রায় ন’টায়। কাল দেবপ্রয়াগ থেকেই আমাদের সঙ্গী অলকানন্দা। প্রথমে অনেক নিচে, পাহাড়ের খাড়া গা বেয়ে তার নদীখাত ক্রমশ গভীর হয়েছে। আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে জ্যান্ত ভূগোল, মধুমিতা। বোকারোয় কলেজের অধ্যাপিকা। ফিজিক্যাল জিওগ্রাফির লেকচার শুনতে শুনতে যাচ্ছি। অলকানন্দার উৎস বদ্রীনাথের পেছনের গ্লেসিয়ার থেকে।  এই পাহাড়ের তখন নেহাৎই কচি বয়স। তাই অলকানন্দার প্রবল জলের ধারা পাথর ক্ষইয়ে ক্রমশ নদীখাতকে গভীর থেকে গভীরতর করেছে। আমরা এখন নদীর গতির উল্টোপথে যাচ্ছি। তাই নিচের দিকে দেবপ্রয়াগে গাড়ি থেকে নদী দেখাই যায় না, নেমে দেখতে হয়। যত ওপরের দিকে উঠছি নদীখাতের গভীরতা কমতে কমতে নদীকে পাশে পাচ্ছি। কখনও ব্রিজের ওপরে উঠে তাকে পেরিয়েও যাচ্ছি।  আর বদ্রীনাথে তো নদী ওপর থেকে নামছে। মধুমিতা আরও চেনাচ্ছে – এই ভরা বর্ষায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা অসংখ্য জলধারার কোনটা নদী, কোনটা ঝর্ণা, কোনটা কত পুরোনো, পাহাড়ের কোনদিকে এবার বৃষ্টি বেশি হয়েছে, পাহাড়ের কোন দুটো অংশ আগে কোনো সময়ে এক ছিল, এখনও দুপাশ থেকে ঠেলে দিলে কেমন খাঁজে খাঁজে লেগে যাবে, এর ওপর দিয়ে নদী বইতে বইতে পাথর ক্ষইয়ে পাহাড়টাকে দুটো ভাগ করে ফেলেছে ইত্যাদি। আবার মাঝে মাঝে নিজেই বিরক্ত হয়ে বলছে – আমি আর এরকম জ্ঞান দিয়ে বোর করব না! তখন আবার আমরা বলছি – আমরা তোকে ফিজ দিচ্ছিনা বলে রাগ করছিস? এইভাবে শুনতে শুনতে শিখতে শিখতে মজা করে যাচ্ছি। জিওগ্রাফির ওপর নির্ভর করে আরও একজন – আমাদের ড্রাইভার মনীশ! সে থিওরি জানে না। কিন্তু এই অঞ্চলের পালসবিট বোঝে। কখন পৌঁছবো, কখন ফিরবো – এসবের উত্তরে সবসময়েই সে বলছে – অগর রাস্তা ক্লিয়ার হো তো! এখানে অহরহ ধ্বস নামে। এই অঞ্চলের রাস্তার পাশের পাহাড় অধিকাংশই কাদামাটির, শক্ত পাথর কম। আবার খাদের ওপারের পাহাড়ে দেখছি শক্ত পাথর। পাহাড়ের বয়স, প্রকৃতির খামখেয়াল, মানুষের দখলদারি আর রাজনীতি – সব মিলেমিশে খোদার ওপর বেহিসেবি খোদকারি করতে গিয়ে মানুষ নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনছে।  পথে আনেক জায়গায় ধ্বস নেমে আছে, দেখলেই বোঝা যাচ্ছে দু-একদিনের মধ্যে হয়েছে। বর্ষায় এই কাদামাটির পাহাড় থেকে এটাই স্বাভাবিক! তবে আমাদের কপাল ভালো সব জায়গাতেই একটা গাড়ি যাওয়ার মতো পথ রয়েছে। সেটুকুও না থাকলে আটকে যেতে হতো, যার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল ড্রাইভারের কথায়!

গোবিন্দঘাটে একটা পয়েন্টে পৌঁছে মনীশ বলল – এই গাড়ি এই পয়েন্ট পেরিয়ে আর যাবে না। এই পাশের রাস্তে ধরে নেমে যাও, খানিকটা গেলে পুলনার গাড়ি পাবে। কিছু রেখে যাওয়ার হলে গাড়িতে রেখে যেতে পারো।  মনীশের ফোন নম্বর আমাদের কাছে আছে। ও আমাদের নম্বর নিল।  তারপর আমরা যে যার ব্যাগপত্তর কাঁধে গলায় গয়না মেডেলের মতো ঝুলিয়ে, হাতে জলের বোতল, জুতোর থলে, রডোডেনড্রন জুস, টুকিটাকি সর্বস্ব সংসার সামলে নিয়ে রওয়ানা দিলাম। ৫০০ মিটার মতো হেঁটে হাজির হলাম একটি বড়ো গুরুদোয়ারার সামনে। আমি আর মধু গাড়িতে চপ্পল পায়ে ছিলাম।  গাড়ি এমন ভূমিকাবিহীনভাবে থেমেছে যে আমরা তাই পরেই জুতোর থলে হাতে নিয়ে নেমে পড়েছি। বেশ রোদ রয়েছে, হাঁটতে অনেক শক্তিক্ষয় হচ্ছে।  আমি আবার টয়লেটে যাব। গুরুদোয়ারার বাইরে গাছের ছায়ার নিচে অসংখ্য মোটরবাইক পার্ক করা। বাকিরা সেখানে দাঁড়ালো, আমি গেলাম গুরুদোয়ারার ভেতরে।  প্রয়োজন মিটিয়ে, সামনের বেঞ্চে বসে জুতো বদলে এসে সবাই আবার হাঁটতে শুরু করলাম। সামনে একটু চড়াই ভেঙে পিচের রাস্তা। সেখানে পরপর টাটা সুমো, বোলেরো ইত্যাদি বড়ো গাড়ি দাঁড়িয়ে, যাবে পুলনা, শেয়ারে, সিটপিছু ৫০ টাকা। উঠলাম।  আমাদের সঙ্গে উঠল চারটি শিখ ছেলে। এখনও দুটো সিট বাকি। ভরলে তবে যাবে। ও হ্যাঁ, মিষ্টি যেহেতু হাঁটবে পুলনা থেকে তাই ও অপেক্ষা না করে ইতিমধ্যেই কোনো গাড়িতে চলে গেছে।  আমরা চারজন যাচ্ছি এই গাড়িতে।  ড্রাইভার এসে বলল, আমরা দু’দল যদি বাকি দুটি সিটের টাকা দিয়ে দি তাহলে সে এখনই গাড়ি ছেড়ে দেবে, দেরি করবে না। শিখ ছেলেগুলি তাতে রাজি হল না, বলল – আমাদের অনেক টাইম আছে, আমরা অপেক্ষা করব সিট দুটো ভর্তি না হওয়া অবধি। মনে হল ওরা ছাত্র, তাই প্রচুর হিসেব করে চলতে হচ্ছে। গাড়িতে বসে বসে আলাপও হয়ে গেল। আমরা হেমকুণ্ড সাহিব যাব শুনে খুব ইম্প্রেসড ওরা। ওরা তো হাঁটবে। আমরা একবার বলেই ফেললাম – তোমরা একটা সিটের দাম দাও, আমরা একটার, তাহলে তাড়াতাড়ি হয়। ওরা রাজি হল। ইতিমধ্যে দেখা গেল ড্রাইভার দু’জনকে পেয়ে গেছে! সমস্যার সমাধান! গাড়ি স্টার্ট করল। গোবিন্দঘাটে বেশ গরম ও হিউমিড আবহাওয়া, যাকে বলে পচাগরম।  গাড়ি ছাড়তে হাওয়ায় একটু স্বস্তি হল। প্রথমেই একটি ছোটো ব্রিজ, অলকানন্দা নদীর ওপর দিয়ে। এই ব্রিজে একবারে একটি গাড়ি পার হবে। ওপারের গাড়ি থেমে থাকবে, এপার থেকে একটি একটি করে যাবে, তারপর আবার এপার থেমে থাকবে....

পুলনায় যাত্রা শুরুর মুখে ঘোড়া-সহিস, পিট্টু আর যাত্রীর মেলা। একটু বেলা হয়েছে বলে কোনো কমতি নেই। তার মধ্যেই দরদাম করে সব ঠিক করতে হবে। আর যারা হাঁটবে তারা একটি বা দুটি লাঠি কিনে নিয়ে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে। লাঠি এখানে বেতের, হালকা। কেউ কেউ মেটালের ফোল্ডিং লাঠি সঙ্গে নিয়েই এসেছে। অমি আর মধু যাব ঘোড়ায়, মাথাপিছু ১৯০০/- টাকা একপিঠ। আমাদের একটা করে পিঠের ব্যাগ, মধুর ব্যাকপ্যাক আর আমার রাকস্যাক। ও দুটোও ঘোড়ার ওপর আমাদের পিঠেই থাকবে। সুজাতা আর বর্ণনা যাবে পিট্টুতে। মাথাপিছু ৫০০০/- একপিঠ। এই টাকার মধ্যেই পিট্টুওলারা একজন পোর্টার নিয়ে নিল ওদের ব্যাগের জন্যে – একজনের ব্যাকপ্যাক, অন্যজনের চাকাওলা ডাফলব্যাগ। যাত্রা শুরু, শুরুতেই দু’দলের ছাড়াছাড়ি, কারণ দু’দলের গতির স্পিড ভিন্ন। আমার আর মধুর দুটো ঘোড়ার জন্যে একজন সহিস। পথ ১০ কিমি, চড়াই-উৎরাই মেশানো, ৫,৫০০ থেকে ১০,২০০ ফিট আলটিচিউডে পৌঁছনো। চড়াই পথে ঘোড়ার পিঠে সামনে ঝুঁকে বসতে হয়, আর উৎরাইতে পেছনে হেলে। সহিস একজন, তাই একটি ঘোড়ার পেছনে অপরটি বাঁধা। ঘোড়ার চলার কথা আগুপিছু করে, কিন্তু আমারটি তা থোড়িই কেয়ার করে! সামনেরটি খাদের দিক দিয়ে হাঁটছে, আর আমারটি পাহাড়ের দিকে ঢুকে পড়ে পাশাপাশি হাঁটতে চাইছে।  ফলে মাঝে মাঝেই আমার ডান হাঁটুটি দুটি ঘোড়ার মধ্যে স্যান্ডুইচ হয়ে যাচ্ছে। আমি তটস্থ! এইভাবেই চলতে লাগলো। একসময়ে বুঝলাম স্যান্ডুইচ এক-আধবার হলেও পিষে হাড়গোড় উল্টোপাল্টা হবার চান্স নেই। ইতিমধ্যে হঠাৎ দেখি মধুর পিঠের ব্যাগ থেকে জামাকাপড় পড়তে শুরু করেছে।  আমি পেছনে বলে দেখতে পাচ্ছি। হয়েছে কি, ওর ব্যাকপ্যাকের বড় পকেটের চেন দুটো ব্যাগের ওপরদিকে মুখোমুখি তোলা ছিল, ঘোড়ার চলনের চাপে তারা দুটিতে দু’মুখে সরে যাচ্ছে আর মুখ ফাঁক হয়ে জিনিস ঝরছে! সহিসকে বলতে সে সবকিছু কুড়িয়ে এনে ব্যাগে পুরে দুটো জিপকেই পাশে এক প্রান্তে করে দিতে সমস্যা মিটল। মাঝে আধঘণ্টার ব্রেক হল একটি খাবার দোকানে। জায়গাটি খুব সুন্দর। সামনেই দেখা যাচ্ছে দুটি পাহাড়ী নদী একে অপরের সঙ্গে মিশে এক হয়ে গেছে। একটির নাম হেমগঙ্গা, আর অন্যটির কাক ভুশুণ্ডী। দুটি নামের দুরকম বাহার। অনেক যাত্রীই এই দোকানে থেমেছে। উনুনে প্রেসার কুকার চড়ানো। মেনু লম্বা-চওড়া নয় – সব্জি, ভাত, খিচুড়ি। সবই গরম গরম। এছাড়াও লজেন্স, চকলেট, কোল্ড ড্রিংকস ইত্যাদি পাওয়া যায় এখানে। দোকানের পেছনে একটি কল, তাতে কনকনে ঠাণ্ডা জল। কোনো ঝর্ণা বা নদী থেকে পাইপে করে টেনে আনা। হয়ত বা কাক ভুশুণ্ডীরই জল! ভুশুণ্ডী শুনলেই মনে হয় অন্ধকার কালো। তবে কলের জলে ভুশুণ্ডীর ছায়া নেই, বরং কাকের সঙ্গে যোগ আছে। কাকচক্ষুর মতো স্বচ্ছ টলটলে জল!  আমরা দোকানে টেবিল-চেয়ারে বসে নিজেদের খাবারই খেলাম। তারপর আবার ঘোড়ায় ওঠা। রাস্তা খুব সরু নয়, অনেক দোকান। পথে কোথাও কোথাও বসার জায়গা আছে। মাঝে দু’জায়গায় পরিচ্ছন্ন টয়লেট কমপ্লেক্স রয়েছে। তবে এসবের সুবিধে ট্রেকাররাই পায়। ঘোড়া বা পিট্টু নিজেদের সুবিধের জায়গায় দাঁড়ায়, এখানে নয়। আরেকটা অসুবিধে হল ঘোড়ায় চড়ে ছবি তোলা যায় না। ঘোড়ার সিটের সঙ্গে লাগানো লোহার শিকের অর্ধচন্দ্রাকৃতি হ্যান্ডেলটি দু’হাতে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ধরে থাকতে হয়। নিজের নিরাপত্তার কারণেই ছাড়ার উপায় নেই! এমনকি যখন রোদে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, আর ঐ হ্যান্ডেলেই ঝোলানো ছোট্টো ব্যাগে জলের বোতল রয়েছে, তখনও হাত দিয়ে সে বোতল বার করতে ভরসা পাইনি। পথে একজন হাতে পাকা আমের স্বাদের লজেন্স ধরিয়ে দিলেন। দাঁত দিয়ে তার খোলস ছিঁড়ে মুখে পুরে গলা ভিজিয়েছি।  দু’চোখ ভরে দেখতে দেখতে যাচ্ছি প্রকৃতির অসামান্য রূপ, কিন্তু দু’হাত ছেড়ে ছবি তোলা! অসম্ভব! ভাবলাম যারা পিট্টুতে রয়েছে ওরা ছবি তুলবে। কিন্তু না:! ওরা পৌঁছে বলল যে ওরা সারা রাস্তা শুধুই আকাশ দেখতে দেখতে এসেছে। বাহক চলছে পিঠ বেঁকিয়ে, সেই পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে ওরা সদাসর্বদাই আকাশমুখী! আমরা দেখলাম কিন্তু ছবি তুলতে পারলাম না, ওরা ছবি তুলতে পারতো, কিন্তু দেখতেই পেল না!

প্রায় একটা নাগাদ মধু আর আমি ঘাংঘারিয়া পৌঁছে, টাকাপয়সা মিটিয়ে পথের ধারে বসে রইলাম খানিকক্ষণ। শরীরের ভেতরে বাইরে তখনও ঘোড়ার দুলকি চাল, পা টলমল। শেষের অনেকটা রাস্তায় মেঘ পেয়েছি। এখনও মেঘ যেন আরও ভারি হয়ে ঝুলে রয়েচে, যে কোনো মুহূর্তে টুপটাপ ঝরিয়ে দিতে পারে। খানিক ধাতস্থ হয়ে হাঁটা শুরু করলাম। মধু বসেই রইলো। সামান্য চড়াই। আমাদের বুকিং কুবের হোটেলে। এখানে তিনটে কুবের হোটেল – কুবের ইন, কুবের অ্যানেক্স আর কুবের। আমাদের বুকিং এই তৃতীয়টায়।  জিগেস করে করে পৌঁছে গেলাম। হোটেলের মালিক আমন। সর্বক্ষণ সে কাউন্টারে থাকে। তার সঙ্গে ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে আমারই অনেকবার কথা হয়েছে। তাকে আমার প্রথম প্রশ্ন – ভ্যালি খোলা আছে কিনা? বলল – হ্যাঁ, খোলা। তারপর ঘর দিল। দোতলায়, বারান্দার শেষ প্রান্তে, চারবেডের ঘর। দুটো কিং সাইজ ডবল বেড, বিছানা-বালিশ-লেপ-কম্বল ভালো, অ্যাটাচড বাথরুম উইদ কমোড। ব্যাগ রেখে আবার বেরোলাম মধুর খোঁজে। সামনেই  পেয়ে গেলাম ওকে। বললাম – একটা ভালো খবর আছে। ও বলল – ভ্যালি খোলা! ঘোড়াওলার কাছ থেকে জেনেছে। ও ব্যাগপত্তর সামলে ঘরে ঢুকে লেপের তলায় সেঁধিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।  আমার খিদে পাচ্ছিল। হোটেলের উল্টো দিকেই গুরুদোয়ারা। ওখানে ঢুকে দেখি লঙ্গর চলছে তখনও। একটা রুটি, একটু ভাত-ডাল খেয়ে নিলাম।  সব গরম পরিবেশন করছে। খাবার জলটাও গরম জল মেশানো। খেয়ে আরাম হচ্ছে গলার। এই গুরুদোয়ারাটি বেশ বড়। অনেক ঘর। ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ পদ্ধতিতে ঘর দেয়। ঘর ফুরোলে ডর্মেটরি, এটা ফ্রি। সাথে ফ্রি লঙ্গর তো আছেই। লঙ্গর চলে সারাদিন, রাত অবধি। ক্লোকরুম আছে। ডিসপেন্সারি ও আউটডোর চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। হেমকুণ্ড সাহিব যাত্রীদের ৯৯ শতাংশ এই গুরুদোয়ারায় রাত্রিবাস করে পরের দিন সকালে যাত্রা শুরু করেন। বাকি একাংশ হোটেলে থাকেন।

