Thursday, July 28, 2022

জিম করবেট, নৈনিতাল, তাজমহল 

March 12 – 20, 2022

1st part

ছেলে গৃহত্যাগী 2014 থেকে। মেয়ে নিজের ঘর বাঁধলো - সেও সেই 2014তেই। আরো দুটি মেয়ে যারা পরিবারেরই সদস্য ছিল - তাদেরও বিয়ে হয়ে গেল ঐ 2014তেই। বাড়ি বেবাক ফাঁকা! ঐ আরও দুটির একটি ছিল আমার সংসারের আসল কর্ত্রী। তাই বাড়ি এমন ফাঁকা যে নিজেই চাবি দিয়ে বেরোতে হয়, আবার চাবি খুলে ঢুকতে হয়। শুধু তাই নয়, দুবেলা রান্নার মাসির আবির্ভাবের সময় আমাকেও আবশ্যিক হাজিরা দিতে হয়। এ যেন মনের বেড়ি - মনে রাখতে হয় সময়টময়। এমন তো অভ্যেসে ছিল না। তবে এখন তো আর অভ্যেসের কাঁদুনি গাইতে বসিনি। ওটা তোলা থাক। পরে নাহয় কখনো তেমন কারুর সঙ্গে দেখা হলে গলা জড়িয়ে নাকের জলে, চোখের জলে বাসি কথার হাহুতাশ করা যাবে। এখন টাটকা চর্চার গল্প।

বাড়ি ফাঁকার ফলে সবার সঙ্গে একসঙ্গে দেখাসাক্ষাৎও নেই। তাই আমি মনে মনে ঠিকই করেছিলুম যে ছেলে যখন লম্বা ছুটিতে বাড়ি আসবে তখন বাকি সকলেও যদি রাজি হয় তাহলে সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়া হবে। না হলে তো ছেলে নিজের ঘরে, হয় কম্পিউটারে সেঁধিয়ে নয় ঘুমিয়ে। সে যে বাড়িতে আছে তা টেরই পাওয়া যায়না। মেয়ে-জামাই বাড়িতে থাকলেও ছুটি নিয়ে তো আর বসে থাকেনা। আর গৃহকর্তা বা ল্যান্ডলর্ড যে নামেই ডাকো, তিনি তো ভগবানকেও হার মানান ব্যস্ততায়! ফলে ঐ রাতে খাবার সময়টুকু ছাড়া দেখাই হয় না কারুর সঙ্গে কারুর। ভবিষ্যতও আবার একসঙ্গে থাকার কোনো আশ্বাস দেয় না - এক প্রজন্ম জীবনমুখী তো অন্যটি শ্মশানমুখী। অতএব বেড়ানো। সবাই ছুটি নিয়ে হৈ হৈ, একে অপরকে সময় দেওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো। এই ফাঁকে চুপিচুপি একটা কথা বলে রাখি - লেগে থেকে এদের দিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাদি করাতে হলেও তারপরে আমার আর কোনো খাটাখাটনি থাকে না। অনলাইন বুকিং ও খোঁজাখুঁজি আমার থেকে ভালো ওরা করে। লাগেজ বওয়া, ছুটোছুটি - সব ওরা।  আমার ও গৃহকর্তার শুধু বেড়াতে যাওয়া, প্রায় কোলে চড়ে।

সেই মতো কাল বিয়েবাড়ি নেমন্তন্ন যাবার আগে অবধি কম্পিউটারের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে ততটা সম্ভব নিজের কাজ সামলেছি। আর বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে এগারোটায় শুতে গেছি। আর আজ ভোর ছটায় বেরিয়ে এয়ারপোর্ট। সেখানে লাউঞ্জে ভরপেট্টা ব্রেকফাস্ট সেরে, প্লেনে খানিক ঘুম সেরে নামলুম দিল্লি। তারপর মেট্রোতে নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন। সেখানে কেএফসি, হলদিরাম, Wow ইত্যাদির আপ্যায়নে লাঞ্চ সেরে বসে আছি। মেয়ে-জামাই-নাতি তাদের দিল্লি-বাসী ভাসুরের সঙ্গে দেখা করে ফিরতি পথে। আমাদের ট্রেন 4টেয়। গন্তব্য রামনগর। বেঙ্গল টাইগাররা অপেক্ষায় আছে বেঙ্গলের গেস্টদের জন্যে, জিম করবেট ন্যাশানাল পার্কে। তাদের সময় দিতে হবে।

যতটা বললুম তার ভাঁজে ভাঁজেও অল্পসল্প গল্প আছে। সময় সুযোগ মতো হবে সেগুলোও।

2nd part

এই দ্বিতীয় পর্ব এক্কেরে রহস্যরোমাঞ্চে ভরপুর।বিশুদ্ধ আদখেলেমি থেকে শুরু করে দিমাগ কি বাত্তির হঠাৎ ঝলসে ওঠা, তারপর চোর-পুলিশের মতো রুদ্ধশ্বাস ছুট ছুট ছুট, অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস। যতটা নাটকীয় করে বলছি আসলিয়ত মে তারো চেয়ে বেশি নাটকীয়। এবার নাটক বাদ দিয়ে কথায় আসি।  যার নাটকের দরকার সে নাট্যমেলা থেকে মালমশলা সংগ্রহ করে আরেকবার না হয় সাঁতলে নেবে। কবে থেকে যেন শুরু নাট্যমেলা?

মেট্রো থেকে নেমে পরতে পরতে লিফ্ট ও এসক্যালেটর সহযোগে ভূগর্ভ থেকে নিষ্ক্রমণের পর্বে একটি ক্লোক রুমের দেখা মিলল। ভাবা হল এইখানে ব্যাগেজ সমর্পণ করে খাওয়াদাওয়া সেরে আবার ব্যাগেজ সংগ্রহ করে 4টের ট্রেন ধরা যাবে। সেই ক্লোকরুমের দায়িত্বে ছিলেন এক অসীম দূরদর্শী দার্শনিক ব্যক্তি। তিনি ব্যাগেজসহ আমাদের পর্যবেক্ষণ করে বললেন - এই দু ঘন্টার জন্যে 500 টাকা কেউ দেয়? তার ওপর এগুলো নিতে আবার এই লিফ্ট এসক্যালেটরের দুঃসাধ্য পথ দুবার অতিক্রম করতে হবে। তার চেয়ে লাগেজ পাশে রেখে টেবিলে বসে খেয়ে নিন। অগত্যা....

