Tuesday, July 8, 2025

কেওনঝড় জুলাই ৫, ২০২৬ (১ম ও শেষপর্ব)

 জুলাই ৫, ২০২৫ (১)











আজ আমাদের ফেরার দিন। বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে ফিরব জাজপুর স্টেশন থেকে। তার আগে পথে দেখব সীতাবিঞ্জি আর পাহাড়ের গায়ে ফ্রেস্কো। ব্রেকফাস্ট সেরে, বিল মিটিয়ে ঘরেই বসে আছি। আজ ছিল লুচি, আলুকুমড়োর তরকারি আর চিঁড়ের পোলাও। 

গাড়ি এলেই বেরিয়ে পড়ব।  গাড়ির দেরি হচ্ছে। ফোন করতে জানা গেল আজ অন্য গাড়ি, অন্য ড্রাইভার আসবে। গত দুদিনের গাড়ি বিয়েবাড়িতে গিয়ে ফিরতে পারেনি। পান্থনিবাসের একটি সুগন্ধী ডবল টগরের ও খুদি খুদি ফুলের বোগেনভেলিয়ার গাছ খুব পছন্দ হয়েছিল আমাদের তিনজনেরই। আহা যদি কটা ডাল পাওয়া যেত! এই বর্ষায় হয়ত লেগেও যেত। সকালে একজন স্টাফকে সে কথা বলেছিলামও, মানে আবেদন। আমরা তখনও ঘর থেকে নামিনি। সেই কর্মী আমাদের দরজায় নক করে, আমাদের ব্যাগগুলো সব নামিয়ে দিয়ে, কোথায় হাওয়া হয়ে গেলেন। তারপর দেখি একটা ঠিকঠাক কাটার দিয়ে ঠিকঠাক ডাল খুঁজে কেটে আমাদের দিলেন। মধুমিতার ভাঁড়ারে বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক বিনব্যাগ ছিল, ওগুলো ওর ক্যামেরার ব্যাগের বর্ষাতি। তারই তিনখানা ও বার করল তিনজনের জন্যে। ততক্ষণে গাড়িও হাজির। সবাইয়ের কাছে বিদায় নিয়ে পোঁটলা পুঁটলি বৃক্ষশাখাসম্পদ আগলে গাড়িতে অধিষ্ঠিত হতে গাড়িও যাত্রা শুরু করল, সঙ্গে বৃষ্টিও তার রেগুলেটর ফুলস্পিড করে দিল।

সীতাবিঞ্জির পথে যাচ্ছি এন এইচ ২০ ধরে। রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডারে বাহারি কলকে আর করবীর ঝোপ। কলকে হলুদ, সাদা আর হলুদ ফুলের অন্দরমহলে কমলা ছোপ। করবী তাজা গোলাপী, সাদা, লাল আর লাল-গোলাপীর মাঝের একটা শেড। কত রঙের! খুব লোভ হচ্ছে। বৃষ্টি পুরো এনার্জি নিয়ে নেচে চলেছে। একটা সময় সব কিছুর সমাপতন ঘটল - বৃষ্টি প্রায় নেই, ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার জন্যে নেমে গেল। আর ডানদিকের ডিভাইডারে তখন কলকের তিনটে রং-ই হাতছানি দিচ্ছে। আমিও চট করে নেমে পড়লাম। তিনটে গাছের তিনটে ডাল ভেঙে নিয়ে, ডিকি খুলিয়ে তুলে দিয়ে আবার ছুট। 