এরপর এসে পৌঁছলো পিট্টুর যাত্রীরা। সবশেষে ট্রেকার মিষ্টি। ওর ঘর একতলায় একটা ডবলবেড রুম। ওর ঘরের গিজার কাজ করছিল না। পরেরদিন ওকেও দোতলায় আমাদের পাশেই ঘর দিয়ে দিল। আমরা ওর গিজারের সুবিধেটা পেলাম, সংখ্যায় একটা বাথরুমও বাড়লো। মিষ্টিরও খিদে পেয়েছিল। ওর লঙ্গরে যাবার মতো এনার্জি অবশিষ্ট ছিল না। ও হোটেলেই চাউমিন খেল।  এখানে আমাদের বুকিং - ঘর, সঙ্গে ব্রেকফাস্ট আর ডিনার। মিষ্টি আলাদা বুকিং করেছে। শুধুই ঘর। তবে এখানে পৌঁছে ও-ও আমাদের মতোই ব্রেকফাস্ট+ডিনার প্যাকেজে নাম লেখালো। সবাই পৌছনোর সঙ্গে সঙ্গেই পিট্টুওলারা পরের দিনের বুকিংএর জন্যে এসে গেল। এখানে পিট্টু আর পালকি বাহকেরা নেপাল থেকে আসে। তারা নেপালী। আর ঘোড়াওলারা লোকাল মানুষ।  নেপালীরা রোজগারের আশায় এখানে আসে। তাঁবু করে দল বেঁধে থাকে আর পিট্টু-পালকি বয়। কাল আমাদের চারটে পালকি লাগবে। মিষ্টি হাঁটবে। পালকিতে যাওয়া-আসা ভ্যালিতে।  দু’পিঠ রাস্তা মিলিয়ে পালকি পিছু ৮০০০/- টাকা। ষোলোজন পালকিওলার ভ্যালিতে ঢোকার টিকিটও আমরা কাটবো। এই ডিল ফাইনাল হতেই ওদের একজন লিডার তার গলায় ঝোলানো আইডেনটিটি কার্ডটা আমাদের কাছে জমা রেখে চলে গেল। এটাই রেওয়াজ। ওরা আমাদের ও আমাদের হোটেল চেনে।  আমাদের দরকার হলে এই কার্ড দেখিয়ে ওদের খুঁজে নেবো। কাল সকাল সাতটায় ওরা পালকি নিয়ে হাজির হয়ে যাবে। আমরা তার মধ্যে ব্রেকফাস্ট সেরে তৈরি থাকব। হোটেল সাড়েছটায় ব্রেকফাস্ট দিতে পারবে। বুফেতে ডিনার করতে করতে এইসব কথাবার্তা সেরে আমরা সবাই শুতে গেলাম।

---------

৪র্থ কিস্তি

১৯/৭/২২

আজ সকালে যাত্রা পুষ্প উপত্যকা, ভ্যালি অভ ফ্লাওয়ার্স, ফুলোঁ কি ঘাঁটি। ইউনেস্কো অধিকৃত ন্যাশনাল পার্ক। 3500 মিটার উচ্চতা। এই ভ্যালি সম্বন্ধে গুগল ভগবানের বাণী রিপিট করে আমি আঙুল ব্যথা করব না। সকাল সাতটায় বেরোনো। সাড়ে ছটায় ব্রেকফাস্ট দিয়ে দেবে হোটেল বলেছে। যাব চারজন ডুলি বা পালকিতে। নিবেদিতা হেঁটে। পালকির সঙ্গে কালই রফা হয়ে গেছে - আট হাজার করে নেবে পালকি পিছু, আর মোট ষোলোজন পাল্কিবাহকের টিকিট আমরা করব। দেড়খানা আলুপরাঠা খেয়ে পিঠে একটা ছোটো কাপড়ের ব্যাকপ্যাক আর কোমরে পার্স নিয়ে উঠে বসলাম আমার পালকিতে। আমাদের অর্থমন্ত্রী বর্ণনা হলেও এই ট্যুরটার কোষাধ্যক্ষ আমি।

ভ্যালি অভ ফ্লাওয়ার্স এমন একটি দ্রষ্টব্য যা দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে ও খোলা থাকে বর্ষাকালে। ফুল তখনই ফোটে। প্রাকৃতিকভাবে। আগের বছরের ফুল থেকে ঝরে পড়া বীজ বরফ গলে যাবার পর যথানিয়মে চারাত্ব পেরিয়ে,গাছত্ব লাভ করে, ফুল... ফল...বীজ ইত্যাদির চক্র চলে। আর এই বর্ষাকালই হল পাহাড়ের যত্ত নাচনকোদনের সময়। ধ্বস, মেঘভাঙা বৃষ্টি, সব অনাসৃষ্টি। কদিন আগে কাগজে পড়েছি ভ্যালি খুলেছে জুনের এক তারিখে। তারপরে পড়লাম হেব্বি বৃষ্টিতে রাস্তা ভেঙে, পাহাড়ে ফাটল হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। কুবের হোটেলে খোঁজ নিতে তারা বলেছে রাস্তা একদিন বন্ধ ছিল, পরদিন আবার খুলে গেছে। হরিদ্বার ও গোবিন্দঘাটে শুনেছি ভ্যালি বন্ধ। আমরা যখন চারদিন গাড়ি রাখার প্ল্যান করছি তখন ট্রাভেলসের লোকও বলেছে যে তোমাদের তিনদিন লাগবে, ভ্যালি বন্ধ। কে যে ঠিক বলছে! গতকাল ঘোড়া থেকে মাটিতে পা দিয়েই লোকজনকে জিগেস করে জেনেছি যে ভ্যালি খোলা। কি স্বস্তি!

চারজন পালকিবাহক কাঁধে পালকি তুলল - সঙ্গে সঙ্গে জেনে গেলাম চারজনের কাঁধে উঠতে কেমন লাগে। এরপর গাড়িতে বা কাঁধে যাতেই নিয়ে যাক না কেন অভিজ্ঞতাটা তো জ্যান্তে হয়ে রইল! এর পর শুরু চলন। মিলিটারিরা কাঁধে কফিন নিয়ে ঠিক যে রকম তালে তালে পা মিলিয়ে হাঁটে, তেমনই। বসে বসে লক্ষ করছিলাম কি অসাধারণ সিংক্রোনাইজ করা। চারজন একসঙ্গে পা ফেলছে, কয়েক মিনিট অন্তর কাঁধ বদলাচ্ছে। বদলাবার আগে একজন মুখে বলছে ও সামনের দুজন একসাথে কাঁধ বদলাচ্ছে। পিছনের দুজনকে তো দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাই জানিনা চারজনেই একসাথে কাঁধ বদল করছিল কিনা। সামনের দুজনের কথাই বলি। দুজনেই বাঁ কাঁধ বা দুজনেই ডান কাঁধে।  চড়াইতে ওঠার সময় একটু ঢিমে লয়ে পা ফেলা, ধন ধান্যে পুষ্পে ভরার লয়; উৎরাইয়ে সামান্য দ্রুত লয়ে। এবার পথের খবর।  সরু পাথর সাজানো পথ, কোথাও কোথাও দুজন পাশাপাশি যাবার মতো যথেষ্ট জায়গা নেই, কোথাও পাথর ঢকঢকে। তার ওপর হাত বাড়ানো গাছের ডাল বা হেলে পড়া গুঁড়ি। মাথা বাঁচিয়ে চলতে হচ্ছে, ওদেরও আমাকেও। এই পথে কোনো দোকান, চা বা টায়ের ব্যবস্থা নেই। আশপাশ স্বর্গীয়। খাড়া উঁচু চাঁচাছোলা পাহাড়, তার মাথায় মেঘের আশ্লেষ, গভীর নদীখাত, নিচে খরস্রোতা নদী। নদীর ওপর পাথরে কাঠ পেতে তার ওপর করোগেটেড টিন পেতে ছোটো ছোটো পায়ে পেরোনোর ব্রিজ। সেই ব্রিজের আওতায় এলেই চোখেমুখে জলের কণা! এইভাবে প্রথমে পেরোলাম হেমগঙ্গা নদী। আর ভ্যালির মুখে পুষ্পবতী। পুষ্পবতী হেমগঙ্গাতেই মিশেছে।

চলা শুরুর আধ কিলোমিটার পরেই ভ্যালির অফিস, সেখান থেকে টিকিট বা পর্চি করাতে হবে। নাম বয়স লিঙ্গ ও আধার কার্ড নম্বর দিতে হবে, আধার কার্ডটিও দিতে হবে। জনপ্রতি ১৫০ টাকা। তবে আমাদের চারজনের লেগেছে হাফটিকিট - সিনিয়র সিটিজেনের সুবিধে। পালকিবাহকদেরও টিকিট করতে হয়। সেটাও আমরাই করলাম। এই পথে কোনো পশু চলাচলের অনুমতি নেই। তাই ঘোড়ার ব্যবস্থা নেই। ফিরে আসার পর শুনলাম আগে ভ্যালিতে প্রচুর ছাগল চরত। ইউনেস্কো সেটা বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ ছাগল ফুল খেয়ে নেয়। অন্য দিকে ছাগল তাড়াবার ফলে ফুলও কমে গেছে, কারণ সারের পরিমাণ কমে গেছে!

যেতে যেতে একবার বৃষ্টি এল। গাছের নিচে পালকি নামিয়ে বাহকরা বলল রেইন কোট পরে নিতে। আমার পিঠের ঝোলাটা চেয়ে তার থেকে জুতোর সিলিকন কভার আর রেইন পোঞ্চটা বের করে পরে নিলাম। ঐ রেইন পোঞ্চ দিয়েই মুখটুকু বাদ দিয়ে আপাদমস্তক ঢাকা হয়ে গেল। বৃষ্টি একটু কমতেই আবার যাত্রা শুরু। পৌঁছে পায়ে হেঁটে পুষ্পবতীর টিনের পোল পেরিয়ে ভ্যালিতে প্রবেশ। দুটি নেপালী বাহক আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ছিল। পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় দরকার মতো হাত ধরে সাহায্য করছিল, প্রয়োজনে ব্যাগ বইছিল, ছবি তুলে দিচ্ছিল। মধুর নেশা ফোটো তোলা। লম্বা খাটো লেন্স আর নিকনের আড়াই কিলোর ক্যামেরা তার সব ভ্রমণ ও উৎসবের সঙ্গী। শুধু ওর ছেলের বিয়েতে ওর হাতে ক্যামেরা দেখিনি। সেই ক্যামেরার লেন্স দিয়ে ও আমাদের দূরের গ্লেসিয়ার ফিল্ড থেকে গ্লেসিয়ার নেমে আসা দেখালো। এর মধ্যে ঝকঝকে রোদ উঠলো। আবার ঘন্টাখানেক পরে মেঘেরা বেরিয়ে পড়ল। একটা সময় দেখলাম আমরা মেঘ পরিবৃত হয়ে বসে আছি। আশপাশের পাহাড়ের গা বেয়ে কয়েকটা ঝর্ণা বা নদী নামছে।  আমাদের আশেপাশে ফুল, কিন্তু দূরের ভ্যালি যেন সবুজ ঘাসে ঢাকা। নেপালী ছেলেটিকে জিগেস করা হল যে ভ্যালির ঐ সব অংশে কবে ফুল ফুটবে? সে বলল - ওখানেও এই রকমই ফুল ফুটে রয়েছে। তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে এই অংশের দিকে তাকালে এটাকেও ঐ রকমই ঘাসে ঢাকা সবুজ মনে হবে।  আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে দেখলাম ঠিক তাই।  ওদিকে ও ফুল নজরে পড়ছে। তবে সব জাতের ফুল তো আর এক সময়ে ফোটে না - এখন কিছু ফুল ঝরে গেছে, সাদা আর বেগুনি ফুল ফুটে আছে, এরপরে এগুলো ধরে যাবে, কদিন পর গোলাপী ফুলে ছেয়ে যাবে হয়তো। অর্থাৎ সব সময় যে সব কিছু দেখা যাবে তা নয়। ঐ যেমন আমের সিজনে প্রথমে হিমসাগর আর শেষে ফজলি!

একটা পাথরে জমিয়ে বসে ড্রাই ফ্রুটস, চকলেট আর রডোডেনড্রন জুস দিয়ে লাঞ্চ করা হল। ততক্ষণে নিবেদিতাও এসে গেছে। ও হেঁটে এসেছে। এবার মেঘ করছে আবার। তাছাড়াও পালকিবাহকেরা বলল যে সব পালকি একসঙ্গে নামতে শুরু করলে জ্যাম হয়ে যাবে। তার ওপর মৌসম খারাপ হলে আরও মুশকিল!

অতএব ফেরার পথে। ফেরার সময় খুব সামান্য বৃষ্টি হয়েছিল, যদিও মেঘের ঘনঘটা কম ছিল না। সেই পর্চিঘরের সামনে এসে বাহকরা হাঁক দিল। একজন খাতা নিয়ে বাইরে বসে ছিলেন। আরেকজন ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন আরেকটা খাতা নিয়ে। এবার নাম জিগেস করার পালা। কে কে ফিরল? আমার নাম বলতে বাইরের জন মিলিয়ে টিক দিলেন, ভেতরের জন তাঁকে বললেন - পাঁচজন মহিলার দল। বাইরের জন বাকি ২/৩টে নাম বলে মিলিয়ে নিলেন। বাহকদের প্রত্যেকের নাম জিগেস করে টিক মারলেন। তারপর আমাকে জিগ্গেস করলেন - কেমন লাগল?

আজ আমি ফিরেছি সবার আগে। একটু পরে মধু ফিরেছে। ওকে আবার বলেছেন - মীনা ম্যাম ফিরে গেছেন। আর সবার শেষে যখন হেঁটে ফিরেছে নিবেদিতা, তাকে বলেছেন - তোমাদের দলের বাকি সবাই আগেই ফিরেছে। এইভাবে ফেরা-না-ফেরার হিসেব রাখা হয়।

পালকির সবাই ফেরার পর খিদে পাচ্ছিল। চারজনে উল্টোদিকের গুরদোয়ারার লঙ্গরে খেয়ে, ওখানেই চা খেয়ে ফিরলাম। টিপটিপ নাছোড় বৃষ্টি শুরু হল। আজ রাতে কুবের হোটেলে আমরা ছাড়া ডিনারের জন্যে আর কোনো বোর্ডার নেই। তাই আমন বলল – তোমরা কি খাবে বলে দাও কিচেনে, তাই করে দেবে। এরপর থেকে ব্রকফাস্ট ও ডিনারের মেনু আমরাই ঠিক করে কিচেনে বলে দিয়েছি। আর ওরা রেঁধে দিয়েছে। কুবেরের রান্নার সুনাম আছে। অনেকেই এখানে খেতে আসে।

ভ্যালি অভ ফ্লাওয়ার্স ছিল আমাদের প্রথম আকর্ষণ। আজকের দিনটা খুবই ভালো কাটল। কাল আছে ২য় আকর্ষণ, পরশু ৩য়। আবহাওয়া আরও দুদিন সহযোগিতা করলে খুশির প্রাণ গড়ের মাঠ এফেক্ট নিয়ে ফিরব। বাকি আকর্ষণগুলো আজ সাসপেন্সের খাতায় থাকুক নাহয়!