খেতে গিয়ে একবার সিঁড়ি দিয়ে একতলা ওঠা নামা করতে হয়েছে বটে পোঁটলা পুঁটলি নিয়ে, নইলে এই উপদেশে যার পর নাই সুবিধেই পেয়েছি।

লাঞ্চের পর মেয়ে তো গেল ভাসুরের সঙ্গে দেখা করতে। আমরা বসে হলদীরামের দোকানে। একটা চা, তারপর একটা কফি - পরপর অর্ডার করা চলছে চক্ষুলজ্জার খাতিরে। সোমনাথ টেনশন করছেন। এক সময়ে ফোন করে জানলেন যে ফেরার পথে রাস্তায় দেদার জ্যাম। তবে আপাতত ঝিনুক আর গল্পকে 6নং প্ল্যাটফর্মের কাছে নামিয়ে বিনয় আসছে আমাদের কাছে। এল। লটবহর নিয়ে, স্ক্যানিংএর বিশাল লাইন টপকে, ম্যানেজ করে আমরা যখন ওপারে তখন ঝিনুক উল্টো দিক থেকে এসে বলল - ট্রেন এখান থেকে নয়, পুরোনো দিল্লি স্টেশন থেকে! ঘড়িতে তখন সাড়ে তিন! সব কিছু নিয়ে পিছন দিকে ছুটতে ছুটতেই বলল - অটো পঞ্চাশ টাকা নেয় পৌঁছতে। অন্তত এটুকু বুঝলাম যে পথটা অটোর দূরত্ব। এস্ক্যালেটর থেকে নামতেই অসংখ্য অটোওলা ছেঁকে ধরতে যে কি ভরসা হল! দুটো অটো বোঝাই করে ছুট ছুট। ঝিনুক-সোমনাথ-গল্পর অটো আগে, আমাদেরটা পিছনে। কিন্তু একটু পরেই দৃষ্টির আড়ালে। দেড়খানা যুগান্তকারী সিগন্যাল খেয়ে আমাদেরটা যখন পৌঁছলো তখন শুনলাম আগেরটা তখনও আসেনি। পরে শুনলাম ওরা পুরো দুটো সিগন্যাল খেয়েছে। বিনয় দাঁড়িয়ে রইল। আমি আর ছেলে দুটো সুটকেস নিয়ে পয়দল এগোলাম। এস্ক্যালেটর তারপর ওভার ব্রিজ দিয়ে আবার ছুট। ছুটতে ছুটতেই শুনলাম প্ল্যাটফর্ম বদল হয়েছে - পাঁচ থেকে ছয়ে। ছয়ে নামার সিঁড়ির মুখে নান্দিক আমার হাত থেকে সুটকেস কেড়ে নিয়ে নামতে শুরু করল। নেমে দেখি আমাদের সামনে ট্রেনের C1 কামরা। আমাদের টিকিট C3তে। ঘড়ি বলছে 3.57। এদিকে 1 আর 2এর পর অনেকগুলো ডি কামরা, তারপর 3। আমরা এগোচ্ছি। আদৌ উঠবো কিনা বুঝতে পারছি না। ভাবছি, আর যুদ্ধ করে এগিয়ে কি হবে! যে কোনো ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ছাড়ার আগে যে কোনো দিকে এগোনোর মানেই স্রোতের বিপরীতে যুদ্ধ। কে উঠছে, কে কাকে ওঠাচ্ছে, কে উঠিয়ে নামছে, কে নেমে হাত নাড়ছে, কে আবার দরজা আগলে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে ইত্যাদি প্রভৃতির হজবরল। আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে ফোন করলাম ঝিনুককে। রিং হল, থামল, কিন্তু ধরল কিনা বা কিছু বলল কিনা কিছুই বোধগম্য হল না। তারাও নিশ্চয়ই ছুটন্ত। 3.59। হাল ছেড়ে দাঁড়িয়ে দুজনে ইঞ্জিনের প্রথম বাঁশি শুনলাম। কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মানে বুঝছি তখন হাড়ে হাড়ে। দ্বিতীয় বাঁশি। ট্রেনের বপু নড়ে উঠল। এমন সময় নান্দিক ফোন কানে দিয়ে বলল - উঠতে বলছে, ওরা উঠেছে। ট্রেন তখন চলন্ত, সামনের দরজা আগলে একজন দাঁড়িয়ে। আমি হ্যান্ডেলের দিকে হাত বাড়িয়ে এগোতে তিনি সরে গেলেন, কিন্তু শাহরুখ খানের মতো হাত ধরে তুলে নিলেন না! নিজেই উঠলাম।আমার পিছনে দুটো সুটকেস, তার পিছনে নান্দিক। এটা কিন্তু C3 নয়। এখনও ডি সিরিজই চলছে। সামনের স্টেশনে নেমে নিজের জায়গায় যেতে হবে। আধমিনিট মতো চলে ট্রেনের গতি আবার নিম্নমুখী, তারপর থেমে গেল। এটা চেন টানার থামা। ছেলেকে বললাম- কেউ চেন টেনেছে। একবার চেন টানলে সব ঝঞ্ঝাট সামলে আবার চলতে একটু সময় লাগে। চল আমরা এগিয়ে তাই। নেমে দুটো কামরা পরে এবার C3তে উঠলাম। টিটিই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁকে বললাম - আমরা দুজন, বাকি চারজন C1 উঠতে পেরেছে। উনি লেখালিখি সেরে বললেন আধঘন্টা বাদে গাজিয়াবাদে চলে আসতে বলে দাও। ট্রেনও আবার ছাড়ল।

এবার গাজিয়াবাদ কিসসা। আমার মনে হচ্ছে গাজিয়াবাদ আসছে, ট্রেন গতি কমাচ্ছে, চলন্ততেই চা-কফি উঠছে। ছেলেকে বলছি - একটু নেমে C1এর দিকে যা, দুটো সুটকেস রয়েছে, অনেকটা দূর এখান থেকে। গুগলশিষ্য পুত্র আমার বলল - বলছে 3.44এ গাজিয়াবাদ, এখন 3.33। কিন্তু আমার রেলানুভূতি বলছে এটাই গাজিয়াবাদ। শিষ্য অনড়। আমি তখন ঘোড়া ডিঙিয়ে টিটিই কে জিগেস করলাম - কোন স্টেশন আসছে? - গাজিয়াবাদ। শুনে শিষ্য সচল হল। তবে চড়ন্ত পাবলিক ডিঙিয়ে দরজায় পৌঁছনোর আগেই চড়ন্ত পাবলিকের মধ্যে অভিপ্রেত চেনা মুখেদের দেখা মিলল।

পরবর্তী খবর - চেন টেনেছিল বিনয়, আমরা তখনও উঠিনি বলে। চেন টানার কনসিকুয়েন্সে গার্ড এসে চেন টানকের ডিটেলস নিয়ে গেছেন। এখনও কোনো কেস আসেনি। আর আমরা আলোচনা করে ঠিক করেছি যে যখন কেস ফেস করা হবে তখন টানকের বক্তব্য হবে - হুজুর ধর্মাবতার, আমার পূজনীয় শ্বশুর-শাশুড়ি অসুস্থতা ও বয়সজনিত কারণে পিটি ঊষার স্পিডে ছুটে এসে ট্রেনে উঠতে পারেননি বলেই জামাইয়ের কর্তব্যপরায়ণতা হেতু চেন খিঁচিয়া ছিলাম।