লোকমুখে সীতাবিঞ্জি লব-কুশের জন্মস্থান, যদিও ওখানকার গেরুয়াধারীরা বাল্মীকি আশ্রমের খোঁজ জানেন না। পাহাড়ের গায়ে চওড়া বাঁধানো টাইলসের সিঁড়ি। বর্ষায় পিছলে যাবার সম্ভাবনা। ৪০/৫০ ধাপ ওপরে পাহাড়ের কয়েকটা বিশাল বোল্ডারের খাঁজই মন্দির - সীতামাই- দুপাশে লব ও কুশ। পৌঁছনোর বারান্দা টাইলস বাঁধানো, পাশে রেলিং। সেই রেলিং, আশপাশের গাছের ডাল ও গুঁড়ি, এমনকি কোথাও কোথাও দড়ি বেঁধে তাতে অজস্র জরি-বর্ডারের লাল কাপড় বাঁধা - আকাঙ্ক্ষা পূরণের মানত। গাছের নিচে, পাথরের খাঁজে, চাতালে অসংখ্য মাটির ঘোড়া - আকাঙ্ক্ষা পুরণ হওয়ার নিবেদন হয়তো। সিলিং তৈরি করা বোল্ডারের নিচের পিঠ, আকাশমুখী ওপর পিঠ, পাহাড়ের বুকের জঙ্গল দেখে যখন নামছি তখন আটকে দিল বৃষ্টি। ওই বোল্ডারের আশ্রয়ে ৪৫ মিনিট দাঁড়িয়ে। বৃষ্টি কমছে না। পায়ের নিচে দিয়ে জলের ধারা বইছে। অগত্যা তার মধ্যেই ছাতা রেইনকোট নিয়ে পা টিপে টিপে নামা শুরু। জুতো নিচেই খুলে রেখে ওপরে উঠেছিলাম। মধুর আর আমার পাদুকা রাবার জাতীয় জিনিসের। সর্বাণীর স্নিকার্স - ততক্ষণে তারা রস টুসটুসে চমচম! চালক গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়েই পড়েছে। তাকে তুলে, গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা শুরু। এবার ফ্রেসকো। আসার সময়ে কাছেই একটা রেলিং ঘেরা জায়গার পাশে ফ্রেসকো লেখা বোর্ড দেখেছিলাম। সেখানে ঢুকলাম। বৃষ্টির ক্ষান্তি নেই। মধু বলল ও নেমে আগে দেখবে ফ্রেসকো কোথায়। তারপর আমরা নামব। সামনেই একটা উঁচু মনোলিথিক স্টোন, আশেপাশে ছোটোখাটো কয়েকটি। এগুলো তো রোদ-বৃষ্টিতে উন্মুক্ত। এখানে ফ্রেসকো হবে না। দুজন মহিলা ছাগল চরাতে চরাতে এর আড়ালে দাঁড়িয়ে। তাদের জিগেস করতে বলল এই রাস্তায় একটু এগিয়ে 'চিত্র' আছে।  এই জায়গাটা রাজার লুকোনো রত্নভাণ্ডার ছিল। এখানে চিত্র নেই। একটু এগিয়ে-কে আমরা ভুল বুঝলাম ফেরার রাস্তায় একটু এগিয়ে বলে। তাই ওই ফ্রেসকো লেখা সীমা থেকে বেরিয়ে এলাম। আরেকজন মহিলাকে দেখে আবার জিগেস করে বুঝতে পারলাম যে ওই ফ্রেসকো সীমানার ভেতরেই ওই মনোলিথিক পাথরটা ছাড়িয়ে মাটির রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে। আবার গাড়ি ঘোরাও। একটু এগিয়ে দেখি ডানদিকের বিশাল বোল্ডারের গায়ে খানিকটা রেলিং দেওয়া পাথরের ধাপ। মধু আর আমি ছাতা মাথায় এগোলাম। ওই বোল্ডারের পেছনদিকে আরেকটি বোল্ডার মাথার ওপর একটু ছাদের আড়াল দিয়েছে, তার গায়ে কয়েকটি লোহার খাম্বার সাপোর্ট।‌ সেখানে দুজন মহিলা আশ্রয় নিয়েছে, সঙ্গে তাদের ছাগল বাহিনী। তাদের সামনে ছাদের বোল্ডারে ওঠার একটা লোহার সিঁড়ি। সে সিঁড়ি মজবুত, কিন্তু তার উঁচু উঁচু ধাপের পা রাখার জায়গায় ফাঁক ফাঁক লোহার পাত আর ধাপের ঢাল ভেতর দিকে। সিঁড়ি, বৃষ্টি, ছাতা, ক্যামেরা সব সামলে ওপরে উঠে দেখি সিলিং -এ, সেও আরেকটি বোল্ডার, ফ্রেসকোর ধ্বংসাবশেষ - রং আর বেরং মিলিয়ে দুটি ঘোড়া আর কয়েকটি মানুষের উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছে মাত্র। রক্ষণাবেক্ষণের বড়োই অভাব। ছবি তুলে আবার কসরৎসহ নিচে নেমে ভিজে গুটিসুটি ছাগল বাহিনীর ছবি তোলা হল। একজন মহিলা আলাপী - কোথা থেকে এসেছি, ছবি দেখাও, আমাদের কিছু দেবে না গো... ইত্যাদি। সে সব মিটিয়ে এবার সোজা জাজপুরের দিকে।

পথে আবার সেই গোলাপী করবীর হাতছানি। এবার সর্বাণীর আগ্রহটা বেশি। বৃষ্টি একটু কমতে তারও একটা ডাল সংগ্রহ করা হল। জাজপুর স্টেশনের কাছাকাছি বড়ো গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ। তখন একটু ঘুরপথে জাজপুর পৌঁছলাম আমরা। ট্রেন আসবে ২ নং প্ল্যাটফর্মে। ৪টে নাগাদ আসার কথা, বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। লিফট ও ওভারব্রিজ দিয়ে আবার সেই আপার ক্লাস লেডিজ ওয়েটিং রুমে। ওয়েটিং রুমের দরজা ভেজিয়ে হুড়কোটা সামান্য টানা। আশপাশে নাম লেখার খাতা বা লোক কেউ নেই। তবে সেটা কোনো বাধাই নয়। তিন তারিখ ভোর রাতে আমাদের নাম তো লেখা হয়েইছিল। অতএব প্রবল অধিকার বোধে দরজা খুলে ঢুকে পড়লাম। 