৫ম কিস্তি

২০/৭/২২ (হেমকুণ্ড সাহিব)

আজ দ্বিতীয় আকর্ষণ কাম অ্যাডভেঞ্চার। যাব হেমকুণ্ড সাহিব। শিখ গুরদোয়ারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে হল হেমকুণ্ড সাহিব, ১৫,২০০ ফিট। ঘাংঘারিয়া ১০,২০০ ফিট। আর গতকালের ভ্যালি অভ ফ্লাওয়ার্স ১১,৫০০ ফিট। ঘাংঘারিয়া থেকে ভ্যালির দূরত্ব ৪ কিমি, আর হেমকুণ্ড সাহিবের ৬ কিমি।  অর্থাৎ আজ ৬ কিমিতে ৫০০০ ফিট উঠতে হবে। যেতে খাড়াই, নামতে উৎরাই - এবং দুইই এক্কেরে আপন অস্তিত্ব জাহির করা!  আজ দুজন যাবে পালকিতে, তিনজন ঘোড়ায়। আকাশ আজ হাসছে না, ঠোঁট ফোলানো ঘ্যানঘেনে, যে কোনো সময়ে ছিঁচকাঁদুনি হওয়ার সম্ভাবনা। সকাল সাতটায় চা আর আলুপরান্ঠার  ব্রেকফাস্ট সেরে, পালকিওলাদের রওয়ানা করিয়ে আমরা তিনজন ঘোড়ার ঠেকের দিকে এগোলাম।

ঘোড়া একপিঠ ১৯০০ টাকা, দুপিঠ ২৫০০। দুটো ঘোড়ার সঙ্গে একজন সহিস,তিনটের সঙ্গে দুজন।

এতটা খাড়া, ঘোড়ায় যাব, আমি তো রাজি, কিন্তু শিরদাঁড়া রাজি কি জিগেস করতে পারিনি। একটু চিন্তাও হচ্ছে। আমিই আগে ঘোড়ায় উঠলাম।বুকে সাহস নিয়ে ঝাঁসীরাণী স্টাইলে টানটান হয়ে বসলাম। ঘোড়ার পর্চি লাগে। সেটা ঘোড়াওলার দায়িত্ব। যাত্রা শুরু। মধু আর নিবেদিতার ঘোড়া পেছনে আছে, তবে কোথায় বা যাত্রা শুরু করেছে কিনা জানিনা। ঘোড়ায় বসে পেছনে ঘাড় ঘোরাতে পারি না, পেছনে চোখও নেই। রাস্তা বেশ চওড়া, খানিকটা ধাপ কাটা, তবে বেশিটাই ঢালু পাথুরে। ঘোড়া প্রতি পদক্ষেপে উঠছে, আমি সেই ঝাঁসী স্টাইল। চারপাশে সবুজে মোড়া পাহাড় ঘেরা; ঝর্ণা-নদী চিকচিক করছে, নাচছে গাইছে; আর পাহাড়ের গায়ে নানান ফুল - তাদের অনেকের সঙ্গেই কাল দেখা হয়েছে। হঠাৎ দেখি মাথার ওপর একটা জায়গায় মেঘ আছে, কিন্তু সাদা হচ্ছে। তার মানে পর্দানশীন সূর্য। ক্রমশ একটু রোদ। মেঘ ওপর দিকে উঠতে লাগল আর ধূসর থেকে সাদা হয়ে গেল। আমার সঙ্গে আরেকটি ঘোড়া, তার সহিসের সঙ্গে মিলিজুলি করে দুই সহিস দুটো ঘোড়ার নিয়ে যাচ্ছে। ঘনঘন বাঁক। কয়েকটি বাঁকের ধারে ঘোড়ার জলখাবার চৌবাচ্চা, জল আসছে ঝর্ণার ধারা থেকে। এই চড়াই ভাঙতে ভাঙতে ঘোড়া তৃষ্ণার্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে জল খেতে। মাঝামাঝি দূরত্বে পৌঁছে একটি চা-টায়ের দোকানে ব্রেক। ঘোড়া, সওয়ারি, সহিস সকলের রেস্ট। এই রাস্তায় এইরকম দোকান বা চটি অনেক। চা, গরমজল, খাবার সবই লভ্য। তারপর আবার যাত্রা শুরু। রোদ নেই। বৃষ্টিও নেই। তবে যখন শেষ প্রান্তে পৌঁছলাম তখন মনে হল বৃষ্টি বুঝি এখনই এসে গেল! ঘোড়া থেকে নামলাম। জায়গাটা জল ও ঘোড়ার বর্জ্য মিলেমিশে জল থৈ থৈ। এখান থেকে আর পঞ্চাশ মিটার হাঁটা, খাড়া। আমার লাঠি নেই। এখন লাঠি মিস করছি। ঘোড়ার এলাকার পরই গোটা চারেক দোকান, মাথার ওপরে প্লাস্টিক ঢাকা। হঠাৎ বৃষ্টি এড়াবার জন্যে সেখানে দাঁড়ালাম। মধুদের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে আর ঘোড়াওলাকে ফেরার সময়টাও বলতে হবে।  যে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি তাকে জিগেস করলাম -লাঠি পাওয়া যাবে? আছে, ৫০ টাকা। বললাম - ভাড়া নিলে? সে পাশে রাখা নিজের লাঠিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল - এটা নিয়ে যাও। -কত পয়সা? -লাগবে না। খেতে পেলে শুতে চাওয়া ভঙ্গিতে আরো একটা হবে কিনা জিগেস করতে বলল যে এরকম আর নেই। মধুর আর জুটল না! একটু পরে ওরা দুজন এলো। ততক্ষণে আমার ঘোড়াওলাকে আর খুঁজে পেলাম না। একজনের লাল জ্যাকেট টেনে জিগেস করলাম সে আমাকে এনেছে কিনা। নাঃ, সে না। অতঃপর তিনজনে চলতে শুরু করলাম। প্রথমে বাঁদিকে বিশাল ঢাকা কমপ্লেক্স, ভেতরে সারি সারি পুরুষ ও মহিলা টয়লেট ও চানঘর। তারপর আবার কয়েক ধাপ উঠে ও কয়েক ধাপ নেমে শুরু আসল হেমকুণ্ড সাহিব। প্রথমে লঙ্গর বিল্ডিং। তারপর ওদের পূজা পাঠের প্রধান মন্দির বিল্ডিং। তার সামনে হেমকুণ্ড - গ্লেসিয়ার গলে প্রথমে সরোবর, তারপর সেই সরোবরের একপ্রান্ত দিয়ে সেই জল বয়ে চলেছে প্রবল বিক্রমে, কখনও ঝর্ণা কখনও নদীর চেহারায় আপন বেগে পাগল পারা। সরোবরে ঢোকার মুখে ডানদিকে জুতো রাখার বন্দোবস্ত, ঐ টোকেন সিস্টেম। আর চতুর্দিক পাহাড়ে মোড়া তাতে পাথর, সবুজ আর বরফের কারুকাজ।

আমরা লঙ্গর এর সামনে বেঞ্চে মধুকে হাঁফ ছাড়তে বসিয়ে জুতো রেখে সরোবরের দিকে গেলাম। চড়াই ভাঙতে সকলের ফুসফুসই জানান দিচ্ছে, মধুরতা একটু বেশি। চারিদিক কি গম্ভীর, কি রাজকীয়, অপূর্ব, অনন্য! ম্যাজেস্টিক!! সরোবরের ধার দিয়ে সার দিয়ে টবে ফুলন্ত ব্রহ্মকমল গাছ! সরোবরের গায়ের দেওয়ালে খানিকটা অন্তর ৪/৫ ফিট লম্বা শেকল গাঁথা - সেইটা ধরে স্নানার্থীরা জলে ডুব দেয়। বরফগলা জল, সেই রকমই তার টেম্পারেচার! পাশে বিশাল চালা করা - সেখানে জমা-কাপড়-ব্যাগ রাখার তাক, চেঞ্জ করার জায়গা, আয়না ইত্যাদি। অনেকে চান করছে। কিন্তু সবাই পুরুষ। কোনো মহিলা দেখলাম না। তাদের হয়তো পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য সিস্টেম! এক ভদ্রলোক সবাইকে মোনাক্কা বিলিয়ে পুণ্যার্জন করছিলেন। আমাদেরও দিলেন। মধুও এসে যোগ দিয়েছে ইতিমধ্যে। এতক্ষণ আকাশের মুখ ভার ছিল। গায়ে ২/১ ফোঁটা হালকা পড়েওছে। এবার আবার রোদ উঠলো। সেই রোদের রাজত্ব পনের থেকে কুড়ি মিনিট। তার মধ্যেই ছবি তোলা শেষ করো। তারপর ঢোকা হল মূল মন্দিরে। একতলায় একটি বড়ো ঘরের মাঝখানে সব সাজানো, যেমন থাকে। আমরা দেখে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম।  ওখানে দায়িত্বে থাকা একজন এসে খুব নম্রভাবে জানালেন যে দোতলাতেই আসল সব। উঠলাম দোতলায়। বড়ো হলঘর। মেঝে কার্পেটে মোড়া। হলের শেষে মধ্যিখানে সিংহাসনে গুরুগ্রন্থসাহেব পাঠ চলছে। সেখানে পৌঁছনোর সরু প্যাসেজটার দুপাশে কাঠের রেলিং দেওয়া। সেই রেলিং এর দুদিকে, একদিক মহিলা অন্য দিকে পুরুষেরা বসে। হলের দেওয়ালের ধার দিয়ে স্ট্যাক করা অসংখ্য ভাঁজ করা কম্বল। মানুষজন আসছেন, একটা করে কম্বল টেনে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে বা কোমর থেকে পা ঢেকে বসছেন।  এটা ঠাণ্ডার সঙ্গে লড়াইয়ের ব্যবস্থা। ছাদে যাবার দরজার পাশে আরেকজন একটি মনিটরে সিসি টিভির ছবিতে নজরদারি করছেন। আর এই সব কর্মকাণ্ডের লাইভ টেলিকাস্টও চলছে। তারও সরঞ্জাম রয়েছে। আমরা একটূ বসে দোতলার ছাদে বেরোলাম। নাকে এলো হালুয়ার জিভে-জল-গন্ধ! সামনেই হালুয়া-ম্যান। হাতে নিয়ে ছাদ থেকে নিচের জীবন দেখতে দেখতে জিহ্বাতুষ্টি! হঠাৎ মঞ্চে আবির্ভাব সুজাতা আর বর্ণনার। ওরাও এসে  গেছে! গুরদোয়ারার পেছনে লক্ষণ মন্দির। সেখানে যেতেই জোর বৃষ্টি। মন্দিরের ভেতরেই কম্বলের ওপর বসলাম। বৃষ্টি থামতে আবার যখন গুরদোয়ারার দিকে আসছি তখন দেখি আমার ঘোড়াওয়ালা আর তার বন্ধু আমাকে আবিষ্কার করতে এসেছে। কি করে যে খুঁজে পেল আমাকে! ওরা বলল- মৌসম খারাপ হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি নামতে হবে। ঠিক হল সাড়ে বারোটায় নামব। লঙ্গরে ঢুকলাম বাটি আর গ্লাস সংগ্রহ করে নিয়ে। এখানে বেঞ্চ আর টেবিল। মাটিতে বসার ব্যবস্থা নয়। বাটিতে গরম পাতলা খিচুড়ি আর গ্লাসে চা। যতবার দরকার নাও। খাওয়া সেরে জুতো পর্ব, টয়লেট, এবং রেইনপোঞ্চটা পরে নেওয়া। আবার ঝিরিঝিরি শুরু হয়েছে। লাঠি ফেরৎ দিয়ে ঘোড়ায় চড়লাম। শুরু হল উৎরাই। রাস্তা ভিজে। কখনো ঝিরিঝিরি কখনো ঝরঝর কখনো তোমার দেখা নাই রে। আমিও নামছি, টেম্পারেচারও নামছে। আর নিচেটা মেঘের গুদোম। আশপাশেও দৃশ্যমানতা প্রায় নেই। আমার সহিস, নাম সৌরভ, এখন তার বন্ধুর থেকে আলাদা। সে ঘোড়ার গলার দড়ি ছাড়ছে না এক মুহূর্তও। নেমে যাচ্ছে তরতর করে। ঘোড়াকে জল খেতেও দিল না, পুরো পথে কোনো ব্রেকও নিল না। ঘোড়া ঢালু পথে নামলে অসুবিধে নেই, কিন্তু যখন ধাপে নামছে তার অভিঘাত আমার শরীরে পৌঁছচ্ছে। ধাক্কা লাগছে কোমরের নিচের অংশে। আমার ডান পায়ের খানিকটা ভিজছে। এইভাবে টানা দুঘন্টায় যখন একেবারে নিচে তখন সৌরভ জিগেস করল কোন হোটেলে আছি। আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেল। রাস্তায় পালকিদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। বাকি দুই  ঘোড়া কতদূর জানা নেই। প্রায় একসঙ্গেই ঘোড়ায় উঠেছিলাম। আমি ভিজে জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করতে ঘরে গেলাম।

এবার অন্যদের কথা। বেশ খানিকটা বাদে দুই পালকি পৌঁছল। তারাও একটু আধটু ভিজে। মধুর ঘোড়া এবং সহিস দুইই ছিল অসহযোগী। মধু প্রায় পড়ে যাচ্ছিল ঘোড়া থেকে ঐ ধাপে ধাপে নামার অভিঘাতে। ও শেষ অবধি এক কিমি আগে ঘোড়া ছেড়ে হাঁটতে শুরু করে। ঠিক তখনই বৃষ্টি একদম ঝমঝমিয়ে। ফলে ও যখন এসে পৌঁছল তখন রেইনকোটের নিচ থেকে সপসপে ভিজে। তারও অনেক পরে এল মিষ্টি মানে নিবেদিতা।  সে অল্প একটু ঘোড়ার পিঠে এসে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। মিষ্টির লাম্বারে একটা স্ক্রু আছে। মিষ্টির ঘোড়ার নাম লিলি। সেই লিলি ধাপ পেলেই লাফিয়ে নামছে। লাফানোর অভিঘাত জোরালোতর, আর স্ক্রুর ওপর তো জোরালোতম। বেচারি তাই ঘোড়া ছেড়ে হাঁটতে শুরু করে। তবে ও বৃষ্টিতে দোকানে দাঁড়িয়েছে। দেরি হয়েছে, তবে কম ভিজেছে। আরো খবর - মিষ্টি নেমে আসার একটু পরেই পথে যে গ্লেসিয়ার পড়েছিল সেটি ভেঙে পড়েছে, রাস্তা বন্ধ। পরের লোকজন সব আটকে পড়েছে।

এদিকে একটু পরে লেপের ভেতর থেকে মধু বলে - আমি কাঁপছি! ব্যাগ থেকে ব্র্যান্ডি বের করে গরম জল মিশিয়ে খাইয়ে তবে কাঁপুনি জয়। ওর অবস্থা দেখে আমরা সকলেও খেয়ে নিলাম। ব্র্যান্ডির গুণে মধুর কাঁপুনি কন্ট্রোল ও মগজ সচল হলো। বলে কিনা জুতো তো ভিজে ঢপঢপে, এবার কি হবে? তারপর ওরই মনে পড়ল যে আসার সময় ও কোনো একটা দোকানে দেখেছে লেখা আছে ভিজে জুতো শুকোনো হয়। সে ব্যবস্থাও আছে!চলো সেই দোকানের খোঁজে। আমি আর মধু। পাওয়া গেল। ঘন্টা খানেক লাগবে, ২০০ টাকা চার্জ। আবার হোটেলে এসে জুতো, জামা, শাল আর ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে গেলাম। বলল দশটার সময় নিয়ে যেতে। সব মিলিয়ে ৫০০টাকা দিতে হবে। ব্যাগটা শুকোতে পারবে না। ভিজে ব্যাগ নিয়ে হোটেলে ফিরেছি। এবার ডিনার। এই কুবের হোটেলের মালিক আমন ও তার কর্মীরা বেশ ভালো। মধু আমনকে ব্যাগের সমস্যার কথা বলতে একটা উপায় বেরোলো। ওদের ওপেন কিচেনে মাটির তন্দুর আছে। তার সামনে দিকে দাঁড়িয়ে ওরা রুটি সেঁকতে লাগল, আর পেছনের দেওয়ালে পজিশন নিয়ে মধু ব্যাগ সেঁকতে থাকল। মধুর গায়ে আধভেজা সোয়েটার। এইভাবে ব্যাগ ও সোয়েটার দুইই শুকিয়ে গেল।

তারপর খেয়েদেয়ে একটু গড়িয়ে, দশটা বাজিয়ে আবার জুতো শুকোনোর ডেরায়। গরমাগরম জুতো বগলে ফিরে পরের দিনের স্বপ্ন দেখার পালা।

৬ষ্ঠ কিস্তি

21/7/22 (হেলিকপ্টার)

 

আজ আমাদের তৃতীয় অ্যাডভেঞ্চার - হেলিকপ্টারে ঘাংঘারিয়া থেকে গোবিন্দঘাট নামব। ঘোড়ায় যে পথটা তিন ঘন্টা হেলিকপ্টারে দশ মিনিটের কম। কিন্তু হেলিকপ্টারে নামব বললেই বা মুদ্রার ঝনৎকার থাকলেই নামা যায় না। রাশি-নক্ষত্র-মেঘের ঘনত্ব- বৃষ্টির ধারাপাত - লাইনের দৈর্ঘ্য -তোমার প্রস্থ- ব্যাগেজের বেধ - সব কিছু মিলিয়ে একটা বিশাল প্যাঁচানো অংক আছে যা কেসি নাগের কোনো চ্যাপ্টারেই ছিল না। এই অংকটা না মিললে তোমার কপালে আর হেলির পাখা ঘুরছে না। তাই ঘুম থেকে উঠে অবধি আজ ব্যাপক টেনশন! অথচ হেলিতে না চড়লে জীবনই ব্যর্থ!!

আমনের সঙ্গে কথা হয়ে আছে-  উনি ফোন করে জেনে আমাদের জানাবেন আজ সার্ভিস চালু হবে কিনা। সব গুছিয়ে গাছিয়ে নিচে নেমে ব্রেকফাস্টের জন্যে বসে আছি। এই দুদিন পাতে পড়েছে আলুপরান্ঠা, আজ হবে স্যান্ডুইচ ও ওমলেট। সঙ্গে চা। আজ দেখছি এখানে অনেকেই ব্রেকফাস্ট করতে ঢুকছেন। রাস্তায় লোকজন একটু বেশি। তার মধ্যে পালকিওলা, ঘোড়াওলা, পিট্টুবাহকও অনেক। তারপর জানলাম পরশু থেকে ভ্যালি অভ ফ্লাওয়ার্সের পথ বন্ধ, আর কাল থেকে হেমকুণ্ড সাহিবের। কাল গ্লেসিয়ার ভেঙে পড়ার পর সবাইকে সেই ধ্বংসস্তূপ পার করে আনা হয়েছে, কেউ আটকে নেই। তবে অন্তত আজ রাস্তা বন্ধ। তাই সকলেই আজ এই ঘাংঘারিয়াতেই বসে আছে।

খেতে খেতেই আমাদের এই দুদিনের চেনা দুই পালকিওলা এসে গেল। তাদের সঙ্গে কথা হল যদি হেলি সার্ভিস না থাকে তাহলে সুজাতা ও বর্ণনা তাদের পালকিতে যাবে। একজন চেনা পিট্টুওলাও ঠিক করা হল যে আমাদের ব্যাগগুলো হেলিপ্যাড অবধি নিয়ে যাবে। আর ঐ হেলি সার্ভিস না থাকলে নিচে পুলনা অবধি। আর আমরা তিনজন অশ্বারূঢ় হব। ঘন মেঘের কারণে দৃশ্যমানতা না থাকলে হেলিকপ্টার বন্ধ থাকে। জোর বৃষ্টি হলেও বন্ধ। তবে ঝিরঝিরে বৃষ্টি বা হালকা মেঘ থাকলে হেলিকপ্টার চলে। আর রোদ থাকলে তো কথাই নেই! তবে এখন যেমন ঘনঘন আকাশের মুড চেঞ্জ হচ্ছে তাতে সব কিছুই অনিশ্চিত। ভ্যালি আর হেমকুণ্ড সাহিবের পথের হঠাৎ ধ্বস এসব অনিশ্চয়তা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা আগে হেমকুণ্ড সাহিব গেলে ভ্যালি আর দেখা হতো না। আর কাল তো কানের পাশ দিয়ে ফিরেছি!