ইত্যাদি মিথ্যাদি স্থিরকরতঃ আমরা নিশ্চিন্তে কু ঝিক ঝিক করিলাম।

3rd part

সেই ছুটোছুটি টানাটানির সম্পর্ক ক্রান্তি এক্সপ্রেস যথাসময়ে এসে দাঁড়ালো রামনগরে। হোটেল থেকে গাড়ি ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তার মাথায় ব্যাগেজ তুলে বেঁধে যাত্রা শুরু। গাড়ি ঐ ইনোভা বা ঐ ধরনের কিছু। ড্রাইভারের পাশের সিটে তার সঙ্গী। মুখ কাঁচুমাচু  করে চালক বললেন- ভাইকে নিয়ে এলাম, ফেরার সময় তো একা ভয় করবে। রাস্তায় প্রায়ই হাতি থাকে। আমার তো মাথায় ঢুকলো না এই একজোড়া প্যাংলা মিলে একপাল হাতি তো দূরস্ত, আধখানা হাতি দেখলেও থরহরি কম্পমান হওয়া ছাড়া আর কি করবে! ভিজে-শুকনোর কথা তো ছেড়েই দিলাম। কে জানে হাতিকে কাতুকুতু দেবে কি! এসব খোঁজখবর নিতে গেলে আমার আবার গুগল ট্রান্সলেট লাগবে। তাই কৌতূহল ব্যাগে পুরে রামনগরের অন্ধকার দেখার জন্যে তৈরি হয়ে বসলাম।

স্টেশন থেকে আমাদের হোটেল ক্লয়েস্টার দশ কিলোমিটার। তার মধ্যে আট কিমি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। আমাদের হোটেল জঙ্গলের কোলে কাঁখে, অন্তঃপুরে নয়। অন্তঃপুরে 45 দিন আগে বুকিং। বুকিং ওপেন হওয়ামাত্র পুজোর রেলের টিকিটের মতো প্রথম পাঁচ মিনিটেই খতম হয়ে যায়। সব অন লাইন। আমাদের কপালে ঐ শিকে ছেঁড়েনি। হাতে 45 দিন সময়ই ছিল না। হোটেলে পৌঁছে, খেয়ে, ঘুম। বারোর গল্প শেষ।

পরেরদিন তেরো হলেও কোনো গেরো ছিল না। বুফেতে ব্রেকফাস্ট। নানান চয়েস ছিল। ভালোই। আজ দুপুরে আড়াইটে থেকে পাঁচটা জিপে জঙ্গল সাফারি। জিপ এখান থেকে তুলতে আসবে দেড়টায়। আপাতত ব্রেকফাস্টের পর গল্পর ব্রেকডান্স শুরু হয়ে গেল সুইমিং পুলে নামবে বলে। সঙ্গে ঘ্যানঘ্যানানি মিউজিক। আমি আগেই হাত ডুবিয়ে পরখ করে নিয়েছি - কনকনে ঠাণ্ডা  জল, পরিস্কার, জল সমানে বদল হচ্ছে, ফলে রোদ পড়ে গরম হবার চান্সই নেই। ঝিনুক তিতিবিরক্ত হয়ে তাকে জলে নামার সাজসরঞ্জাম দিয়ে আমাকে বলল তুমি ওকে নিয়ে নামো, ঠাণ্ডা লেগে গেলে আন্টিবায়োটিক এক কোর্স। এখানে পাওয়া যাবে। আমি প্রবল অস্বীকার করলুম। তখন বিনয় ওকে নিয়ে সুইমিং পুলে গেল।ঠিক হল ও ডুবলে তোলা ছাড়া বিনয় নামবে না। একটু পরে আমিও গুটিগুটি হাজির হলুম। যে ছেলে রোজ চান করার সময় ঠাণ্ডা জল নিয়ে ঝঞ্ঝাট করে সে দেখি ঐ কনকনে জলে লাফঝাঁপ করে আমাকে আবার ডাকাডাকি করছে। একটু পরে দেখি ওর বাবাও নেমে পড়ছে। আমারও লোভ হল। আবার ঘরে চেঞ্জ করে এসে ইঞ্চি বাই ইঞ্চি করে জলে নামতে লাগলুম। তারপর একবার চোখকান বুজে জয় কালী কলকত্তাওয়ালী বলে ঝপাং করে একটা ডুব। ঠাণ্ডাটা এবার আস্তে আস্তে হজম হতে লাগল। একটু পরে দেখি মেয়েও নামছে, দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কাঁপতে কাঁপতে। সাঁতার কাটলে অবিশ্যি গা গরম হয়ে যায়, ঠাণ্ডা কম লাগে। খানিক জলকেলি করে আমিই প্রথম উঠে পড়লুম। নাঃ, ঠাণ্ডা লাগেনি কারুরই। আরাম হচ্ছিল। জল দেখে ঝাঁপানোটা তিন জেনারেশনের জিনগত দোষ।

প্লেন ডাল-ভাতে লাঞ্চ করে দেড়টায় জিপে উঠলুম। খোলা জিপ। সামনে ড্রাইভার আর গাইডের সিটের দুপাশে দুটো দরজা। আর কোনো দরজার বালাই নেই। পেছনে তিন তিন ছ'জনের সিট, দুটো রোতে। জিপের গায়ে, চাকার পাশে, ওপরে পা রাখার জায়গা। সেখানে পা দিয়ে, রড পাকড়ে চড়ো।

জিম করবেট ন্যাশানাল পার্কের পাঁচটা ভাগ, প্রতি ভাগে একটি করে গেট। আমরা আছি বিজরানি গেটের কাছাকাছি। বলে সবচেয়ে ভালো ঢিকালা অংশ। জীবজন্তু বেশি দেখা যায়।  কাল যাবো ঢিকালায়। সব সফরির বুকিং ও পারমিট সংগ্রহ অনলাইনে করতে হয়। প্রতিদিনের ট্যুরিস্ট কোটা আছে। তার বেশি পারমিট দেয় না। বিজরানি গেটে আই কার্ড চেকিং, গোনাগুনতির পর্ব মিটিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ। অসংখ্য হরিণ, সম্বর, শুয়োর, পাখি, হনুমান - এইসব দেখলুম। আর দেখলুম জঙ্গলের মহিমা। সাফারি না নিলে তো আর জঙ্গলের বুকের ধুকপুক শুনতে পেতুম না। তার শব্দ গন্ধ স্বাদ, আলো আঁধার, শালপ্রাংশু সবুজ আর বাজে পোড়া কালো ঢ্যাঙা কঙ্কাল, ঝরা পাতার আলপনা আর পোড়া পাতার ছাই , দু ইঞ্চি মাপের পাখি আর বাহারি প্রজাপতি, ছোটো বড়ো বোল্ডারে ছাওয়া নদীর শুকনো খাত - এ সবের শুলুক সন্ধান কি আর পাওয়া যেত? বাঘ না দেখলে আমার ভ্রমণে কম পড়ে না। চিড়িয়াখানায় বাঘ দেখে নেব। জঙ্গল সাফারি শেষ করে জিপ আবার আট কিলোমিটার জঙ্গল পেরিয়ে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেল। তারপর ফ্রেশ হয়ে, গল্প করে, খেয়ে ঘুম।

4th part

চারের পর্বে চোদ্দোর গদ্য। সকালে তৈরি হয়ে বুফেতে ব্রেকফাস্ট করে সাড়ে দশটায় অটোতে উঠলাম। গন্তব্য রামনগর ডিগ্রি কলেজ। সেখান ক্যান্টার আসবে। তাতে চড়ে আজ ঢিকালা গেট দিয়ে ঢুকে জঙ্গল ভ্রমণ। সাড়ে এগারোটা থেকে সাড়ে পাঁচটা। ক্যান্টার দেখতে বাসের মতো, মাথা ঢাকা, বাকি সবই জানলা, লোহার সরু পাত দিয়ে গাড়ির বডির সঙ্গে সিলিং জোড়া। মিলিটারি অলিভ রং। ভেতরে দুধারে দুটো দুটো সিট। ড্রাইভার ও তার পাশের সিট ধরে মোট আঠেরো।

দাঁড়িয়ে আছি। দেখলাম দূর থেকে দুটো ক্যান্টার আসছে। এসে ঘুরিয়ে রাস্তার ধারে তারা খাড়া হল। একটার নম্বর 9, অন্যটায় নম্বর নেই। আমাদের ক্যান্টরের নম্বর দশ। এজেন্ট দিয়ে বুকিং হয়েছে। সেই এজেন্টও স্কুটারে করে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। 9নং ক্যান্টারের দরজা খুলল, এক দল অপেক্ষমান উঠে গেলেন। আমি দেখেছি অন্য ক্যান্টারের পেছনে দশ লেখা আছে। কিন্তু তার দরজার লকের বাইরের দিকের হাতলটা নেই। অতএব বাইরে থেকে খোলার কোনো উপায় নেই। কত বুদ্ধি মালিকের! দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ইতিমধ্যে নানান সাইজের মহিলা পুরুষ মিলিয়ে একদল বাঙালি এসে বীরদর্পে ক্যান্টারের দরজার দিক ঘিরে, আমাদের কোনো পাত্তা না দিয়ে দাঁড়িয়ে হট্টগোল শুরু করে দিল। ভাবলাম ওদের  হৈচৈতে যদি দরজাটা খুলে দেন ড্রাইভার। তারপরেই মনে হল এই দল উঠলে কোনো ধারের সিটই আর আমাদের জুটবে না। তবে ক্যাঁচরম্যাচরে থতমত খাওয়া তো দূরের কথা, হৃষ্টপুষ্ট ড্রাইভার সায়েব তাঁর পাশের নিজস্ব দরজা দিয়ে নেমে ফোন কানে দিয়ে উচ্চকণ্ঠে বাক্যালাপ করতে করতে অত্যন্ত ব্যস্ততা দেখিয়ে সামনে থেকে চলেই গেলেন। এজেন্ট বেচারা মুখে অচল স্কুটারের সিটে বসে। আমরা হট্টগোলদের সূচ্যগ্র দূরের কথা, পুরো মেদিনী ছেড়ে দিয়ে একপাশে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি, বাঘের মুখোমুখি হবার যথেষ্ট ট্রেনিং আমাদের হয়নি, আর ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে আরও গুটিয়ে যাচ্ছি। একটু পরে ড্রাইভার ফিরে এলেন। কান থেকে ফোন না নামিয়েই হট্টগোলদের বললেন - আপকা ক্যান্টর আ গয়া, উস তরফ খাড়া হোগা। শুনেই দলবল সেই দিকে ছুটল। ড্রাইভার ফোন পকেটে ঢুকিয়ে নিজস্ব দরজা দিয়ে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা খুললেন। এজেন্ট এসে সামনে দাঁড়ালেন। আমাদের উঠতে বললেন। উঠে আমি ড্রাইভারকে জিগেস করলাম তাঁর পাশের সিটে বসা যাবে? প্রথমে বললেন - গেট থেকে বসিয়ে নেব। তারপর বললেন, আচ্ছা বসে যাও। এ তো সব পেয়েছির খুশি! ইঞ্জিনের খাঁচা ইঞ্জিন সব ডিঙিয়ে ডাঙিয়ে সম্রাজ্ঞীর মসনদে ধপ্পাস করে বসে পড়লাম। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখি সেই হট্টপার্টি বিপুল বিক্রমে ছুটে আসছে আমাদের ক্যান্টরের দিকে। মানে ওদের এখনও কিছু আসেনি। আমি ভাবছি, এবার ওরা উঠবে। আমাদের তো বসা হয়ে গেছে। দুজনের সিট ভরেই বসেছি আমরা। সব কটা জানলার ধার দখল করিনি। উঠুক এবার। ও মা, কোথায় কি! ড্রাইভার স্টার্ট দিয়ে ওরা পৌঁছনোর আগেই হুস করে বেরিয়ে গেলেন। কি চুক্কি!

রাস্তায় দুজায়গা থেকে আরও লোকজন উঠলেন। তারপর গেট থেকেও কজন। সিট ভরেই গেল।

এরপর গেট। সেখানে অনেক পেপার ওয়ার্কস থাকে,ফলে দেরি হয়। গেট থেকেও ২/৩ জন উঠলেন। ঠিক তার আগেই যারা উঠেছিল ড্রাইভার বোধহয় তাদের সিট একটু অদলবদল করতে বলেছিলেন। ব্যাস। এঁরাও বাঘের মুখোমুখি হবার জন্যে ফুললি ট্রেন্ড, বাঙালি, ইউটিউব ইউথ। একটু আগে গেটের গায়ে আঁকা বাঘের গায়ে হেলান দিয়ে লেকচার দিতে দিতে ভিডিও করছিল। শুনছি পেছনে তাদের একটি ছেলে বলছে ছেড়ে দে না, এখন ঝামেলা করলে দেরি হয়ে যাবে সবার। মহিলা কণ্ঠ গর্জে উঠছে - হোক দেরি। আমরা কি রোজ রোজ আসব? .... একেবারে এলএলএইচ (লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্তান) মেজাজ! এবার ড্রাইভার, সঙ্গে গাইড - খানিক বাদানুবাদের পর আগের অদলবদলে রদবদল করে শ্বেতপতাকা উত্তোলন করতঃ ক্যান্টর স্টার্ট নিল। আমি ড্রাইভার ও গাইডকে চকলেট অফার করলাম। গাইড রিফিউজ করলেন, ড্রাইভার নিলেন। বেচারিকে তো দুদুটো যুদ্ধ সামলাতে হয়েছে!

জঙ্গলের এই ঢিকালা অংশে রামগঙ্গা নদী। কোথাও ভরা জলে স্রোতস্বিনী, কোথাও শুকনো প্রশস্ত নদীখাত। অসংখ্য বোল্ডারের ফাঁক দিয়ে শীর্ণ দু একটি ধারা বয়ে চলেছে মাত্র। সেখানেই জীবজন্তু জল খেতে আসে। বোল্ডারের রং মূলত সাদাটে, তবে অন্য রংও আছে। এইরকম জায়গাতেই কুমীর আর হাতি দেখলাম। নানান রকম পাখি। সাইবেরিয়ান স্টর্কও ছিল। এছাড়া হরিণ, সম্বর, হনুমান, শুয়োর, ময়ূর তো আছেই। গাড়ির রাস্তার পাশের সরু পথে একটা বাঘ এপাশ থেকে ওপাশে চলে গেল। আমার মনে হল কি যেন একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেল! অন্তত অনেকে স্পষ্ট দেখেছে - বাঘ! আমি দেখে থাকলেও বা অংশ মিস করে গেছি, ঘ-টা হয়ত দেখেছি।