গতকাল রাতেই হোটেলের সব হিসেবনিকেশ মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব রেডি। সবাই রেডি। 'গো' বলে দৌড় শুরু করার মুহূর্তে আমন বললেন যে হেলি সার্ভিস চালু হচ্ছে। তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে। চল চল চল। মধু নিজে দাঁড়িয়ে পিট্টুর ঝুড়িতে সবার ব্যাগ বাঁধিয়েছে। সুজাতা, বর্ণনার লাঠি আছে। মধু, মিষ্টি আর আমার নেই। থাকলে ভালো হতো। রাস্তা ভিজে, ঘোড়ার বর্জ্য ও পিছল। খুব সাবধানে পা টিপে টিপে। পেছন থেকে একজন, পোর্টারই হবে, সামনে এসে নিজের লাঠিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল - এটা নেবে? নিয়ে নিলাম। আমাদের কুবের হোটেলে থেকে হেলিপ্যাডের দূরত্ব ৬০০ মিটার মতো। পৌঁছে প্রথমে টিকিট কাউন্টারের তাঁবুতে নাম লেখানো।  ১১ নম্বরে আমরা, পাঁচজনের গ্রুপ হিসেবে। আগে ১০ বা ১৫ জনের গ্রুপও আছে অনেক। পাশের ওয়েটিং টেন্টে বসতে বলল। ডেকে নেবে। তখন বাকি কাজ। বাকি কাজের মধ্যে পড়ে গ্রুপের একজনের আইভি কার্ডের ডিটেলস দেওয়া, তার মোবাইল নম্বর ও আরেকটি ইমার্জেন্সি মোবাইল নম্বর দেওয়া। পাঁচজনের পুরো নাম ও ওজনের মেশিনে উঠে প্রত্যেকের ওজন নোট করা। এই ওজন অনুসারে ওরা প্রতি ট্রিপে সওয়ারি বন্টন করে।  হেলিতে যাত্রী আসন ছ'টি - পাইলটের পাশে দুই, পেছনে চার। যাত্রীপিছু ৫ কেজির একটি ব্যাগ নেওয়া যাবে। হেলি একসঙ্গে ৪৮০ কেজি মোট বহন করবে। এরা মানুষ ওজন করে হালকা-ভারি অ্যাডজাস্ট করে প্রতিবার ছ'টা আসন ভর্তি করে। ব্যাগ ওজন করেনা। ব্যাগ পাঁচ কেজি হতে হবে সেটা আমরা আগে থেকেই জানতাম। তাই প্রচুর রিসার্চ করে মিনিমাম জামাকাপড় ও শীতপোশাক কতটা নেব তার লিস্ট করেছি। অন্যান্য জিনিসপত্র, যেমন ওষুধ, সাবান ইত্যাদি এবং ড্রাইফ্রুটস একেকজন এক একটা নেবে। সঙ্গের খাবার যতটা সম্ভব খেয়ে ফেলব আর যতগুলো সম্ভব শীত পোশাক গায়ে চাপিয়ে হেলিকপ্টারে উঠব। এইভাবে ব্যাগের ওজন খানিকটা কন্ট্রোল করা যাবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে ব্যাগ নয় ব্যাগের মালিকের ওজন নেওয়া হচ্ছে! আমাদের হিসেব মিলল না! অবশ্য তাতে আমাদের কোনো অসুবিধে হয়নি, কারণ ব্যাগের ওজন নির্দিষ্ট থাকলেও মানুষের ওজনের কোনো ওপরের সীমা নির্ধারিত নেই।

আমরা এক্সাইটেড। বসতে পারছি না নিশ্চিন্তে। পিঁয়াজের খোসার মতো গায়ে পোশাকের পরত বয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। টিকিট টেন্টের দুজন লোক কাজ করে যাচ্ছেন। ওজন নেওয়ার পর্ব ও অন্যান্য লেখালিখি শেষ হলে ক্যাশে টিকিটের দাম দেওয়া। টিকিট মাথাপিছু ২৯৭৫ টাকা। এত অবধি একজন করছেন। তারপর অন্য জন হাতে লিখে বোর্ডিং পাস তৈরি করছেন। এই সার্ভিস প্রোভাইডারের নাম ডেকান সিম্পলি ফ্লাই। এখনও অবধি নিচে থেকে কোনো হেলিকপ্টার আসেনি। আকাশ হালকা মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি পড়ছে না। হঠাৎ টিকিট টেন্ট থেকে খবর পেলাম যে নিচে থেকে আজকের প্রথম হেলিকপ্টার ছেড়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রথমে আওয়াজ ও তারপরে দর্শন দিয়ে তিনি ধন্য করলেন। নিচে থেকে কোনো যাত্রী আসেনি। এসেছে সেখানের কয়েকজন স্টাফ, ওপরের লোকেদের ব্রেকফাস্ট নিয়ে। হেলিকপ্টার পাঁচ মিনিটও সময় নিল না। ছ'জন যাত্রী ও তাদের ব্যাগপত্তর নিয়ে তৎক্ষণাৎ ফিরতি পথে উড়ে গেল। হেলিপ্যাডে দুজন দক্ষ লোক - একজন আগে থেকে লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের তুলল আর অন্য জন চটপট হেলিকপ্টারের পেটে ব্যাগগুলো ঢুকিয়ে দিল। এইভাবে সার্ভিস চালু হল।মিনিট কুড়ি অন্তরই পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে কপ্টার উদয় হতে লাগল। আঃ, কি নিশ্চিন্ত লাগছে! ক্রমে আমাদের এগারো নম্বরের পালা এলো। ওজন, লেখালিখি, টাকা দেওয়া সব মিটল। খানিক পরে বোর্ডিং পাস লেখা ভদ্রলোক আমাদের পাসগুলো নিয়ে বেরিয়ে এসে হাতে দিয়ে বললেন - মধুমিতা ১২ নম্বর ফ্লাইটে যাবে, আর আমরা বাকি চারজন ১৩তে। এটা ঐ ওজন অ্যাডজাস্ট করার ফল। একটা ফ্লাইট চলে গেলেই হেলিপ্যাডে ঢোকার দরজা খুলে পরের ফ্লাইটের লোকেদের ঢুকিয়ে নিচ্ছে। মধুকে বাই বাই করলাম দূর থেকে। তারপর নিজেরাই ভেতরে ঢুকে নির্দিষ্ট জায়গায় মাটিতে নিজেদের ব্যাগগুলো নামিয়ে রাখলাম। আমাদের সঙ্গে আমরা ছাড়া আরও দুটি ছেলে আছে। আমাদের কে কোন সিটে বসবে তা বলে দেওয়া হল। মিষ্টি আর আমি সামনের সিটে! আমি তো আরও এক্সাইটেড! সামনের সিটে দুজনকে একসাথে বেল্ট বেঁধে দিল। যে পাহাড় গাছপালা বৃক্ষ ও নদীকে মাটি থেকে বা একটা উচ্চতা থেকে দেখেছি তাদের এখন মাথার ওপর থেকে দেখছি। তাদের ফাঁক দিয়ে নদী বইছে খরস্রোতা। সবকিছুর নিখুঁত প্ল্যানভিউ। এখন একটু একটু রোদও রয়েছে। আহা, কি নয়নাভিরাম! ক'মিনিট পরই নামার পালা। এই নামা বা ওঠার সময় হেলিকপ্টারের মাথার পাখার হাওয়া প্রায় ঠেলে ফেলে দেয়। আমি তো নেমেই তিন পাক ঘুরে একবার নেচে নিলাম!এখানে মধু আমাদের স্বাগত সম্ভাষণ করল। আমাদের তৃতীয় অ্যাডভেঞ্চারও সফল! এবার নিচের দিকে নামা। আমাদের ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সবাই উঠে পড়লাম। আজকের গন্তব্য মানা গ্রাম ও বদ্রীনাথ।

আধা কিমি মতো চাকা গড়িয়ে একটা কি ফটাং করে আওয়াজ হল। পাংচারের আওয়াজ নয়। কি হল তাহলে! আরো একটু এগিয়ে গাড়ি থামল। মানে সুবিধেজনক জায়গা দেখে ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে পরীক্ষা করতে নামল। ফ্যান বেল্ট কেটে গেছে। সারাতে সময় লাগবে। ঐ বেল্ট অন্য জায়গা থেকে কিনে এনে লাগাতে হবে। ড্রাইভার বলল ও একটা গাড়ি ঠিক করে দেবে, তাতে চড়ে আমরা বদ্রী আর মানা গ্রাম ঘুরে এখানেই ফিরব। ততক্ষণে ও গাড়ি সারিয়ে রাখবে। গাড়ি যা টাকা নেবে তার অর্ধেক ও দেবে, বাকি অর্ধেক আমরা। খানিকটা তপ্ত আলোচনার পর অনন্যোপায় হয়ে তাতেই রাজি হলাম। যদিও আমাদের দিতে হয়েছিল আরও একটু বেশি। তারপর দেখা গেল গাড়িটা অল্টো! তাতে পাঁচজন!! তেঁতুল পাতার নাম জপতে জপতে পেছনের সিটে চারজন মুড়ির টিনের অন্দরমহলের কায়দায় আড়াই থাকে সেঁধিয়ে গেলাম। মধু সামনে।

প্রথম গন্তব্য মানা গ্রাম - ভারত-চীন সীমান্ত ঘেঁষে ভারতের শেষ জনবসতি। গাড়ি থেকে নেমে খাড়া পায়েচলা পথ। এখানে দ্রষ্টব্য গণেশ গুফা বা গুহা, ব্যাস গুফা, ভীমপুল, সরস্বতী নদী। পাথরের ধাপ আর ঢালু মিলিয়ে রাস্তা, দুপাশে বাড়ি, অনেক বাড়ির দেওয়ালেই ছবি আঁকা। অনেক বাড়ির নিচেই দোকান - সেখানে মূল পশরা হাতে বোনা উলের সোয়েটার,জ্যাকেট, মোজা, হাতমোজা, মাফলার, টুপি; মেশিনে বোনা উলের কোট, জ্যাকেট; রোদের টুপি, গ্রিন টি আর কয়েক রকমের গাছগাছড়া, যেগুলো,ওরা বলছে, কোনোটা ব্লাডসুগার কমায়, কোনোটা চুল কালো করে ইত্যাদি। একটা পয়েন্টের পর পথটা পাহাড় ঘিরে বৃত্তাকার।  আগে চড়াইয়ের কাজ সারতে চাইলে সে পথে প্রথম পড়বে গণেশ গুফা, তারপর অনেকটা উঁচুতে ব্যাস গুফা। ব্যাসদেব নিজের গুফা থেকে মহাভারতের ডিকটেশন দিতেন, আর গণেশমামু নিজের গুফায় বসে সেই ডিকটেশন নিতেন। এইভাবে লেখা হয়েছিল মহাভারত। ব্যাসগুফার পাশে ভারতের শেষ চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়া হল। মধু একটু পেছনে আসছিল। সে আর আসেনা। পরে বোঝা গেল যে ঐ বৃত্তাকারের মুখে ও বৃত্তের অন্য দিকে চলে গেছে। সেই দিক দিয়ে ভীমপুল প্রথমে আর গণেশ গুফা সবশেষে। চা খেয়ে একটা খাড়া সিঁড়ি পথে নেমে ভীমপুল - সরস্বতীর ওপরেই। কাহিনিটা হল সরস্বতী নদী পার হবার জন্যে ভীম একটি বিশাল পাথর তার ওপর দিয়ে পেতে দিয়েছিলেন। আমরা বলব ভীম পোল, হাওড়া পোলের মতো। এখানের ভাষায় তা পুল। দুইয়েরই উৎস ফারসি শব্দ পোল, যাকে এখন আমরা হাটিয়ে দিয়ে তার জায়গায় ইংরিজি শব্দ ব্রিজকে বসিয়েছি।

এবার বদ্রীনাথ। মন্দিরের সামনে দিয়ে বর্ষার খরস্রোতা অলকানন্দা আর পেছনে বদ্রীবিশাল শৃঙ্গ। আমরা আগে একটি হোটেলে ঢুকে ভাত-ডাল খেয়ে তারপর মন্দিরের দিকে এগোলাম।  ঢোকার মুখে প্রত্যেক দর্শনার্থীকেই রেজিস্ট্রেশন করিয়ে কব্জিতে একটা কাগজের ব্যান্ড এঁটে যেতে হচ্ছে। সে সব মিটিয়ে আমরা গেলাম উষ্ণকুণ্ডের দিকে। প্রাণে সাধ আশ মিটিয়ে চান করা হবে আজ, অনেকদিন পর। কাপড় ছাড়ার ঘরের মেঝের ব্লিচিংএর আলপনা বাঁচিয়ে অ্যাক্রোব্যাটের ভঙ্গিতে তৈরি হয়ে কুণ্ডের জলে পা দিয়ে দেখা গেল তা অসম্ভব গরম - পা-ই ডোবানো যাচ্ছে না তো গা! আবার একপ্রস্থ অ্যাক্রোব্যাটিকসের পর মা আবার যা ছিলেন তাই হইলেন! এখানে দেখা হল বোলপুর থেকে আসা দুই বোনের সঙ্গে। তারা পরিবারের সঙ্গে এসেছে। কাল তারা ভাঙা গ্লেসিয়ারে আটকে ছিল। শিখ সম্প্রদায়ের কয়েকজন দাঁড়িয়ে থেকে ব্যবস্থা করে সকল যাত্রীকে ঐ জায়গাটা পার করায়। বলল যে তারা দুপাশে লম্বা রড ধরে দাঁড়ায় ও যাত্রীরা সেই রডকে রেলিং এর মতো ধরে ধরে বরফের ওপর দিয়ে পেরিয়ে আসে। এই মেয়ে দুটির জুতো পুরো ভিজে গেছিল সেই বরফে। তারপর সেই কনকনে জুতো পায়ে হেঁটে নিচে নামা।  তাদের পা ফুলে ঢোল!

 

এবার ভগবানের খাঁচায় প্রবেশ। মনে মনে বললাম - দেখো ভগবান, আমাদের কিন্তু চান করে শুদ্ধ পবিত্র হয়ে তোমাকে দর্শন দেবার ষোলআনা ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তুমিই তার বন্দোবস্ত করোনি। লোকজন বালতি নিয়ে কুণ্ডের গরমজল আর কলের ঠাণ্ডা জল মিশিয়ে কাজ সারছে বটে, কিন্তু আমাদের হাঁটুর বয়স খামখা বাড়িয়ে দেওয়াটাও তোমারই কীর্তি! আমরা ওসব পারব না।হেলিকপ্টারে পাঁচ কেজি মাত্র মালের দায়িত্বও তোমার, তুমিই সব চালাচ্ছো এখানে! পারফিউম আনতে পারিনি তাই! অতএব নাকে দুর্গন্ধ লাগলে নিজ দোষে মেনে নিও। তবে হ্যাঁ, আমার সামনে নাকে চাপা দিও না, অ্যাদ্দুর থেকে এসে সেটা দেখে আমার ভালো লাগবে না। তুমি শ্বাস বন্ধ করে থাকবে না ঘরে পারফিউম ছড়িয়ে রাখবে সেটা তোমার ব্যাপার। আমি ঝট করে বুকে স্যাট করে বেরোবো এটা কথা দিতে পারি। কারণ তোমার ঐ নকুড়দানা আর শুকনো নারকোল থেকে আমার মোহমুক্তি হয়ে গেছে। নেহাৎ ভেতরটা চোখ বুলিয়ে একবার না দেখলে লিখতে পারব না বলে ঢোকা!

আগে থেকেই প্লাস্টিকের কৌটোভরা নকুড়দানা ইত্যাদির মিশ্রণ কিনে হাতে ধরা - ওটাই পুজোর উপকরণ। ভেতরে গর্ভগৃহের অন্তিম প্রান্তে বদ্রীনাথ আসীন, তাঁর সামনে, একটু দূরেই একটা চৌবাচ্চার মতো পেতলের পাত্র, তার দুপাশে দুই পুরোহিত। তোমার নকুড়দানার কৌটো এগিয়ে দিলেই যে কোনো একজন সেটা নিয়ে  ঢাকা খুলে অর্ধেকটা ঐ চৌবাচ্চায় ঢেলে দিয়ে, চৌবাচ্চা থেকে এক খাবলা নকুড়দানা তোমার কৌটোয় ভরে দিয়ে ঢাকনা আটকে তোমার হাতে দিয়ে দেবে। ইধারকা মাল উধার ঔর উধারকা মাল ইধার সিস্টেমে বেশ চটপট পুজো হচ্ছে, ভিড়ও জমছে না।

মন্দির চত্বরটা খুব নয়নাভিরাম। খোলামেলা। মাথার ওপর আকাশ আর সবদিকেই পাহাড়ের চুড়ো উঁকি মারছে। এই মুহূর্তে ভিড় নেই তেমন। মন্দিরের পাট চুকিয়ে আবার ঠাসাঠাসি অল্টো। আমাদের ড্রাইভার মনীশের ফোন এল - তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, গাড়ি সুস্থ হয়ে গেছে।

এরপর রাত সাড়ে আটটা অবধি গাড়ি চালিয়ে পিপলিকোটিতে পৌঁছে একটি হোটেলে ডিনার, রাত কাটানো ও ব্রেকফাস্ট সেরে আবার পথে এবার নামো সাথী.......