অনেকটা ভেতরে রামগঙ্গার ওপর একটা বাংলো  ঘিরে রেস্টুরেন্ট, টয়লেট আছে। সেখানে লাঞ্চ, স্ন্যাকস পাওয়া যায়। আমাদের সঙ্গে একটুআধটু খাবার ছিল। আমরা ওখানে ঢুকিনি। নদী এখানে ভরভরন্ত। তারই কাছে বসে দাঁড়িয়ে খেয়ে নিলাম। তারপর আবার ক্যান্টার। এবারে ড্রাইভার আমাকে জিগেস করলেন - বাদাম কেয়া হোতা হ্যায়? ও গানা হ্যায় না - বাদাম বাদাম? মুংফলি। আরও বললাম - কচ্চা মুংফলি। তিনি আরও ইনফরমেশন আশা করছিলেন খাস বাঙালির কাছে। কিন্তু হায় আমার পকেটে এর চেয়ে বেশি কিছু নেই।

ফেরার পথে আমরা বাজারের ওপর নেমে পড়লাম। সকলেরই খিদে পাচ্ছিল। স্ট্রিট ফুড ছিল। মোমো, ফুচকা, আলু টিক্কি ইত্যাদি। পরপর দোকান দিয়ে বসে। একজনের কাছে তার মোমোর খোঁজ করতে সে অত্যন্ত আশ্বাস দিয়ে বলল পিওর ভেজ মোমো, ননভেজ ঐ পাশের লোকের কাছে। আমরা তৎক্ষণাৎ পাশের লোকের কাছে। পেটপুরে মোমো আর আলুটিক্কি খেলাম। অবিশ্বাস্য দামে - মোমো প্লেট 40/-, আটপিস করে, সাদা-লাল শসসহ! আর আলুটিক্কি 25/- প্লেট, দুটো করে। সস্তা, সুস্বাদু। তারপর আরেকটা রাস্তার ওপরের দোকানে বসে চা। সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করে দিল। দোকানটা আদতে এক্সটেনডেড মুদির দোকান। তারই সামনেটাতে একপাশে তার বৌ চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে বসে। সকালে যে অটোতে বেরিয়ে ছিলাম তাকে ফোন করে আনিয়ে আবার জঙ্গল পেরিয়ে হোটেলে প্রত্যাবর্তন।

5th part

পঞ্চম পর্ব নেহাৎই প্যাঁচহীন। পনেরো তারিখ সকাল সকাল চান ব্রেকফাস্ট সেরে, বাকি গোছগাছ শেষ করে ব্যাগপত্তর নিয়ে গাড়িতে চড়া। রামনগর থেকে নৈনিতালের দূরত্ব 67 কিলোমিটার। প্রথম আট কিলোমিটার রোজের চেনা জঙ্গুলে পথ। সে পথে অসংখ্য বানর আর ক্বচিৎ কখনও হরিণ। তার পর হাইওয়ে। তবে ফিকে বা ঘন এবং দূরে বা কাছে জঙ্গলের উপস্থিতি অনিবার্য। কাল রাতে ডালের চেয়ে একটু বড় মাপের এক রকম দানার তরকারি খেয়েছি। ভালো লেগেছে, বিশেষত বিনয়ের খুব ভালো লেগেছে। লোকাল প্রডাক্ট বিন - নাম ভট্টার। পথে সেটা কিনতে হবে। ড্রাইভারকে বলা আছে। গাড়ি হাইওয়ে ছেড়ে ঘাটের পথ ধরল। একটু যেতেই খাদের ধারে এক চিলতে তেকোনা চাতালে একটা ওপেন দোকান পড়ল। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে গলা বাড়িয়ে জিগেস করল ভট্টার আছে কিনা। সদর্থক উত্তর পেয়ে নান্দিক আর আমি নামলুম। দুরকম দামের দুরকম ভট্টার। একটা পিষে রান্না, অন্যটা ভুনে মানে রোস্ট করে রান্না। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি কাল রাতে শোনা পদ্ধতির সঙ্গে মিলে গেল। অতএব ঐটা এক কিলো। কত রকম আলু রয়েছে -ছোটো গুঁড়ি, লালচে, বড়ো অলিভ রঙের। আমাদের গাঁঠি কচুর মত দেখতে, কিন্তু হৃষ্টপুষ্ট লম্বায় প্রায় বারো ইঞ্চি - কি সবজি কে জানে। বড়ো বড়ো বিট শাক সমেত, আর ইঞ্চি পাঁচেক লম্বা টাটকা মটরশুঁটি। আমি দুটো নিয়ে দোকানদারকে দেখাতে নেবার অনুমতি মিলল। গাড়িতে উঠে একটা বিনয়কে দিলাম, অন্যটা আমি। খেতেও খুব মিষ্টি আর কচি।

ঘাটের পথ সব সময়েই অভিনব।পরতে পরতে তার সৌন্দর্য খোলে। পাহাড় আর খাদ সমানে দিক বদল করে। যত ওপরে ওঠা যায় তত মনে হয় নিচের গাছগুলো সার বেঁধে লাইন করে সৈনিকদের মতো দাঁড়িয়ে। দূরে পাহাড়ের গায়ে খাপছাড়া বসতির চিহ্ণ। আর রাস্তার ধারে ধারে বুনো ফুলের রঙের বাহার। পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়ি নামছে। আজকাল ঘাটের পথেও ওভারটেকিংএর চল। শেষ অবধি এসে পৌঁছলুম নৈনিতালের হোটেল হিমালয়ে। মেয়ের ঘর পছন্দ হচ্ছিল না। ছবি দেখে অনলাইনে বুকিং করেছে। তার সঙ্গে অমিল। সেই ছবি বের করে, মিলিয়ে দুইখান ঘর বের করে সেখানে ঢোকা হল। ঘরের সামনেটা পুরো কাঁচের জানলা। সেখান থেকে লেকের দৃশ্য। আর নিচে মিস্ত্রির কাজ চলছে পুরো দমে - সে দৃশ্যও। সামনে পিক সিজন - তারই প্রস্তুতি। বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে বড় হোটেল, সবকটা ঘর টিপটপ নয়। লকডাউনের কামড়ের চিহ্ন  ফুটে রয়েছে। এই বিখ্যাত শৈলাবাস যে সেই সব দুর্দিন কাটিয়ে আবার ছন্দে ফিরছে, ফিরতে পারছে সেটাই তো জীবনের আশ্বাস!

আমাদের হোটেল বাসস্ট্যান্ডের পাশে। তার চেয়ে দু'পা এগিয়ে বাঁদিকে মলরোডের শুরু। বাস স্ট্যান্ড থেকে চড়াই ভেঙে হোটেলের দরজা। সেটা গাড়ির রাস্তাও। কিন্তু হলে কি হবে! কোনো ট্যুর না নিলে গাড়ি সঙ্গে থাকবে কেন! দূরত্ব তো সামান্য। মল রোড তো সমতল রাস্তা, উঁচু নিচু নেই। এই দু'পা রাস্তাই হাঁটুর কাছে দুশো হয়ে যাচ্ছে! ওদের তো বয়স হয়েছে। আমি নামা বা ওঠার সময় দশ পা করে যাচ্ছি আর একটু দাঁড়াচ্ছি। সোমনাথের হাঁটুর বয়স বাড়েনি বটে, কিন্তু দমে কুলোয় না। ও এসে অবধি আর বেরোয়নি। আমরা লাঞ্চ করে বেরিয়ে প্রথমে একঘন্টা প্যাডেল বোটে লেকের বুকে অনেকটা চক্কর কাটলুম। বোটে সব দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া - বিনয় আর নান্দিক প্যাডেলিং, আমি আর ঝিনুক চোখের কাজ - আশপাশ দেখা, ঘড়ির খেয়াল রাখা, আর ছোটোটা নাকি স্টিয়ারিংএ, পাপা আর মামাকে কন্ট্রোল করছে। গুরুদায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। কী আরাম! বোটরাইডের পর মলরোডে হাঁটা, একটু শপিং আর লেকসাইড কাফে। লেকের দিকে মুখ করে লম্বা লম্বা তেঠ্যাঙা টুলে পাশাপাশি বসে সামনের হাই বেঞ্চে কফি, হট চকলেট, লাটো, কোল্ড কফি ইত্যাদি গলাধঃকরণ শেষে আবার হাঁটতে হাঁটতে ফেরা। তারপরে তো আড্ডা ডিনার ঘুম আছেই- তা বলাই বাহুল্য।