৭ম ও শেষ কিস্তি

২২ - ২৪ জুলাই

 

একটা গল্প বলা হয়নি! হেলিকপ্টারের টিকিট ইস্যুর অব্যবহিত আগে নামবিভ্রাট ঘটেছিল। ন'নম্বর অবধি বোর্ডিং পাসের কাজ সেরে নিয়ে টিকিট টেন্টের এক ভদ্রলোক বেরিয়েছেন বাকি নামগুলো ডেকে আর কতজন কে কোথায় আছে দেখে নিতে। সকালের ভিড়ও এখন অনেক পাতলা। অনেকেই নিচে পৌঁছে গেছে। দুয়েকজন নাম লিখিয়েও আসেনি। উনি নাম ডাকছেন। প্রথম নামে সাড়া এলো। দ্বিতীয় নাম হাঁকছেন - মনিন্দর ... মনিন্দর..। হঠাৎ আমার কি মনে হল, জিগেস করলাম - কত নম্বর? বললেন - এগারো। তখন সাড়া দিয়ে বললাম - আমি। যিনি নাম লিখেছিলেন তিনি লিখেছিলেন Minadan -  সেটা আমি দেখেছিলাম। ঐ ভিড়ের মধ্যে আর সংশোধন করাবার চেষ্টা করিনি, কারণ জানি যে এটা ফাইনাল লেখা নয়। এবার, যিনি নাম ডাকছেন তিনি এক ঝলক দেখেই ভাবলেন এটা তো বহুশ্রুত চেনা নাম মনিন্দর! ব্যাস, যার নাম সে বা তার দলবল কেউই আর চিনতে পারছে না মনিন্দরকে!

 

এবার কারেন্ট গল্প। ব্রেকফাস্ট করে আটটায় গাড়ির চাকা গড়ালো। একটানা গাড়ি ছুটছে। কর্ণপ্রয়াগ পেরিয়ে আবার চাকা বিভ্রাট! রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে বসে আমরা চা খেলাম। চাকা বদল হলো। আবার চলা শুরু। আমরা এই গাড়ি নিয়ে যথেষ্ট বিরক্ত। কোনো মেইনটেন্যান্স নেই , বারবার সমস্যা করছে। আমাদের কথাবার্তা শুনে ড্রাইভার বলতে শুরু করল - তার কোনো কসুর নেই ইত্যাদি প্রভৃতি। আমরা বললাম - দেখো তোমার দুটো চাকা ফেঁসেছে, এখনও আরও দুটো বাকি আছে। চলো চলো। এবার সেও হেসে ফেললো। রুদ্রপ্রয়াগ পেরিয়ে দেবপ্রয়াগ। সেখানে লাঞ্চ করে আবার চলা শুরু। প্রায় চারটে নাগাদ হৃষিকেশ। কিন্তু কাওয়ারিয়ার সৌজন্যে হৃষিকেশ এখন অগম্য। শহরের ভেতরের রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ, গাড়ি ঢুকবে না। ব্যারিকেডের ভেতরে যে সব অটো টোটো আছে তারা সেখানেই চলাচল করছে। রাস্তায় অসম্ভব ভিড়। হাজারে হাজারে মোটরবাইক। শহরে ঢুকছে এবং বেরোচ্ছে। গোবিন্দঘাট থেকেই পথ বাইক ও বাইকার অধ্যুষিত। প্রতিটি বাইকে একাধিক যাত্রী, একটি করে ফ্ল্যাগ - হয় তেকোনা গেরুয়া ধর্মীয় ফ্ল্যাগ, নয় দেশপ্রেমে ভরপুর ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ। আরও একরকম ফ্ল্যাগ - তেকোনা গাঢ় গেরুয়ার ওপর কালো দিয়ে একটা মুখ আঁকা । এদের পোশাক-আশাকও গেরুয়া রঙের। এই মুখ আঁকা ফ্ল্যাগটা দেখে, মানে  না দেখেই, আমি ভাবলাম এরা চে গুয়েভারার মুখ নিয়ে ঘুরছে! পরে বুঝলাম না, এটা তো পবনপুত্রের আর্টিস্টিক বদন! হুঁ হুঁ বাবা, এটা গেরুয়া ভারত! গেরুয়া শহর হৃষিকেশ এখন ভক্তির বন্যায় প্লাবিত। আমরা শহরের বাইরে দাঁড়িয়ে। ড্রাইভার পুলিশকে টাকা দিয়ে শহরে ঢুকল। রাস্তার ওপরেই আর্মি হলিডে হোম, সেখানেই আমাদের তিনদিনের আস্তানা। হাটের মাঝখানে। স্থায়ী দোকান তো আছেই। এখন রাস্তার দুধারে অজস্র অস্থায়ী দোকান। গেঞ্জি জাঙ্গিয়া বারমুডা গামছা স্কার্ফ জুতো চটি খাবার চা সানগ্লাস পার্স লাঠি বেল্ট বাঁশি খেলনা ব্যাগ রেইনকোট রুদ্রাক্ষ পুঁতি ও কাঠের মালা কলকে - কি নেই! যতটা সম্ভব গেরুয়া রঙের। আমাদের প্ল্যান ছিল হৃষিকেশে তিন দিন নিরিবিলিতে বিশ্রাম করব, গঙ্গার ধারে বেড়াব, অ্যাডভেঞ্চার গেমসএ অংশ নেব, বিন্দাস থাকব। কিন্তু হৃষিকেশের এমন অবস্থা যে বেড়ানো তো দূরের কথা, নড়াচড়া করা যাচ্ছে না। আর্মি হলিডে হোমটা বেশ ছড়ানো, বাগান, বড়ো বড়ো ইউক্যালিপটাস গাছ, সবুজ গাছে টিয়ার ঝাঁক এসবের মাঝে স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারছি। কিন্তু গেটের বাইরে জগৎটা বদলে গেছে। আমাদের কম্পাউন্ড থেকে জানকি ঝুলার পিলার দুটো দেখা যায়। পুলিশ জনতাকে মাইকে নানান নির্দেশ দিচ্ছে তাও শোনা যাচ্ছে। এই হলিডে হোমে আমাদের স্যুটে একটা ছোটো কিচেন ও কিছু বাসনপত্র আছে। একটা ইনডাকশন ও ফ্রিজও আছে। খাবারের আর কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের অসুবিধে হয়নি। হট্টমেলার মাঝখানে রয়েছি। বেরোলেই রকমারি খাবার। তারই মধ্যে একটু পরিচ্ছন্ন দোকান খুঁজে পছন্দের জিনিস এনে খাওয়া হচ্ছে। ক্রমে টিব্যাগ- বিস্কুট-চিনির ব্যবস্থা ঘরেই হল। ফলও আনা হচ্ছে।‌ তেইশ তারিখ ভোরে মিষ্টি ট্রেন ধরে দিল্লি চলে গেল। চলে গিয়ে আমাদের বেশ অসুবিধে করে গেল। আমাদের মগজে ততক্ষণে পাঁচ সংখ্যাটা গেঁথে গেছে। যা-ই কিনতে যাই, যা-ই হিসেব করি সবই পাঁচ ধরে করছি! আর হিসেব ভেস্তে যাচ্ছে বারে বারে। মিষ্টি আর ক'দিন থেকে গেলেই পারতো!

আমাদের ২২ তারিখের প্রোগ্রাম দুপুরে চটিওয়ালার রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করা আর পরমার্থ ঘাটে গঙ্গাআরতি দেখা। রামঝুলা পেরিয়ে ওপারে চটিওয়ালা। অন্তত দু'কিলোমিটার হন্টন। পুরো রাস্তাটা দুর্গাপুজোর নবমী রাতের মতো ভিড়ে ভিড়াক্কার! তারই মাঝে একটা পয়েন্ট অবধি অটো-টোটো-বাইকের গুঁতো। অসীম সাহস সঞ্চয় করে সেই জনসমুদ্রে ঝাঁপ দিলাম। তারপর স্রোতের ঠেলায় ভেসে চলা। একসময় দেখলাম চটিওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।  লাঞ্চ সেরে গঙ্গার ধারে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পরমার্থ ঘাটের দিকে এগিয়ে চলা। ঘাট ধরে হাঁটা যাচ্ছে না। ভিড় ও দুর্গন্ধ। অতএব রাস্তা ধরেই হাঁটা। অন্যান্য ঘাটের তুলনায় পরমার্থ পরিচ্ছন্ন। অনেকটা মার্বেল বাঁধানো মাথায় ছাদ দেওয়া দালান। সেখানে পাখা আছে। কত লোক শুয়ে ঘুমোচ্ছেও। আমরাও বসলাম।হাতে অনেক সময়। একসময় আমাদের ওখান থেকে তুলে দিল, কারণ এবার আরতির জন্যে ঘাট পরিষ্কার করা হবে। আমরা পরমার্থ আশ্রমে ঢুকলাম। বিশাল আশ্রম, সাজানো, অনেক গাছ ফুল, অনেক মূর্তি। একটি ডুগডুগিসহ নৃত্যরত নটরাজ মূর্তিকে দেখে মনে হচ্ছে মহাদেব সেলফি তুলছেন। অজস্র কংক্রিটের লম্বা লম্বা বসার চেয়ার। আমরা সকলেই হন্টন ও গরমের কারণে বেশ ক্লান্ত। চারটে এরকম চেয়ারে টানটান শুয়ে ঘুম দেওয়া হল একটু। এবার আরতির পর্ব। ছ'টা নাগাদ এখান থেকে গেরুয়া কুর্তা-ধুতি শোভিত নানা বয়সী একদল চলল গঙ্গার ঘাটের দিকে। এখানে ছোটো ছোটো ছেলেরা হস্টেলের মতো থাকে। মনে হয় ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে পড়াশোনা ও যোগচর্চা করে। সবাই পরমার্থ ঘাটে পজিশন নিয়ে নিয়েছে। শুরু হল ভজন। সুন্দর গান চলল। এরপর আরতি। পাবলিকের হাতেও আরতির সরঞ্জাম। দূর থেকে দেখলাম আমাদের সুজাতা মধুমিতাও অংশ নিচ্ছে। আমি একটু দলছাড়া হয়ে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে গুছিয়ে পা দুলিয়ে বসেছিলাম। আরতির জগঝম্প আমার পোষায় না। তাই বেরিয়ে আসাতে পারার মতো জায়গা খুঁজে বসে বসে ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখছিলাম। গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের প্রধান ট্যাগলাইন নমামি গঙ্গে। তাতে পুজোপাটের অন্ত নেই। কাজের কাজ খুব একটা চোখে পড়েনি।  গঙ্গার ঘাটের দুর্গন্ধের সঙ্গে এই আরতির এত সময়সাপেক্ষ ভক্তি মেলাতে পারছি না। একটি বাচ্চা ছেলে একটা স্টেনসিল টিপ দিয়ে কপালে চন্দন পরিয়ে দিল। পয়সা চায়নি। তবে দিলে নিত। পরে চন্দন শুকোতে দেখলাম আমার কপালে ত্রিশূল শোভা পাচ্ছে।আরও তিন চারটি ছেলেমেয়ে, যাদের আমরা বলি স্ট্রিট আর্চিন, হাতে ফুল আর ধূপের সাজানো ছোটো ছোটো ডালি নিয়ে ফেরি করে বেড়াচ্ছে। গঙ্গায় ভাসানোর জন্যে লোকে কিনবে বলে। হতদরিদ্র ক্ষুধার্ত চেহারা। এদের সঙ্গেও এই গঙ্গাআরতি মেলে না। হয়তো মেলাতে চেষ্টা করাটাই উচিৎ নয়। তবুও পেটের ভেতরের গুড়গুড় করাটা থামাতে পারি না। আমি আরতি ছেড়ে আবার সেই কংক্রিটের চেয়ারে চলে গেলাম। আরতি শেষে সবাই এলে এদের ক্যান্টিনে চা খেয়ে বাড়ির পথে হাঁটা শুরু। ক্যান্টিনটি ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে পরিচ্ছন্ন। অনেক বিদেশীও যোগাসনের টানে এখানে আসেন ও থাকেন। ফেরা জানকি ঝুলা দিয়ে। খাবার কিনে ঘরে বসে খেয়ে ঘুম।

আজ ২৪ তারিখ। রাজাজী ন্যাশনাল পার্কে আমাদের জঙ্গল সফরি বুকিং আছে। আটটায় পৌঁছতে হবে। সাতটায় অটো নিয়ে বেরোনো হল। প্রায় কুড়ি কিমি। রাজাজীর দুটো গেট। জানা ছিল না। আমরা ভুল গেটের সামনে। ঠিক গেটে যেতে হলে যে রাস্তায় যেতে হবে সে রাস্তায় অটো চলার অনুমতি নেই, আর আমাদের আস্তানার সামনের রাস্তায় চার চাকার অনুমতি নেই। আমরা ফিরে এলাম । ফেরার পথে বিশাল জ্যাম। অনেক সময় লাগল ফিরতে। ইতিমধ্যে আমাদের সফরি বুকিং বিকেল চারটেয় বদলানো হয়েছে। কিন্তু হলিডে হোমে ফিরে দেখা গেল খানিকটা হেঁটে গিয়ে যদি চার চাকার গাড়ি নেওয়াও যায় এই জ্যাম পেরিয়ে অতদূরে পৌঁছনো অসম্ভব। অতএব প্ল্যান ড্রপ। কি করা যায় এখন সারাদিন? প্ল্যান করে দুপুরে রান্না করে লাঞ্চ করা হল। আলুসেদ্ধ দিয়ে দেরাদুন চালের ভাত, মাখন আর নুন মেখে, সঙ্গে কাঁচালঙ্কা। শেষ পাতে দই। আর বিকেলে আম আর ইয়োগার্ট। দুইয়েরই মাঝে লম্বা ঘুম। বিশ্রাম!  এবার কাল ফেরার প্রস্তুতি। ভোরে বেরোতে হবে। পাঁচটায় অটো নিয়ে যোগ নগরী হৃষিকেশ স্টেশন থেকে ছ'টা দশের কচুভেলি এক্সপ্রেসে দিল্লি, তারপর সন্ধ্যে ছ'টা পঞ্চাশে বিমানবন্দরের টার্মিনাল থ্রি থেকে কলকাতার ফ্লাইট। বেড়ানো শেষ। এবার পরেরটার প্ল্যান করতে হবে।

*****

 

Thursday, July 28, 2022

জিম করবেট, নৈনিতাল, তাজমহল 

March 12 – 20, 2022

1st part

ছেলে গৃহত্যাগী 2014 থেকে। মেয়ে নিজের ঘর বাঁধলো - সেও সেই 2014তেই। আরো দুটি মেয়ে যারা পরিবারেরই সদস্য ছিল - তাদেরও বিয়ে হয়ে গেল ঐ 2014তেই। বাড়ি বেবাক ফাঁকা! ঐ আরও দুটির একটি ছিল আমার সংসারের আসল কর্ত্রী। তাই বাড়ি এমন ফাঁকা যে নিজেই চাবি দিয়ে বেরোতে হয়, আবার চাবি খুলে ঢুকতে হয়। শুধু তাই নয়, দুবেলা রান্নার মাসির আবির্ভাবের সময় আমাকেও আবশ্যিক হাজিরা দিতে হয়। এ যেন মনের বেড়ি - মনে রাখতে হয় সময়টময়। এমন তো অভ্যেসে ছিল না। তবে এখন তো আর অভ্যেসের কাঁদুনি গাইতে বসিনি। ওটা তোলা থাক। পরে নাহয় কখনো তেমন কারুর সঙ্গে দেখা হলে গলা জড়িয়ে নাকের জলে, চোখের জলে বাসি কথার হাহুতাশ করা যাবে। এখন টাটকা চর্চার গল্প।

বাড়ি ফাঁকার ফলে সবার সঙ্গে একসঙ্গে দেখাসাক্ষাৎও নেই। তাই আমি মনে মনে ঠিকই করেছিলুম যে ছেলে যখন লম্বা ছুটিতে বাড়ি আসবে তখন বাকি সকলেও যদি রাজি হয় তাহলে সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়া হবে। না হলে তো ছেলে নিজের ঘরে, হয় কম্পিউটারে সেঁধিয়ে নয় ঘুমিয়ে। সে যে বাড়িতে আছে তা টেরই পাওয়া যায়না। মেয়ে-জামাই বাড়িতে থাকলেও ছুটি নিয়ে তো আর বসে থাকেনা। আর গৃহকর্তা বা ল্যান্ডলর্ড যে নামেই ডাকো, তিনি তো ভগবানকেও হার মানান ব্যস্ততায়! ফলে ঐ রাতে খাবার সময়টুকু ছাড়া দেখাই হয় না কারুর সঙ্গে কারুর। ভবিষ্যতও আবার একসঙ্গে থাকার কোনো আশ্বাস দেয় না - এক প্রজন্ম জীবনমুখী তো অন্যটি শ্মশানমুখী। অতএব বেড়ানো। সবাই ছুটি নিয়ে হৈ হৈ, একে অপরকে সময় দেওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো। এই ফাঁকে চুপিচুপি একটা কথা বলে রাখি - লেগে থেকে এদের দিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাদি করাতে হলেও তারপরে আমার আর কোনো খাটাখাটনি থাকে না। অনলাইন বুকিং ও খোঁজাখুঁজি আমার থেকে ভালো ওরা করে। লাগেজ বওয়া, ছুটোছুটি - সব ওরা।  আমার ও গৃহকর্তার শুধু বেড়াতে যাওয়া, প্রায় কোলে চড়ে।

সেই মতো কাল বিয়েবাড়ি নেমন্তন্ন যাবার আগে অবধি কম্পিউটারের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে ততটা সম্ভব নিজের কাজ সামলেছি। আর বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে এগারোটায় শুতে গেছি। আর আজ ভোর ছটায় বেরিয়ে এয়ারপোর্ট। সেখানে লাউঞ্জে ভরপেট্টা ব্রেকফাস্ট সেরে, প্লেনে খানিক ঘুম সেরে নামলুম দিল্লি। তারপর মেট্রোতে নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন। সেখানে কেএফসি, হলদিরাম, Wow ইত্যাদির আপ্যায়নে লাঞ্চ সেরে বসে আছি। মেয়ে-জামাই-নাতি তাদের দিল্লি-বাসী ভাসুরের সঙ্গে দেখা করে ফিরতি পথে। আমাদের ট্রেন 4টেয়। গন্তব্য রামনগর। বেঙ্গল টাইগাররা অপেক্ষায় আছে বেঙ্গলের গেস্টদের জন্যে, জিম করবেট ন্যাশানাল পার্কে। তাদের সময় দিতে হবে।

যতটা বললুম তার ভাঁজে ভাঁজেও অল্পসল্প গল্প আছে। সময় সুযোগ মতো হবে সেগুলোও।

2nd part

এই দ্বিতীয় পর্ব এক্কেরে রহস্যরোমাঞ্চে ভরপুর।বিশুদ্ধ আদখেলেমি থেকে শুরু করে দিমাগ কি বাত্তির হঠাৎ ঝলসে ওঠা, তারপর চোর-পুলিশের মতো রুদ্ধশ্বাস ছুট ছুট ছুট, অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস। যতটা নাটকীয় করে বলছি আসলিয়ত মে তারো চেয়ে বেশি নাটকীয়। এবার নাটক বাদ দিয়ে কথায় আসি।  যার নাটকের দরকার সে নাট্যমেলা থেকে মালমশলা সংগ্রহ করে আরেকবার না হয় সাঁতলে নেবে। কবে থেকে যেন শুরু নাট্যমেলা?