ষোলো তারিখ সক্কাল সক্কাল সোমনাথ ঘোষণা করলেন যে তিনি কোথাও বেরোবেন না। অগত্যা ব্রেকফাস্ট করে আমরা গুটি গুটি চললাম - গন্তব্য রোপওয়ে। নিচে থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে রোপওয়ের পাদদেশে। তারপর সিঁড়ি আর rampরোপওয়ে থেকে লেকটা পুরো সুদৃশ্যমান এবং চক্ষুর আরাম, প্রাণের খুশির জোয়ার!

ওপরে বেশ কিছু দোকান, স্যুভেনির, উলেনস, কম্বল, কার্পেট, পান-ভোজন। আরও কয়েক ধাপ ওপরে বায়নোকুলার সম্বলিত ভিউ পয়েন্ট। সেখান থেকে নেমেই আবিষ্কার করলাম জঞ্জাল সংগ্রহের গাড়ি ও গান। এটা একটা দিক। রোপওয়ে থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে গেলেও কিছু দোকান আর খেলা। ব্যাটারি গাড়ি, গো কার্ট, বাম্পার কার, জ়িপ লাইন, রক ক্লাইম্বিং। একটা ডায়নোসরের গুহা। সেখান থেকে মামা-ভাগ্নে ঘুরে এল। ভাগ্নেকে এই প্রথম ভয় পেতে দেখলাম। সে একবার মামার সঙ্গে, একবার পাপার সঙ্গে দুরকম গাড়িতে চড়ল। আর আমি জ়িপ লাইনে চড়ে সাঁ করে এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সরেজমিন তদন্ত সেরে নিলাম।

ফিরতি পথের রোপওয়ে সেরে আশপাশে খানিক শপিং, ওখানেই রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ। তারপর খানিক হাঁটা, দোকান দেখা। তারপর একটা সাইকেল রিক্সা করে গল্প, নান্দিক আর আমি লটবহর নিয়ে ফিরে এলাম। ওরা আরও খানিক ঘুরে ফিরল।

সাইকেল রিক্সা নিচু, পা অল্প ভাঁজ করে বসতে হয়, একটু নিচু সোফার মতো। মলরোডের শেষ প্রান্তে একটা অ্যান্টিক দেখতে পাথর আর কাঠের নির্মাণের অফিস। সেখানে টিকিট কাউন্টার। রিক্সা বা ট্যাক্সি বা শাটল ট্যাক্সিতে চড়ে মলরোড পেরোতে হলে ওখানে লাইন দাও, কাউন্টারে টাকা দাও। কাউন্টারের বাইরেও একজন লোক দাঁড়িয়ে, তার সামনে একটা মাইক। তার কাজ লাইনে পরবর্তী নম্বরের গাড়িকে হাঁক দিয়ে সওয়ারিকে বসিয়ে দেওয়া। গাড়ি আর রিক্সরা সামনেই দাঁড়িয়ে, যেমন আমাদের প্রিপেইড বুথে থাকে। পেমেন্ট মা কিছু সব কাউন্টারেই। আমাদের একটা রিক্সা, আড়াইজন সওয়ারি, ভাড়া সাকুল্যে কুড়ি টাকা মাত্র!

রাতে ডিনার টেবিলে গল্প অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে তার মায়ের কাছে অভিযোগ তুললো - তুমি আমার জন্যে সবসময়ে সেম সেম অর্ডার করো! তার মা হিসেবে করে দেখালো যে একদিন একরকম পাস্তা, অন্যদিন অন্যরকম পাস্তা, একদিন সুপ, একদিন খিচুড়ি ইত্যাদি খাওয়ানো হয়েছে তাকে। ঝাল-মশলা ছাড়া জিনিসপত্র চাই তার। সে সবেতেই সায় দিল। তারপর বলল - সবই তো সেম সেম। এখন আমি অর্ডার করবো।

-কর। কি খাবি?

-ডাল-ভাত।

গল্পর অর্ডার করা মানেই - ডাল-ভাত! এটা কিন্তু সেম সেম নয়!!

6th part

আজ ছিল তালপর্ব। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ট্যুরে বোরোনো হল - লেকট্যুর। সকলে। মানে সোমনাথ ও গেছিলেন। তাল মানে লেক। নৈনিতালকে ছেড়ে আরো হাফডজন তাল। নৈনিতালকে দৃষ্টিতে রেখে যাত্রা শুরু। পুরোটাই ঘাটের রাস্তা। প্রায় ২০+২০, চল্লিশ কিলোমিটার পথ। প্রথমে পড়ল গরুড়তাল। দূর থেকে চলন্ত অবস্থাতেই দেখলাম। এই তালে কেউ নামে না, নামার অনুমতি নেই। দ্বিতীয়টি সাততাল। এটা ছোটোখাটো ট্যুরিস্ট স্পট - বোটিং, কায়াকিং, খাবারের দোকান, লেবুর জল, ফুচকা ইত্যাদি। অনেক দোকানই বন্ধ।

এরপর নলদময়ন্তীতাল - গাড়ি থেকে দেখে মনে হল সুইমিং পুলের সাইজ। শুনলাম কনস্ট্রাকশনের খপ্পরে পড়ে আজ তার এই শীর্ণ দশা!

এর পরেরটি কমলতাল। ছোটো লেক, পদ্ম ফোটে। এখানে নামিনি। নামা হল পাশের নৌকুচিয়াতালে। মোটামুটি বড় লেক। আশপাশে দোকানদানি আছে কিছু। নেমে লেকের ধারের রাস্তা ধরে যাবার সময় দেখি সেই রাস্তার একপাশটা কমলতাল, আর অন্যপাশ নৌকুচিয়াতাল। এখানেও বোটিং, কায়াকিংএর সঙ্গে রয়েছে জ়িপ লাইন - অনেকটা লম্বা, একটা নিচু দিয়ে, অন্যটা উঁচু  দিয়ে। জলের এপার থেকে ওপার। মেয়ে চড়লো তাতে।