মেট্রো থেকে নেমে পরতে পরতে লিফ্ট ও এসক্যালেটর সহযোগে ভূগর্ভ থেকে নিষ্ক্রমণের পর্বে একটি ক্লোক রুমের দেখা মিলল। ভাবা হল এইখানে ব্যাগেজ সমর্পণ করে খাওয়াদাওয়া সেরে আবার ব্যাগেজ সংগ্রহ করে 4টের ট্রেন ধরা যাবে। সেই ক্লোকরুমের দায়িত্বে ছিলেন এক অসীম দূরদর্শী দার্শনিক ব্যক্তি। তিনি ব্যাগেজসহ আমাদের পর্যবেক্ষণ করে বললেন - এই দু ঘন্টার জন্যে 500 টাকা কেউ দেয়? তার ওপর এগুলো নিতে আবার এই লিফ্ট এসক্যালেটরের দুঃসাধ্য পথ দুবার অতিক্রম করতে হবে। তার চেয়ে লাগেজ পাশে রেখে টেবিলে বসে খেয়ে নিন। অগত্যা....

খেতে গিয়ে একবার সিঁড়ি দিয়ে একতলা ওঠা নামা করতে হয়েছে বটে পোঁটলা পুঁটলি নিয়ে, নইলে এই উপদেশে যার পর নাই সুবিধেই পেয়েছি।

লাঞ্চের পর মেয়ে তো গেল ভাসুরের সঙ্গে দেখা করতে। আমরা বসে হলদীরামের দোকানে। একটা চা, তারপর একটা কফি - পরপর অর্ডার করা চলছে চক্ষুলজ্জার খাতিরে। সোমনাথ টেনশন করছেন। এক সময়ে ফোন করে জানলেন যে ফেরার পথে রাস্তায় দেদার জ্যাম। তবে আপাতত ঝিনুক আর গল্পকে 6নং প্ল্যাটফর্মের কাছে নামিয়ে বিনয় আসছে আমাদের কাছে। এল। লটবহর নিয়ে, স্ক্যানিংএর বিশাল লাইন টপকে, ম্যানেজ করে আমরা যখন ওপারে তখন ঝিনুক উল্টো দিক থেকে এসে বলল - ট্রেন এখান থেকে নয়, পুরোনো দিল্লি স্টেশন থেকে! ঘড়িতে তখন সাড়ে তিন! সব কিছু নিয়ে পিছন দিকে ছুটতে ছুটতেই বলল - অটো পঞ্চাশ টাকা নেয় পৌঁছতে। অন্তত এটুকু বুঝলাম যে পথটা অটোর দূরত্ব। এস্ক্যালেটর থেকে নামতেই অসংখ্য অটোওলা ছেঁকে ধরতে যে কি ভরসা হল! দুটো অটো বোঝাই করে ছুট ছুট। ঝিনুক-সোমনাথ-গল্পর অটো আগে, আমাদেরটা পিছনে। কিন্তু একটু পরেই দৃষ্টির আড়ালে। দেড়খানা যুগান্তকারী সিগন্যাল খেয়ে আমাদেরটা যখন পৌঁছলো তখন শুনলাম আগেরটা তখনও আসেনি। পরে শুনলাম ওরা পুরো দুটো সিগন্যাল খেয়েছে। বিনয় দাঁড়িয়ে রইল। আমি আর ছেলে দুটো সুটকেস নিয়ে পয়দল এগোলাম। এস্ক্যালেটর তারপর ওভার ব্রিজ দিয়ে আবার ছুট। ছুটতে ছুটতেই শুনলাম প্ল্যাটফর্ম বদল হয়েছে - পাঁচ থেকে ছয়ে। ছয়ে নামার সিঁড়ির মুখে নান্দিক আমার হাত থেকে সুটকেস কেড়ে নিয়ে নামতে শুরু করল। নেমে দেখি আমাদের সামনে ট্রেনের C1 কামরা। আমাদের টিকিট C3তে। ঘড়ি বলছে 3.57। এদিকে 1 আর 2এর পর অনেকগুলো ডি কামরা, তারপর 3। আমরা এগোচ্ছি। আদৌ উঠবো কিনা বুঝতে পারছি না। ভাবছি, আর যুদ্ধ করে এগিয়ে কি হবে! যে কোনো ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ছাড়ার আগে যে কোনো দিকে এগোনোর মানেই স্রোতের বিপরীতে যুদ্ধ। কে উঠছে, কে কাকে ওঠাচ্ছে, কে উঠিয়ে নামছে, কে নেমে হাত নাড়ছে, কে আবার দরজা আগলে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে ইত্যাদি প্রভৃতির হজবরল। আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে ফোন করলাম ঝিনুককে। রিং হল, থামল, কিন্তু ধরল কিনা বা কিছু বলল কিনা কিছুই বোধগম্য হল না। তারাও নিশ্চয়ই ছুটন্ত। 3.59। হাল ছেড়ে দাঁড়িয়ে দুজনে ইঞ্জিনের প্রথম বাঁশি শুনলাম। কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মানে বুঝছি তখন হাড়ে হাড়ে। দ্বিতীয় বাঁশি। ট্রেনের বপু নড়ে উঠল। এমন সময় নান্দিক ফোন কানে দিয়ে বলল - উঠতে বলছে, ওরা উঠেছে। ট্রেন তখন চলন্ত, সামনের দরজা আগলে একজন দাঁড়িয়ে। আমি হ্যান্ডেলের দিকে হাত বাড়িয়ে এগোতে তিনি সরে গেলেন, কিন্তু শাহরুখ খানের মতো হাত ধরে তুলে নিলেন না! নিজেই উঠলাম।আমার পিছনে দুটো সুটকেস, তার পিছনে নান্দিক। এটা কিন্তু C3 নয়। এখনও ডি সিরিজই চলছে। সামনের স্টেশনে নেমে নিজের জায়গায় যেতে হবে। আধমিনিট মতো চলে ট্রেনের গতি আবার নিম্নমুখী, তারপর থেমে গেল। এটা চেন টানার থামা। ছেলেকে বললাম- কেউ চেন টেনেছে। একবার চেন টানলে সব ঝঞ্ঝাট সামলে আবার চলতে একটু সময় লাগে। চল আমরা এগিয়ে তাই। নেমে দুটো কামরা পরে এবার C3তে উঠলাম। টিটিই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁকে বললাম - আমরা দুজন, বাকি চারজন C1 উঠতে পেরেছে। উনি লেখালিখি সেরে বললেন আধঘন্টা বাদে গাজিয়াবাদে চলে আসতে বলে দাও। ট্রেনও আবার ছাড়ল।

এবার গাজিয়াবাদ কিসসা। আমার মনে হচ্ছে গাজিয়াবাদ আসছে, ট্রেন গতি কমাচ্ছে, চলন্ততেই চা-কফি উঠছে। ছেলেকে বলছি - একটু নেমে C1এর দিকে যা, দুটো সুটকেস রয়েছে, অনেকটা দূর এখান থেকে। গুগলশিষ্য পুত্র আমার বলল - বলছে 3.44এ গাজিয়াবাদ, এখন 3.33। কিন্তু আমার রেলানুভূতি বলছে এটাই গাজিয়াবাদ। শিষ্য অনড়। আমি তখন ঘোড়া ডিঙিয়ে টিটিই কে জিগেস করলাম - কোন স্টেশন আসছে? - গাজিয়াবাদ। শুনে শিষ্য সচল হল। তবে চড়ন্ত পাবলিক ডিঙিয়ে দরজায় পৌঁছনোর আগেই চড়ন্ত পাবলিকের মধ্যে অভিপ্রেত চেনা মুখেদের দেখা মিলল।

পরবর্তী খবর - চেন টেনেছিল বিনয়, আমরা তখনও উঠিনি বলে। চেন টানার কনসিকুয়েন্সে গার্ড এসে চেন টানকের ডিটেলস নিয়ে গেছেন। এখনও কোনো কেস আসেনি। আর আমরা আলোচনা করে ঠিক করেছি যে যখন কেস ফেস করা হবে তখন টানকের বক্তব্য হবে - হুজুর ধর্মাবতার, আমার পূজনীয় শ্বশুর-শাশুড়ি অসুস্থতা ও বয়সজনিত কারণে পিটি ঊষার স্পিডে ছুটে এসে ট্রেনে উঠতে পারেননি বলেই জামাইয়ের কর্তব্যপরায়ণতা হেতু চেন খিঁচিয়া ছিলাম।

ইত্যাদি মিথ্যাদি স্থিরকরতঃ আমরা নিশ্চিন্তে কু ঝিক ঝিক করিলাম।

3rd part

সেই ছুটোছুটি টানাটানির সম্পর্ক ক্রান্তি এক্সপ্রেস যথাসময়ে এসে দাঁড়ালো রামনগরে। হোটেল থেকে গাড়ি ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তার মাথায় ব্যাগেজ তুলে বেঁধে যাত্রা শুরু। গাড়ি ঐ ইনোভা বা ঐ ধরনের কিছু। ড্রাইভারের পাশের সিটে তার সঙ্গী। মুখ কাঁচুমাচু  করে চালক বললেন- ভাইকে নিয়ে এলাম, ফেরার সময় তো একা ভয় করবে। রাস্তায় প্রায়ই হাতি থাকে। আমার তো মাথায় ঢুকলো না এই একজোড়া প্যাংলা মিলে একপাল হাতি তো দূরস্ত, আধখানা হাতি দেখলেও থরহরি কম্পমান হওয়া ছাড়া আর কি করবে! ভিজে-শুকনোর কথা তো ছেড়েই দিলাম। কে জানে হাতিকে কাতুকুতু দেবে কি! এসব খোঁজখবর নিতে গেলে আমার আবার গুগল ট্রান্সলেট লাগবে। তাই কৌতূহল ব্যাগে পুরে রামনগরের অন্ধকার দেখার জন্যে তৈরি হয়ে বসলাম।

স্টেশন থেকে আমাদের হোটেল ক্লয়েস্টার দশ কিলোমিটার। তার মধ্যে আট কিমি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। আমাদের হোটেল জঙ্গলের কোলে কাঁখে, অন্তঃপুরে নয়। অন্তঃপুরে 45 দিন আগে বুকিং। বুকিং ওপেন হওয়ামাত্র পুজোর রেলের টিকিটের মতো প্রথম পাঁচ মিনিটেই খতম হয়ে যায়। সব অন লাইন। আমাদের কপালে ঐ শিকে ছেঁড়েনি। হাতে 45 দিন সময়ই ছিল না। হোটেলে পৌঁছে, খেয়ে, ঘুম। বারোর গল্প শেষ।

পরেরদিন তেরো হলেও কোনো গেরো ছিল না। বুফেতে ব্রেকফাস্ট। নানান চয়েস ছিল। ভালোই। আজ দুপুরে আড়াইটে থেকে পাঁচটা জিপে জঙ্গল সাফারি। জিপ এখান থেকে তুলতে আসবে দেড়টায়। আপাতত ব্রেকফাস্টের পর গল্পর ব্রেকডান্স শুরু হয়ে গেল সুইমিং পুলে নামবে বলে। সঙ্গে ঘ্যানঘ্যানানি মিউজিক। আমি আগেই হাত ডুবিয়ে পরখ করে নিয়েছি - কনকনে ঠাণ্ডা  জল, পরিস্কার, জল সমানে বদল হচ্ছে, ফলে রোদ পড়ে গরম হবার চান্সই নেই। ঝিনুক তিতিবিরক্ত হয়ে তাকে জলে নামার সাজসরঞ্জাম দিয়ে আমাকে বলল তুমি ওকে নিয়ে নামো, ঠাণ্ডা লেগে গেলে আন্টিবায়োটিক এক কোর্স। এখানে পাওয়া যাবে। আমি প্রবল অস্বীকার করলুম। তখন বিনয় ওকে নিয়ে সুইমিং পুলে গেল।ঠিক হল ও ডুবলে তোলা ছাড়া বিনয় নামবে না। একটু পরে আমিও গুটিগুটি হাজির হলুম। যে ছেলে রোজ চান করার সময় ঠাণ্ডা জল নিয়ে ঝঞ্ঝাট করে সে দেখি ঐ কনকনে জলে লাফঝাঁপ করে আমাকে আবার ডাকাডাকি করছে। একটু পরে দেখি ওর বাবাও নেমে পড়ছে। আমারও লোভ হল। আবার ঘরে চেঞ্জ করে এসে ইঞ্চি বাই ইঞ্চি করে জলে নামতে লাগলুম। তারপর একবার চোখকান বুজে জয় কালী কলকত্তাওয়ালী বলে ঝপাং করে একটা ডুব। ঠাণ্ডাটা এবার আস্তে আস্তে হজম হতে লাগল। একটু পরে দেখি মেয়েও নামছে, দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কাঁপতে কাঁপতে। সাঁতার কাটলে অবিশ্যি গা গরম হয়ে যায়, ঠাণ্ডা কম লাগে। খানিক জলকেলি করে আমিই প্রথম উঠে পড়লুম। নাঃ, ঠাণ্ডা লাগেনি কারুরই। আরাম হচ্ছিল। জল দেখে ঝাঁপানোটা তিন জেনারেশনের জিনগত দোষ।

প্লেন ডাল-ভাতে লাঞ্চ করে দেড়টায় জিপে উঠলুম। খোলা জিপ। সামনে ড্রাইভার আর গাইডের সিটের দুপাশে দুটো দরজা। আর কোনো দরজার বালাই নেই। পেছনে তিন তিন ছ'জনের সিট, দুটো রোতে। জিপের গায়ে, চাকার পাশে, ওপরে পা রাখার জায়গা। সেখানে পা দিয়ে, রড পাকড়ে চড়ো।

জিম করবেট ন্যাশানাল পার্কের পাঁচটা ভাগ, প্রতি ভাগে একটি করে গেট। আমরা আছি বিজরানি গেটের কাছাকাছি। বলে সবচেয়ে ভালো ঢিকালা অংশ। জীবজন্তু বেশি দেখা যায়।  কাল যাবো ঢিকালায়। সব সফরির বুকিং ও পারমিট সংগ্রহ অনলাইনে করতে হয়। প্রতিদিনের ট্যুরিস্ট কোটা আছে। তার বেশি পারমিট দেয় না। বিজরানি গেটে আই কার্ড চেকিং, গোনাগুনতির পর্ব মিটিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ। অসংখ্য হরিণ, সম্বর, শুয়োর, পাখি, হনুমান - এইসব দেখলুম। আর দেখলুম জঙ্গলের মহিমা। সাফারি না নিলে তো আর জঙ্গলের বুকের ধুকপুক শুনতে পেতুম না। তার শব্দ গন্ধ স্বাদ, আলো আঁধার, শালপ্রাংশু সবুজ আর বাজে পোড়া কালো ঢ্যাঙা কঙ্কাল, ঝরা পাতার আলপনা আর পোড়া পাতার ছাই , দু ইঞ্চি মাপের পাখি আর বাহারি প্রজাপতি, ছোটো বড়ো বোল্ডারে ছাওয়া নদীর শুকনো খাত - এ সবের শুলুক সন্ধান কি আর পাওয়া যেত? বাঘ না দেখলে আমার ভ্রমণে কম পড়ে না। চিড়িয়াখানায় বাঘ দেখে নেব। জঙ্গল সাফারি শেষ করে জিপ আবার আট কিলোমিটার জঙ্গল পেরিয়ে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেল। তারপর ফ্রেশ হয়ে, গল্প করে, খেয়ে ঘুম।

4th part

চারের পর্বে চোদ্দোর গদ্য। সকালে তৈরি হয়ে বুফেতে ব্রেকফাস্ট করে সাড়ে দশটায় অটোতে উঠলাম। গন্তব্য রামনগর ডিগ্রি কলেজ। সেখান ক্যান্টার আসবে। তাতে চড়ে আজ ঢিকালা গেট দিয়ে ঢুকে জঙ্গল ভ্রমণ। সাড়ে এগারোটা থেকে সাড়ে পাঁচটা। ক্যান্টার দেখতে বাসের মতো, মাথা ঢাকা, বাকি সবই জানলা, লোহার সরু পাত দিয়ে গাড়ির বডির সঙ্গে সিলিং জোড়া। মিলিটারি অলিভ রং। ভেতরে দুধারে দুটো দুটো সিট। ড্রাইভার ও তার পাশের সিট ধরে মোট আঠেরো।