এখান থেকে ভীমতাল। ভীমতাল অপেক্ষাকৃত পরিচিত নাম। আমরা পথে ভীমতালের বাঁক পেরিয়েই এসেছি এই শেষ দ্রষ্টব্য নৌকুচিয়াতালে। নামবো ফেরার পথে। রাস্তার ওপর পড়ল এক হনুমান মন্দির। সামনে এক বিশাল হনুমান মূর্তি। ড্রাইভারের কথায় গাড়ি থেকে নামলুম। দেখি প্রায় দোতলা মতো সিঁড়ি দিয়ে নেমে কৃত্রিম সুড়ঙ্গের ভেতরে দিয়ে অনেক দেব-দেবীকে স্যালুট ঠুকতে ঠুকতে সুড়ঙ্গ ভেদ করে অন্য পাশ দিয়ে বেরতে হবে। সুড়ঙ্গ মাঝে মাঝেই ছাদহীন, অতএব ওপর থেকেই দৃশ্যমান। জুতো খোলার ব্যাপার রয়েছে। সুতরাং আমি নেই। তারপর দেখলাম আমাদের কেউই নেই - সিঁড়ি বা জুতোর কারণে। আবার চলা শুরু। যাবার সময়ে দেখেছিলাম একটা ছোট্টো গুমটি, সামনে প্যারাগ্লাইডিংএর বোর্ড লাগানো। ফেরার পথে সবার চোখই সেটা খুঁজছে। পাওয়া গেল! ছেলে আর মেয়ে দুজনেই প্যারাগ্লাইডিং করবে। আমার প্রাণটা হাহুতাশ করছে। আজ স্কার্ট পরে বেরিয়েছি! প্যান্ট ছাড়া হয় না এসব।  হিসেব ভুলের মাশুল দিচ্ছি। আর কি কখনও/সুযোগ আসিবে হেন। করুণ সুরে মনে মনে গাইছি। দোকান বলল আধঘন্টা মাত্র লাগবে। দুজনকে নিয়ে চলে গেল। ডানপাশে পাহাড়ি দিকে খানিক উঠে খানিকটা সমতল জায়গা হল টেক অফ পয়েন্ট। আর বাঁদিকে খাদের দিকে খানিক সমতল জায়গায় ল্যান্ডিং। সেখান থেকে খানিকটা পায়ে পায়ে নামলে বাকিটা ওরা বাইকে করে আমাদের এই অপেক্ষার পয়েন্টে পৌঁছে দেবে। আধঘন্টার অপেক্ষা কার্যত দেড় ঘন্টা হল। টেক অফ পয়েন্ট থেকে মাঝে মাঝেই একটা করে উড়ন্ত বাহারি ছাতা ঘুরেফিরে দুলতে দুলতে ল্যান্ডিংএর দিকে চলে গিয়ে ল্যান্ড করছে। এতই দূর আর উঁচু যে মানুষ চেনা তো দূরের কথা অবয়বটুকুও বোঝা যাচ্ছে না। প্রত্যেকের সঙ্গেই একজন করে পাইলট থাকবেন। আমরা প্রত্যেকটা ছাতা দেখেই ভাবছি এটাই হবে। বিনয় ক্যামেরা নিয়ে রেডি হচ্ছে প্রতিবারই। আমাদের ঘাড়ে ব্যথা। বিনয়কে বললাম - যে কোনো একটার ছবি তুললেই তো হয়ে যায়, বোঝা তো যাচ্ছে না। গল্প ঘ্যানঘ্যান করলেই ওকে বলা হচ্ছে- ঐ দেখ মাম্মাম ঐটা। শেষ অবধি সে বলল যে মাম্মাম এতবার নামছে কিন্তু আসছে না কেন? শেষ অবধি যখন তারা এসে হাজির হল তখন জানা গেল যে ওপরে একাধিক কোম্পানির টেক অফ পয়েন্ট তাই অত গ্লাইডার দেখছিলাম  আমরা। কিন্তু আমাদের কোম্পানির পাইলট মাত্র দুজন। তাই লাইন কম হলেও সময় লাগছিল। পাইলট ল্যান্ড করিয়ে বাইকে করে আবার টেক অফ পয়েন্টে পৌঁছবে তবেই পরের জন উড়বে। হ্যাঁ, পথের ঐ অংশে ঐ বিশাল ছাতার ব্যাগ পিঠে নিয়ে বাইকে দুজন সওয়ারির মুহুর্মুহু গমনাগমন লক্ষনীয় ছিল বটে। এবার ভীমতাল। গল্পকে  খানিকটা কেক আর ফ্রুটজুস খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে তার মেজাজ ঠিক আছে। তিনটে বেজে গেছে। এখন আগে রেস্টুরেন্টে ঢুকে লাঞ্চ। ভীমতালে অজস্র হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হোম স্টে, বড়ো বাজার, শপিং এর বাজার, বোটিং, কিডস গেমস, অ্যাডভেঞ্চার, স্ট্রিট ফুড ছড়ানো। জমজমাট জায়গা। এমনকি লেকের জলের ওপরেও একটা কাফে, আইল্যান্ড কাফে। তবে নৈনিতালের চেয়ে ছোটো জায়গা। গল্প তো লিস্ট করে নিয়েছে লাঞ্চের পরে তার কি কি চাই।  সে তো সব নিজে করে। খাওয়া হলেই নিজে হাত ধুতে ছোটে। জল খুব প্রিয় তার। ফলে প্রায় আধা চান সেরে নেয় প্রতিবার। তাকে আগলে রাখতে হয়। এখানেও লাঞ্চ শেষ হতেই এক ছুট্টে বেসিনে গিয়ে ফুলস্লিভ জ্যাকেটের কোয়াটার ভিজিয়ে চলে এল বীরদর্পে। আমাদের সেটাই হল সুযোগ - জামা ভিজে গেছে, এখুনি বদলাতে হবে, নইলে ঠাণ্ডা লাগবে, কেন ভেজালে - ইত্যাদিতে তাকে পর্যুদস্ত করে, তার লিস্টকে ভেস্তে দিয়ে আমরা পাঁচজন বড়ো শেষ অবধি জয়লাভ করলাম। অতএব তার রাস্তায় গড়াগড়ির দৃশ্য মুলতুবি রেখে, ভীমতালের কাক-চিলেদের শান্তিভঙ্গ নাকরে সবাই গাড়িতে উঠলাম। এবার ফেরা, কোনো থামাথামি নেই। কটা বাঁক ঘুরতেই তিনি সামনের সিটে ঝিনুক আর ড্রাইভারের মাঝখানে ঘুমিয়ে কাদা। স্বপ্নে বোটিংএ ব্যস্ত হয়তো!

7th part

আজ আঠেরো। দেখতে দেখতে বেড়ানোর শেষ চ্যাপ্টার। বেড়ানোটাও  যেন শুরু আর শেষের শহুরে ব্যস্ততার মাঝে পড়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেল! আজ আর তেমন কিছু নেই। আজ বিনয়ের জন্মদিন। সকালে চান-খাওয়া সেরে ঘরের আলমারি থেকে বেরোলো সেই সারপ্রাইজ কেক। জন্মদিনের ইংরিজি, বাংলা, হিন্দি

শুভেচ্ছা জানিয়ে কেক কেটে, খেয়ে, বাকিটা  পোঁটলা করে নিয়ে গাড়িতে ওঠা হল। এখন গন্তব্য কাঠগোদাম। সেখান থেকে বেলা তিনটেয় দিল্লিগামী শতাব্দী। রাত ন'টায় দিল্লি।

আজ সকালের রিপোর্টিংযোগ্য ঘটনা দুটো - দুদিন একটু আধটু শপিং করা হয়েছে এবং তার পুরোটাই শীতবস্ত্র। ওজনে কম, বপুতে বেশি। সেসব ঢুকেছে সুটকেসে। আনা জামাকাপড় যতটা সম্ভব গায়ে চড়িয়েছি, প্রয়োজনের বেশিই। তারপর ডাক ছেড়ে হেঁইয়ো হেঁইয়ো বলে ব্যাগের চেন টেনেছি। আশা করি সেই চেন পথে দাঁত বের করে হাসতে চাইবে না। ছোটোবেলার বেডি বেঁধে বেড়ানোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। বেডিং গুটিয়ে তার ওপর বসে লড়াই - চামড়ার বেল্টের আরেকটা ফুটো এগিয়ে আনার চেষ্টায় প্রাণপাত।

আর দ্বিতীয় ঘটনা হল লটবহর মাথায় বেঁধে পেটের ভেতর আমাদের নিয়ে সেই খাড়া টং থেকে ইনোভার নিচে নামার ঢং! একবার কোনোক্রমে ফসকালে গড়াবে না।  টরেটক্কা টরেটক্কা করে লাফাতে লাফাতে রাস্তায় পড়লে ফুটিফাটা, আর লেকের জলে পড়লে সাবমেরিন!

তবে দুটো অপশনই নস্যাৎ করে সে তার নিজস্ব চলনে ফিরে পথে নামল। আমরা ঘন্টা দেড়েকের মাথায় কাঠগোদাম রেল স্টেশনে পৌঁছলুম। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বড়ো স্টেশন। উঁচু ক্লাস, নিচুক্লাস ওয়েটিং রুম ছাড়াও ঘন্টায় বড়োদের দশ আর ছোটোদের পাঁচটাকা ভাড়া নেওয়া এসি ওয়েটিং রুমও আছে। সেখানেই থিতু হলাম আড়াইটে অবধি। এখানে ফোন চার্জিং, কেক বিস্কুট চকলেট জুস ইত্যাদির কাউন্টার ও বললে ভোজনালয় থেকে খাবার আনিয়ে দেবার সুবিধা উপলব্ধ।

শতাব্দীতে প্রথমে স্ন্যাকস ও চা এবং পরে চিকেনসহ ডিনার দিল। নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে একটা এসইউভি নিয়ে হোটেল। খাওয়াদাওয়ার পর্ব মিটিয়েই এসেছি। অতএব এবার আয় ঘুম আয় রে!

 

আজ ঊনিশ, সময় আটটা বেজে আট। বসে আছি গতিমান এক্সপ্রেসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায়। দিল্লির নিজামুদ্দিন স্টেশনে। ট্রেন ছাড়বে, ব্রেকফাস্ট দেবে। পৌঁছবো আগ্রায়। আজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট মমতাজ মহল আর শাহজাহানের সঙ্গে।

8th & last part

আরজ়ুমন্দ বানু বেগম, জন্ম ১৫৯৩এর ২৭ এপ্রিল, আগ্রায়; মৃত্যু ১৬৩১এর ১৭জুন। মাত্র ৩৮ বছর, কিন্তু চমকপ্রদ জীবন। ১৬১২তে প্রিন্স খুররম-এর সঙ্গে বিয়ে। তিনবছর মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান বেগম।  এই জুটিকে সারা পৃথিবী চেনে শাহজাহান- মুমতাজ মহল নামে। মুমতাজের মৃত্যু হয় ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে, অধিক রক্তক্ষরণের ফলে।  সেই মৃত্যুর অমরত্ব প্রাপ্তি ঘটে তাজমহলের নির্মাণে। তাজমহল - পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য!

 

আমারও বড়োদের মুখে গল্প শুনেছি পূর্ণিমার জ্যোৎস্না প্লাবিত তাজমহলের সৌন্দর্যের। তবে এখন সেসব সৌন্দর্য উপভোগের অবকাশ নেই। বিকেলের পরে বন্ধ হয়ে যায় এই ট্যুরিট স্পট। এছাড়া অল্পস্বল্প বিশেষ ব্যবস্থা আছে কিনা জানা নেই। আমাদের টিকিট অনলাইনে কাটা। কাউকে জিগেস করতেও পারিনি। খুব ভীড়। জেনেও লাভ নেই। সকলের ছুটির তারিখের সঙ্গে এসব মেলানো সম্ভব নয়। এখন শুধু আকাশ আর প্রকৃতিই দেখে সে সৌন্দর্য। পশ্চিম গেটে গাড়ি নামিয়ে বলে দিল বেরিয়ে কোথায় অপেক্ষা করতে হবে। আর সেখান থেকেই শু কভার কেনা হল। ঢোকার লাইনের শেষ দেখা যাচ্ছে না। সে লাইনে অনলাইন অফলাইন সবাই হাজির। আমরা টুক করে মাঝখানে ঢুকে পড়লাম। ছ ছজন! কলকাতা হলে ধুন্ধুমার হয়ে যেত। এখানে কেউই কিছু বলল না। আমি কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। গিল্টি ফিলিংস! তারপর একসময়ে তার মুখোমুখি হলাম - কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল! ভেতরে শ্বেতপাথরের জাফরির আড়ালে দুটি সমাধি। সেখানে ছবি তোলা নিষেধ। তারপর বাইরের প্রশস্ত চাতালে এসে হাঁফ ছাড়লুম। ৩৬° টেম্পারেচার আজ। পাথর গরম নয়। এটাই হল শ্বেতপাথরের গুণ। যেখানে রোদ পড়ছে সেখানে অসহনীয় হলেও ভীড়ের কমতি নেই। আর যেখানে ছায়া সেখানে শুধু ভারতবর্ষ নয়, সারা পৃথিবীই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাথরের ওপর বসে। প্রায় শুকনো যমুনা। আর চারিদিকের নিখুঁত স্থাপত্যে সময় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে!

এরপরের গন্তব্য আগ্রা ফোর্ট। সেই ইতিহাসে পড়া দেওয়ানী আম, দেওয়ানী খাস (বইয়ের ছবিগুলো কি কুচ্ছিতই ছিল), আর খাস চত্বরের জানলা জাফরি দিয়ে দূরের তাজমহল। খাস চত্বরেই  মহলের পর মহল - পরতে পরতে খুলছে। দোতলায় মীনা মসজিদ, তারপরে দেওয়ানী খাস। বিশাল ফোর্ট, অন্তহীন সুরক্ষার ব্যবস্থা। ইতিহাস দেখিয়েছে এত সুরক্ষাও সেদিনের শাসকের পক্ষে যথেষ্ট হয়নি। বর্তমান শাসকও আরও আরও সুরক্ষা খুঁজছে সেন্ট্রাল ভিস্তার দুর্গে! সময় বলবে কত ধানে কত চাল!

এরপর খাওয়া, পাথরের দোকান দেখা  আর পেঠা কেনা সেরে স্টেশনে প্রত্যাবর্তন। কাল কুড়ি, রাত আটটায় ফ্লাইট। সারাদিন দিল্লিতে বেরোনোর কোনো প্ল্যান নেই। বিশ্রাম নিয়ে পরশুর কাজের দিনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি! ছক বাঁধা যাপনের ছকে পাক খাওয়া!

**********

No comments:

Post a Comment