দাঁড়িয়ে আছি। দেখলাম দূর থেকে দুটো ক্যান্টার আসছে। এসে ঘুরিয়ে রাস্তার ধারে তারা খাড়া হল। একটার নম্বর 9, অন্যটায় নম্বর নেই। আমাদের ক্যান্টরের নম্বর দশ। এজেন্ট দিয়ে বুকিং হয়েছে। সেই এজেন্টও স্কুটারে করে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। 9নং ক্যান্টারের দরজা খুলল, এক দল অপেক্ষমান উঠে গেলেন। আমি দেখেছি অন্য ক্যান্টারের পেছনে দশ লেখা আছে। কিন্তু তার দরজার লকের বাইরের দিকের হাতলটা নেই। অতএব বাইরে থেকে খোলার কোনো উপায় নেই। কত বুদ্ধি মালিকের! দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ইতিমধ্যে নানান সাইজের মহিলা পুরুষ মিলিয়ে একদল বাঙালি এসে বীরদর্পে ক্যান্টারের দরজার দিক ঘিরে, আমাদের কোনো পাত্তা না দিয়ে দাঁড়িয়ে হট্টগোল শুরু করে দিল। ভাবলাম ওদের  হৈচৈতে যদি দরজাটা খুলে দেন ড্রাইভার। তারপরেই মনে হল এই দল উঠলে কোনো ধারের সিটই আর আমাদের জুটবে না। তবে ক্যাঁচরম্যাচরে থতমত খাওয়া তো দূরের কথা, হৃষ্টপুষ্ট ড্রাইভার সায়েব তাঁর পাশের নিজস্ব দরজা দিয়ে নেমে ফোন কানে দিয়ে উচ্চকণ্ঠে বাক্যালাপ করতে করতে অত্যন্ত ব্যস্ততা দেখিয়ে সামনে থেকে চলেই গেলেন। এজেন্ট বেচারা মুখে অচল স্কুটারের সিটে বসে। আমরা হট্টগোলদের সূচ্যগ্র দূরের কথা, পুরো মেদিনী ছেড়ে দিয়ে একপাশে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি, বাঘের মুখোমুখি হবার যথেষ্ট ট্রেনিং আমাদের হয়নি, আর ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে আরও গুটিয়ে যাচ্ছি। একটু পরে ড্রাইভার ফিরে এলেন। কান থেকে ফোন না নামিয়েই হট্টগোলদের বললেন - আপকা ক্যান্টর আ গয়া, উস তরফ খাড়া হোগা। শুনেই দলবল সেই দিকে ছুটল। ড্রাইভার ফোন পকেটে ঢুকিয়ে নিজস্ব দরজা দিয়ে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা খুললেন। এজেন্ট এসে সামনে দাঁড়ালেন। আমাদের উঠতে বললেন। উঠে আমি ড্রাইভারকে জিগেস করলাম তাঁর পাশের সিটে বসা যাবে? প্রথমে বললেন - গেট থেকে বসিয়ে নেব। তারপর বললেন, আচ্ছা বসে যাও। এ তো সব পেয়েছির খুশি! ইঞ্জিনের খাঁচা ইঞ্জিন সব ডিঙিয়ে ডাঙিয়ে সম্রাজ্ঞীর মসনদে ধপ্পাস করে বসে পড়লাম। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখি সেই হট্টপার্টি বিপুল বিক্রমে ছুটে আসছে আমাদের ক্যান্টরের দিকে। মানে ওদের এখনও কিছু আসেনি। আমি ভাবছি, এবার ওরা উঠবে। আমাদের তো বসা হয়ে গেছে। দুজনের সিট ভরেই বসেছি আমরা। সব কটা জানলার ধার দখল করিনি। উঠুক এবার। ও মা, কোথায় কি! ড্রাইভার স্টার্ট দিয়ে ওরা পৌঁছনোর আগেই হুস করে বেরিয়ে গেলেন। কি চুক্কি!

রাস্তায় দুজায়গা থেকে আরও লোকজন উঠলেন। তারপর গেট থেকেও কজন। সিট ভরেই গেল।

এরপর গেট। সেখানে অনেক পেপার ওয়ার্কস থাকে,ফলে দেরি হয়। গেট থেকেও ২/৩ জন উঠলেন। ঠিক তার আগেই যারা উঠেছিল ড্রাইভার বোধহয় তাদের সিট একটু অদলবদল করতে বলেছিলেন। ব্যাস। এঁরাও বাঘের মুখোমুখি হবার জন্যে ফুললি ট্রেন্ড, বাঙালি, ইউটিউব ইউথ। একটু আগে গেটের গায়ে আঁকা বাঘের গায়ে হেলান দিয়ে লেকচার দিতে দিতে ভিডিও করছিল। শুনছি পেছনে তাদের একটি ছেলে বলছে ছেড়ে দে না, এখন ঝামেলা করলে দেরি হয়ে যাবে সবার। মহিলা কণ্ঠ গর্জে উঠছে - হোক দেরি। আমরা কি রোজ রোজ আসব? .... একেবারে এলএলএইচ (লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্তান) মেজাজ! এবার ড্রাইভার, সঙ্গে গাইড - খানিক বাদানুবাদের পর আগের অদলবদলে রদবদল করে শ্বেতপতাকা উত্তোলন করতঃ ক্যান্টর স্টার্ট নিল। আমি ড্রাইভার ও গাইডকে চকলেট অফার করলাম। গাইড রিফিউজ করলেন, ড্রাইভার নিলেন। বেচারিকে তো দুদুটো যুদ্ধ সামলাতে হয়েছে!

জঙ্গলের এই ঢিকালা অংশে রামগঙ্গা নদী। কোথাও ভরা জলে স্রোতস্বিনী, কোথাও শুকনো প্রশস্ত নদীখাত। অসংখ্য বোল্ডারের ফাঁক দিয়ে শীর্ণ দু একটি ধারা বয়ে চলেছে মাত্র। সেখানেই জীবজন্তু জল খেতে আসে। বোল্ডারের রং মূলত সাদাটে, তবে অন্য রংও আছে। এইরকম জায়গাতেই কুমীর আর হাতি দেখলাম। নানান রকম পাখি। সাইবেরিয়ান স্টর্কও ছিল। এছাড়া হরিণ, সম্বর, হনুমান, শুয়োর, ময়ূর তো আছেই। গাড়ির রাস্তার পাশের সরু পথে একটা বাঘ এপাশ থেকে ওপাশে চলে গেল। আমার মনে হল কি যেন একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেল! অন্তত অনেকে স্পষ্ট দেখেছে - বাঘ! আমি দেখে থাকলেও বা অংশ মিস করে গেছি, ঘ-টা হয়ত দেখেছি।

অনেকটা ভেতরে রামগঙ্গার ওপর একটা বাংলো  ঘিরে রেস্টুরেন্ট, টয়লেট আছে। সেখানে লাঞ্চ, স্ন্যাকস পাওয়া যায়। আমাদের সঙ্গে একটুআধটু খাবার ছিল। আমরা ওখানে ঢুকিনি। নদী এখানে ভরভরন্ত। তারই কাছে বসে দাঁড়িয়ে খেয়ে নিলাম। তারপর আবার ক্যান্টার। এবারে ড্রাইভার আমাকে জিগেস করলেন - বাদাম কেয়া হোতা হ্যায়? ও গানা হ্যায় না - বাদাম বাদাম? মুংফলি। আরও বললাম - কচ্চা মুংফলি। তিনি আরও ইনফরমেশন আশা করছিলেন খাস বাঙালির কাছে। কিন্তু হায় আমার পকেটে এর চেয়ে বেশি কিছু নেই।

ফেরার পথে আমরা বাজারের ওপর নেমে পড়লাম। সকলেরই খিদে পাচ্ছিল। স্ট্রিট ফুড ছিল। মোমো, ফুচকা, আলু টিক্কি ইত্যাদি। পরপর দোকান দিয়ে বসে। একজনের কাছে তার মোমোর খোঁজ করতে সে অত্যন্ত আশ্বাস দিয়ে বলল পিওর ভেজ মোমো, ননভেজ ঐ পাশের লোকের কাছে। আমরা তৎক্ষণাৎ পাশের লোকের কাছে। পেটপুরে মোমো আর আলুটিক্কি খেলাম। অবিশ্বাস্য দামে - মোমো প্লেট 40/-, আটপিস করে, সাদা-লাল শসসহ! আর আলুটিক্কি 25/- প্লেট, দুটো করে। সস্তা, সুস্বাদু। তারপর আরেকটা রাস্তার ওপরের দোকানে বসে চা। সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করে দিল। দোকানটা আদতে এক্সটেনডেড মুদির দোকান। তারই সামনেটাতে একপাশে তার বৌ চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে বসে। সকালে যে অটোতে বেরিয়ে ছিলাম তাকে ফোন করে আনিয়ে আবার জঙ্গল পেরিয়ে হোটেলে প্রত্যাবর্তন।

5th part

পঞ্চম পর্ব নেহাৎই প্যাঁচহীন। পনেরো তারিখ সকাল সকাল চান ব্রেকফাস্ট সেরে, বাকি গোছগাছ শেষ করে ব্যাগপত্তর নিয়ে গাড়িতে চড়া। রামনগর থেকে নৈনিতালের দূরত্ব 67 কিলোমিটার। প্রথম আট কিলোমিটার রোজের চেনা জঙ্গুলে পথ। সে পথে অসংখ্য বানর আর ক্বচিৎ কখনও হরিণ। তার পর হাইওয়ে। তবে ফিকে বা ঘন এবং দূরে বা কাছে জঙ্গলের উপস্থিতি অনিবার্য। কাল রাতে ডালের চেয়ে একটু বড় মাপের এক রকম দানার তরকারি খেয়েছি। ভালো লেগেছে, বিশেষত বিনয়ের খুব ভালো লেগেছে। লোকাল প্রডাক্ট বিন - নাম ভট্টার। পথে সেটা কিনতে হবে। ড্রাইভারকে বলা আছে। গাড়ি হাইওয়ে ছেড়ে ঘাটের পথ ধরল। একটু যেতেই খাদের ধারে এক চিলতে তেকোনা চাতালে একটা ওপেন দোকান পড়ল। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে গলা বাড়িয়ে জিগেস করল ভট্টার আছে কিনা। সদর্থক উত্তর পেয়ে নান্দিক আর আমি নামলুম। দুরকম দামের দুরকম ভট্টার। একটা পিষে রান্না, অন্যটা ভুনে মানে রোস্ট করে রান্না। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি কাল রাতে শোনা পদ্ধতির সঙ্গে মিলে গেল। অতএব ঐটা এক কিলো। কত রকম আলু রয়েছে -ছোটো গুঁড়ি, লালচে, বড়ো অলিভ রঙের। আমাদের গাঁঠি কচুর মত দেখতে, কিন্তু হৃষ্টপুষ্ট লম্বায় প্রায় বারো ইঞ্চি - কি সবজি কে জানে। বড়ো বড়ো বিট শাক সমেত, আর ইঞ্চি পাঁচেক লম্বা টাটকা মটরশুঁটি। আমি দুটো নিয়ে দোকানদারকে দেখাতে নেবার অনুমতি মিলল। গাড়িতে উঠে একটা বিনয়কে দিলাম, অন্যটা আমি। খেতেও খুব মিষ্টি আর কচি।

ঘাটের পথ সব সময়েই অভিনব।পরতে পরতে তার সৌন্দর্য খোলে। পাহাড় আর খাদ সমানে দিক বদল করে। যত ওপরে ওঠা যায় তত মনে হয় নিচের গাছগুলো সার বেঁধে লাইন করে সৈনিকদের মতো দাঁড়িয়ে। দূরে পাহাড়ের গায়ে খাপছাড়া বসতির চিহ্ণ। আর রাস্তার ধারে ধারে বুনো ফুলের রঙের বাহার। পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়ি নামছে। আজকাল ঘাটের পথেও ওভারটেকিংএর চল। শেষ অবধি এসে পৌঁছলুম নৈনিতালের হোটেল হিমালয়ে। মেয়ের ঘর পছন্দ হচ্ছিল না। ছবি দেখে অনলাইনে বুকিং করেছে। তার সঙ্গে অমিল। সেই ছবি বের করে, মিলিয়ে দুইখান ঘর বের করে সেখানে ঢোকা হল। ঘরের সামনেটা পুরো কাঁচের জানলা। সেখান থেকে লেকের দৃশ্য। আর নিচে মিস্ত্রির কাজ চলছে পুরো দমে - সে দৃশ্যও। সামনে পিক সিজন - তারই প্রস্তুতি। বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে বড় হোটেল, সবকটা ঘর টিপটপ নয়। লকডাউনের কামড়ের চিহ্ন  ফুটে রয়েছে। এই বিখ্যাত শৈলাবাস যে সেই সব দুর্দিন কাটিয়ে আবার ছন্দে ফিরছে, ফিরতে পারছে সেটাই তো জীবনের আশ্বাস!

আমাদের হোটেল বাসস্ট্যান্ডের পাশে। তার চেয়ে দু'পা এগিয়ে বাঁদিকে মলরোডের শুরু। বাস স্ট্যান্ড থেকে চড়াই ভেঙে হোটেলের দরজা। সেটা গাড়ির রাস্তাও। কিন্তু হলে কি হবে! কোনো ট্যুর না নিলে গাড়ি সঙ্গে থাকবে কেন! দূরত্ব তো সামান্য। মল রোড তো সমতল রাস্তা, উঁচু নিচু নেই। এই দু'পা রাস্তাই হাঁটুর কাছে দুশো হয়ে যাচ্ছে! ওদের তো বয়স হয়েছে। আমি নামা বা ওঠার সময় দশ পা করে যাচ্ছি আর একটু দাঁড়াচ্ছি। সোমনাথের হাঁটুর বয়স বাড়েনি বটে, কিন্তু দমে কুলোয় না। ও এসে অবধি আর বেরোয়নি। আমরা লাঞ্চ করে বেরিয়ে প্রথমে একঘন্টা প্যাডেল বোটে লেকের বুকে অনেকটা চক্কর কাটলুম। বোটে সব দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া - বিনয় আর নান্দিক প্যাডেলিং, আমি আর ঝিনুক চোখের কাজ - আশপাশ দেখা, ঘড়ির খেয়াল রাখা, আর ছোটোটা নাকি স্টিয়ারিংএ, পাপা আর মামাকে কন্ট্রোল করছে। গুরুদায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। কী আরাম! বোটরাইডের পর মলরোডে হাঁটা, একটু শপিং আর লেকসাইড কাফে। লেকের দিকে মুখ করে লম্বা লম্বা তেঠ্যাঙা টুলে পাশাপাশি বসে সামনের হাই বেঞ্চে কফি, হট চকলেট, লাটো, কোল্ড কফি ইত্যাদি গলাধঃকরণ শেষে আবার হাঁটতে হাঁটতে ফেরা। তারপরে তো আড্ডা ডিনার ঘুম আছেই- তা বলাই বাহুল্য।

ষোলো তারিখ সক্কাল সক্কাল সোমনাথ ঘোষণা করলেন যে তিনি কোথাও বেরোবেন না। অগত্যা ব্রেকফাস্ট করে আমরা গুটি গুটি চললাম - গন্তব্য রোপওয়ে। নিচে থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে রোপওয়ের পাদদেশে। তারপর সিঁড়ি আর rampরোপওয়ে থেকে লেকটা পুরো সুদৃশ্যমান এবং চক্ষুর আরাম, প্রাণের খুশির জোয়ার!

ওপরে বেশ কিছু দোকান, স্যুভেনির, উলেনস, কম্বল, কার্পেট, পান-ভোজন। আরও কয়েক ধাপ ওপরে বায়নোকুলার সম্বলিত ভিউ পয়েন্ট। সেখান থেকে নেমেই আবিষ্কার করলাম জঞ্জাল সংগ্রহের গাড়ি ও গান। এটা একটা দিক। রোপওয়ে থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে গেলেও কিছু দোকান আর খেলা। ব্যাটারি গাড়ি, গো কার্ট, বাম্পার কার, জ়িপ লাইন, রক ক্লাইম্বিং। একটা ডায়নোসরের গুহা। সেখান থেকে মামা-ভাগ্নে ঘুরে এল। ভাগ্নেকে এই প্রথম ভয় পেতে দেখলাম। সে একবার মামার সঙ্গে, একবার পাপার সঙ্গে দুরকম গাড়িতে চড়ল। আর আমি জ়িপ লাইনে চড়ে সাঁ করে এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সরেজমিন তদন্ত সেরে নিলাম।

ফিরতি পথের রোপওয়ে সেরে আশপাশে খানিক শপিং, ওখানেই রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ। তারপর খানিক হাঁটা, দোকান দেখা। তারপর একটা সাইকেল রিক্সা করে গল্প, নান্দিক আর আমি লটবহর নিয়ে ফিরে এলাম। ওরা আরও খানিক ঘুরে ফিরল।

সাইকেল রিক্সা নিচু, পা অল্প ভাঁজ করে বসতে হয়, একটু নিচু সোফার মতো। মলরোডের শেষ প্রান্তে একটা অ্যান্টিক দেখতে পাথর আর কাঠের নির্মাণের অফিস। সেখানে টিকিট কাউন্টার। রিক্সা বা ট্যাক্সি বা শাটল ট্যাক্সিতে চড়ে মলরোড পেরোতে হলে ওখানে লাইন দাও, কাউন্টারে টাকা দাও। কাউন্টারের বাইরেও একজন লোক দাঁড়িয়ে, তার সামনে একটা মাইক। তার কাজ লাইনে পরবর্তী নম্বরের গাড়িকে হাঁক দিয়ে সওয়ারিকে বসিয়ে দেওয়া। গাড়ি আর রিক্সরা সামনেই দাঁড়িয়ে, যেমন আমাদের প্রিপেইড বুথে থাকে। পেমেন্ট মা কিছু সব কাউন্টারেই। আমাদের একটা রিক্সা, আড়াইজন সওয়ারি, ভাড়া সাকুল্যে কুড়ি টাকা মাত্র!

রাতে ডিনার টেবিলে গল্প অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে তার মায়ের কাছে অভিযোগ তুললো - তুমি আমার জন্যে সবসময়ে সেম সেম অর্ডার করো! তার মা হিসেবে করে দেখালো যে একদিন একরকম পাস্তা, অন্যদিন অন্যরকম পাস্তা, একদিন সুপ, একদিন খিচুড়ি ইত্যাদি খাওয়ানো হয়েছে তাকে। ঝাল-মশলা ছাড়া জিনিসপত্র চাই তার। সে সবেতেই সায় দিল। তারপর বলল - সবই তো সেম সেম। এখন আমি অর্ডার করবো।

-কর। কি খাবি?

-ডাল-ভাত।

গল্পর অর্ডার করা মানেই - ডাল-ভাত! এটা কিন্তু সেম সেম নয়!!

6th part

আজ ছিল তালপর্ব। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ট্যুরে বোরোনো হল - লেকট্যুর। সকলে। মানে সোমনাথ ও গেছিলেন। তাল মানে লেক। নৈনিতালকে ছেড়ে আরো হাফডজন তাল। নৈনিতালকে দৃষ্টিতে রেখে যাত্রা শুরু। পুরোটাই ঘাটের রাস্তা। প্রায় ২০+২০, চল্লিশ কিলোমিটার পথ। প্রথমে পড়ল গরুড়তাল। দূর থেকে চলন্ত অবস্থাতেই দেখলাম। এই তালে কেউ নামে না, নামার অনুমতি নেই। দ্বিতীয়টি সাততাল। এটা ছোটোখাটো ট্যুরিস্ট স্পট - বোটিং, কায়াকিং, খাবারের দোকান, লেবুর জল, ফুচকা ইত্যাদি। অনেক দোকানই বন্ধ।

এরপর নলদময়ন্তীতাল - গাড়ি থেকে দেখে মনে হল সুইমিং পুলের সাইজ। শুনলাম কনস্ট্রাকশনের খপ্পরে পড়ে আজ তার এই শীর্ণ দশা!

এর পরেরটি কমলতাল। ছোটো লেক, পদ্ম ফোটে। এখানে নামিনি। নামা হল পাশের নৌকুচিয়াতালে। মোটামুটি বড় লেক। আশপাশে দোকানদানি আছে কিছু। নেমে লেকের ধারের রাস্তা ধরে যাবার সময় দেখি সেই রাস্তার একপাশটা কমলতাল, আর অন্যপাশ নৌকুচিয়াতাল। এখানেও বোটিং, কায়াকিংএর সঙ্গে রয়েছে জ়িপ লাইন - অনেকটা লম্বা, একটা নিচু দিয়ে, অন্যটা উঁচু  দিয়ে। জলের এপার থেকে ওপার। মেয়ে চড়লো তাতে।

এখান থেকে ভীমতাল। ভীমতাল অপেক্ষাকৃত পরিচিত নাম। আমরা পথে ভীমতালের বাঁক পেরিয়েই এসেছি এই শেষ দ্রষ্টব্য নৌকুচিয়াতালে। নামবো ফেরার পথে। রাস্তার ওপর পড়ল এক হনুমান মন্দির। সামনে এক বিশাল হনুমান মূর্তি। ড্রাইভারের কথায় গাড়ি থেকে নামলুম। দেখি প্রায় দোতলা মতো সিঁড়ি দিয়ে নেমে কৃত্রিম সুড়ঙ্গের ভেতরে দিয়ে অনেক দেব-দেবীকে স্যালুট ঠুকতে ঠুকতে সুড়ঙ্গ ভেদ করে অন্য পাশ দিয়ে বেরতে হবে। সুড়ঙ্গ মাঝে মাঝেই ছাদহীন, অতএব ওপর থেকেই দৃশ্যমান। জুতো খোলার ব্যাপার রয়েছে। সুতরাং আমি নেই। তারপর দেখলাম আমাদের কেউই নেই - সিঁড়ি বা জুতোর কারণে। আবার চলা শুরু। যাবার সময়ে দেখেছিলাম একটা ছোট্টো গুমটি, সামনে প্যারাগ্লাইডিংএর বোর্ড লাগানো। ফেরার পথে সবার চোখই সেটা খুঁজছে। পাওয়া গেল! ছেলে আর মেয়ে দুজনেই প্যারাগ্লাইডিং করবে। আমার প্রাণটা হাহুতাশ করছে। আজ স্কার্ট পরে বেরিয়েছি! প্যান্ট ছাড়া হয় না এসব।  হিসেব ভুলের মাশুল দিচ্ছি। আর কি কখনও/সুযোগ আসিবে হেন। করুণ সুরে মনে মনে গাইছি। দোকান বলল আধঘন্টা মাত্র লাগবে। দুজনকে নিয়ে চলে গেল। ডানপাশে পাহাড়ি দিকে খানিক উঠে খানিকটা সমতল জায়গা হল টেক অফ পয়েন্ট। আর বাঁদিকে খাদের দিকে খানিক সমতল জায়গায় ল্যান্ডিং। সেখান থেকে খানিকটা পায়ে পায়ে নামলে বাকিটা ওরা বাইকে করে আমাদের এই অপেক্ষার পয়েন্টে পৌঁছে দেবে। আধঘন্টার অপেক্ষা কার্যত দেড় ঘন্টা হল। টেক অফ পয়েন্ট থেকে মাঝে মাঝেই একটা করে উড়ন্ত বাহারি ছাতা ঘুরেফিরে দুলতে দুলতে ল্যান্ডিংএর দিকে চলে গিয়ে ল্যান্ড করছে। এতই দূর আর উঁচু যে মানুষ চেনা তো দূরের কথা অবয়বটুকুও বোঝা যাচ্ছে না। প্রত্যেকের সঙ্গেই একজন করে পাইলট থাকবেন। আমরা প্রত্যেকটা ছাতা দেখেই ভাবছি এটাই হবে। বিনয় ক্যামেরা নিয়ে রেডি হচ্ছে প্রতিবারই। আমাদের ঘাড়ে ব্যথা। বিনয়কে বললাম - যে কোনো একটার ছবি তুললেই তো হয়ে যায়, বোঝা তো যাচ্ছে না। গল্প ঘ্যানঘ্যান করলেই ওকে বলা হচ্ছে- ঐ দেখ মাম্মাম ঐটা। শেষ অবধি সে বলল যে মাম্মাম এতবার নামছে কিন্তু আসছে না কেন? শেষ অবধি যখন তারা এসে হাজির হল তখন জানা গেল যে ওপরে একাধিক কোম্পানির টেক অফ পয়েন্ট তাই অত গ্লাইডার দেখছিলাম  আমরা। কিন্তু আমাদের কোম্পানির পাইলট মাত্র দুজন। তাই লাইন কম হলেও সময় লাগছিল। পাইলট ল্যান্ড করিয়ে বাইকে করে আবার টেক অফ পয়েন্টে পৌঁছবে তবেই পরের জন উড়বে। হ্যাঁ, পথের ঐ অংশে ঐ বিশাল ছাতার ব্যাগ পিঠে নিয়ে বাইকে দুজন সওয়ারির মুহুর্মুহু গমনাগমন লক্ষনীয় ছিল বটে। এবার ভীমতাল। গল্পকে  খানিকটা কেক আর ফ্রুটজুস খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে তার মেজাজ ঠিক আছে। তিনটে বেজে গেছে। এখন আগে রেস্টুরেন্টে ঢুকে লাঞ্চ। ভীমতালে অজস্র হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হোম স্টে, বড়ো বাজার, শপিং এর বাজার, বোটিং, কিডস গেমস, অ্যাডভেঞ্চার, স্ট্রিট ফুড ছড়ানো। জমজমাট জায়গা। এমনকি লেকের জলের ওপরেও একটা কাফে, আইল্যান্ড কাফে। তবে নৈনিতালের চেয়ে ছোটো জায়গা। গল্প তো লিস্ট করে নিয়েছে লাঞ্চের পরে তার কি কি চাই।  সে তো সব নিজে করে। খাওয়া হলেই নিজে হাত ধুতে ছোটে। জল খুব প্রিয় তার। ফলে প্রায় আধা চান সেরে নেয় প্রতিবার। তাকে আগলে রাখতে হয়। এখানেও লাঞ্চ শেষ হতেই এক ছুট্টে বেসিনে গিয়ে ফুলস্লিভ জ্যাকেটের কোয়াটার ভিজিয়ে চলে এল বীরদর্পে। আমাদের সেটাই হল সুযোগ - জামা ভিজে গেছে, এখুনি বদলাতে হবে, নইলে ঠাণ্ডা লাগবে, কেন ভেজালে - ইত্যাদিতে তাকে পর্যুদস্ত করে, তার লিস্টকে ভেস্তে দিয়ে আমরা পাঁচজন বড়ো শেষ অবধি জয়লাভ করলাম। অতএব তার রাস্তায় গড়াগড়ির দৃশ্য মুলতুবি রেখে, ভীমতালের কাক-চিলেদের শান্তিভঙ্গ নাকরে সবাই গাড়িতে উঠলাম। এবার ফেরা, কোনো থামাথামি নেই। কটা বাঁক ঘুরতেই তিনি সামনের সিটে ঝিনুক আর ড্রাইভারের মাঝখানে ঘুমিয়ে কাদা। স্বপ্নে বোটিংএ ব্যস্ত হয়তো!

7th part

আজ আঠেরো। দেখতে দেখতে বেড়ানোর শেষ চ্যাপ্টার। বেড়ানোটাও  যেন শুরু আর শেষের শহুরে ব্যস্ততার মাঝে পড়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেল! আজ আর তেমন কিছু নেই। আজ বিনয়ের জন্মদিন। সকালে চান-খাওয়া সেরে ঘরের আলমারি থেকে বেরোলো সেই সারপ্রাইজ কেক। জন্মদিনের ইংরিজি, বাংলা, হিন্দি

শুভেচ্ছা জানিয়ে কেক কেটে, খেয়ে, বাকিটা  পোঁটলা করে নিয়ে গাড়িতে ওঠা হল। এখন গন্তব্য কাঠগোদাম। সেখান থেকে বেলা তিনটেয় দিল্লিগামী শতাব্দী। রাত ন'টায় দিল্লি।

আজ সকালের রিপোর্টিংযোগ্য ঘটনা দুটো - দুদিন একটু আধটু শপিং করা হয়েছে এবং তার পুরোটাই শীতবস্ত্র। ওজনে কম, বপুতে বেশি। সেসব ঢুকেছে সুটকেসে। আনা জামাকাপড় যতটা সম্ভব গায়ে চড়িয়েছি, প্রয়োজনের বেশিই। তারপর ডাক ছেড়ে হেঁইয়ো হেঁইয়ো বলে ব্যাগের চেন টেনেছি। আশা করি সেই চেন পথে দাঁত বের করে হাসতে চাইবে না। ছোটোবেলার বেডি বেঁধে বেড়ানোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। বেডিং গুটিয়ে তার ওপর বসে লড়াই - চামড়ার বেল্টের আরেকটা ফুটো এগিয়ে আনার চেষ্টায় প্রাণপাত।

আর দ্বিতীয় ঘটনা হল লটবহর মাথায় বেঁধে পেটের ভেতর আমাদের নিয়ে সেই খাড়া টং থেকে ইনোভার নিচে নামার ঢং! একবার কোনোক্রমে ফসকালে গড়াবে না।  টরেটক্কা টরেটক্কা করে লাফাতে লাফাতে রাস্তায় পড়লে ফুটিফাটা, আর লেকের জলে পড়লে সাবমেরিন!

তবে দুটো অপশনই নস্যাৎ করে সে তার নিজস্ব চলনে ফিরে পথে নামল। আমরা ঘন্টা দেড়েকের মাথায় কাঠগোদাম রেল স্টেশনে পৌঁছলুম। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বড়ো স্টেশন। উঁচু ক্লাস, নিচুক্লাস ওয়েটিং রুম ছাড়াও ঘন্টায় বড়োদের দশ আর ছোটোদের পাঁচটাকা ভাড়া নেওয়া এসি ওয়েটিং রুমও আছে। সেখানেই থিতু হলাম আড়াইটে অবধি। এখানে ফোন চার্জিং, কেক বিস্কুট চকলেট জুস ইত্যাদির কাউন্টার ও বললে ভোজনালয় থেকে খাবার আনিয়ে দেবার সুবিধা উপলব্ধ।

শতাব্দীতে প্রথমে স্ন্যাকস ও চা এবং পরে চিকেনসহ ডিনার দিল। নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে একটা এসইউভি নিয়ে হোটেল। খাওয়াদাওয়ার পর্ব মিটিয়েই এসেছি। অতএব এবার আয় ঘুম আয় রে!

 

আজ ঊনিশ, সময় আটটা বেজে আট। বসে আছি গতিমান এক্সপ্রেসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায়। দিল্লির নিজামুদ্দিন স্টেশনে। ট্রেন ছাড়বে, ব্রেকফাস্ট দেবে। পৌঁছবো আগ্রায়। আজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট মমতাজ মহল আর শাহজাহানের সঙ্গে।

8th & last part

আরজ়ুমন্দ বানু বেগম, জন্ম ১৫৯৩এর ২৭ এপ্রিল, আগ্রায়; মৃত্যু ১৬৩১এর ১৭জুন। মাত্র ৩৮ বছর, কিন্তু চমকপ্রদ জীবন। ১৬১২তে প্রিন্স খুররম-এর সঙ্গে বিয়ে। তিনবছর মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান বেগম।  এই জুটিকে সারা পৃথিবী চেনে শাহজাহান- মুমতাজ মহল নামে। মুমতাজের মৃত্যু হয় ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে, অধিক রক্তক্ষরণের ফলে।  সেই মৃত্যুর অমরত্ব প্রাপ্তি ঘটে তাজমহলের নির্মাণে। তাজমহল - পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য!

 

আমারও বড়োদের মুখে গল্প শুনেছি পূর্ণিমার জ্যোৎস্না প্লাবিত তাজমহলের সৌন্দর্যের। তবে এখন সেসব সৌন্দর্য উপভোগের অবকাশ নেই। বিকেলের পরে বন্ধ হয়ে যায় এই ট্যুরিট স্পট। এছাড়া অল্পস্বল্প বিশেষ ব্যবস্থা আছে কিনা জানা নেই। আমাদের টিকিট অনলাইনে কাটা। কাউকে জিগেস করতেও পারিনি। খুব ভীড়। জেনেও লাভ নেই। সকলের ছুটির তারিখের সঙ্গে এসব মেলানো সম্ভব নয়। এখন শুধু আকাশ আর প্রকৃতিই দেখে সে সৌন্দর্য। পশ্চিম গেটে গাড়ি নামিয়ে বলে দিল বেরিয়ে কোথায় অপেক্ষা করতে হবে। আর সেখান থেকেই শু কভার কেনা হল। ঢোকার লাইনের শেষ দেখা যাচ্ছে না। সে লাইনে অনলাইন অফলাইন সবাই হাজির। আমরা টুক করে মাঝখানে ঢুকে পড়লাম। ছ ছজন! কলকাতা হলে ধুন্ধুমার হয়ে যেত। এখানে কেউই কিছু বলল না। আমি কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। গিল্টি ফিলিংস! তারপর একসময়ে তার মুখোমুখি হলাম - কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল! ভেতরে শ্বেতপাথরের জাফরির আড়ালে দুটি সমাধি। সেখানে ছবি তোলা নিষেধ। তারপর বাইরের প্রশস্ত চাতালে এসে হাঁফ ছাড়লুম। ৩৬° টেম্পারেচার আজ। পাথর গরম নয়। এটাই হল শ্বেতপাথরের গুণ। যেখানে রোদ পড়ছে সেখানে অসহনীয় হলেও ভীড়ের কমতি নেই। আর যেখানে ছায়া সেখানে শুধু ভারতবর্ষ নয়, সারা পৃথিবীই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাথরের ওপর বসে। প্রায় শুকনো যমুনা। আর চারিদিকের নিখুঁত স্থাপত্যে সময় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে!

এরপরের গন্তব্য আগ্রা ফোর্ট। সেই ইতিহাসে পড়া দেওয়ানী আম, দেওয়ানী খাস (বইয়ের ছবিগুলো কি কুচ্ছিতই ছিল), আর খাস চত্বরের জানলা জাফরি দিয়ে দূরের তাজমহল। খাস চত্বরেই  মহলের পর মহল - পরতে পরতে খুলছে। দোতলায় মীনা মসজিদ, তারপরে দেওয়ানী খাস। বিশাল ফোর্ট, অন্তহীন সুরক্ষার ব্যবস্থা। ইতিহাস দেখিয়েছে এত সুরক্ষাও সেদিনের শাসকের পক্ষে যথেষ্ট হয়নি। বর্তমান শাসকও আরও আরও সুরক্ষা খুঁজছে সেন্ট্রাল ভিস্তার দুর্গে! সময় বলবে কত ধানে কত চাল!

এরপর খাওয়া, পাথরের দোকান দেখা  আর পেঠা কেনা সেরে স্টেশনে প্রত্যাবর্তন। কাল কুড়ি, রাত আটটায় ফ্লাইট। সারাদিন দিল্লিতে বেরোনোর কোনো প্ল্যান নেই। বিশ্রাম নিয়ে পরশুর কাজের দিনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি! ছক বাঁধা যাপনের ছকে পাক খাওয়া!

**********