জুলাই ৫, ২০২৫ (ঘরে ফেরার পর্ব)

জাজপুর স্টেশনে গরম খাবারের ব্যবস্থা নেই। আগে ছিল, করোনা কাল থেকে বন্ধ। আবার স্টেশনের বাইরে যাবারও ইচ্ছে নেই। তাই প্যাটিস, কফি, লস্যি দিয়ে লাঞ্চের কাজ চালানো হল। ট্রেনের রাইট টাইম চারটেয়। স্টেশনে কোনো ডিজিটাল বোর্ড নেই, শুধু প্ল্যাটফর্মের ওপর ট্রেনের নাম, নম্বর ও কম্পার্টমেন্টের নম্বর দেখানো ঝোলা বোর্ডগুলো ছাড়া। আমি আর মধুমিতা খুঁজতে বেরোলাম কোথায় আমাদের ট্রেনের রিয়েল টাইম খবর পাওয়া যাবে। একটা ক্রু রেস্টরুমের জানলা দিয়ে জিগেস করতে একজন ফোনে দেখে বললেন ট্রেন রিশিডিউল হয়েছে, উল্টোরথের কারণে। ট্রেন তো আসছে পুরী থেকে। মধুমিতার গুগল বলছে ৫৮ মিনিট লেট। একটু পরেই ঘোষণা হল বন্দে ভারত রিশিডিউল হয়ে ১ঘণ্টা ৫৬ মিনিট দেরিতে আসবে।‌ মানে হাওড়ায় সাড়ে আটটার অ্যারাইভাল সাড়ে দশটার আগে তো নয়ই। আজকাল রাতে হাওড়া স্টেশনে লাগাম-ছাড়া-দর-হাঁকা ট্যাক্সি ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। যাত্রী সাথী অ্যাপের পর থেকে ট্যাক্সিকে ট্যাক্সি-বে-তে ঢোকানোর জন্যে রাতে পুলিশ থাকে না। দিনের খবর জানি না। নতুন প্ল্যাটফর্ম কমপ্লেক্স থেকে বাসস্ট্যান্ড অনেক দূর। পিঠে হাতে ব্যাগ রয়েছে। আমার গাড়ি আসার কথা। এমতাবস্থায় মধুমিতা ও সর্বাণীকে বললাম রাতে আমাদের বাড়িতে থেকে যেতে, বাড়িতে বলে দিতে। দুজনেই রাজি হল। আমিও বাড়িতে জানিয়ে দিলাম। এবার নিশ্চিন্ত। সর্বাণী প্রস্তাব দিল লুডো খেলার। ওয়েটিং রুমে টেবিল বা টেনে নিয়ে মুখোমুখি বসার চেয়ার নেই। সব ভারি সোফা। আমি বললাম ওয়েটিং রুমের সামনেই প্ল্যাটফর্মে লোহার পিলার ঘিরে যে কালো পাথরের বসার জায়গা সেখানে গুছিয়ে পা তুলে বসে খেলব, উত্তর কলকাতার ফুটপাতে যে রকম তাস খেলা চলে, সেইরকম। পাব্লিক দাঁড়িয়ে গেলে বা দেখলে বা চাল দিতে সাহায্য করলেও কোনো অসুবিধে নেই। ওয়েটিং রুমে ততক্ষণে আরও ২/৩ জন এসে গেছেন। তাঁরাও আছেন। আর আমরা তো দরজার মুখোমুখি বসব। ব্যাগ নিয়ে অত দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।

বোর্ড পেতে লুডো খেলা শুরু হল। কেউ দাঁড়িয়ে গেল না, তবে আসতে যেতে সবারই নজর কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আমাদের দিকে। এমনকি ট্রেন থামলে ট্রেনের জানলা আর দরজার লোকজনও দেখছে। স্টেশনের এই লোহার পিলারগুলো দুপাশে রেল, মাঝখানটা ফাঁকা। পিলার ঘেরা এই চৌকো জায়গাটায় পিলারের একদিকে আমরা, অন্যদিকে এক ভদ্রলোক ঘুমোচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে পরিবারের লোকজনও আছে। লুডোর ছক্কার খটখট শব্দে তাঁর ঘুম ভাঙলো, তিনি আমাদের দিকে পাশ ফিরে প্রথমে কনুইয়ের ভরে আধশোয়া হয়ে পিলারের ফাঁক দিয়ে অবজার্ভ করতে লাগলেন। একটু পরে উঠে বসে পিলারের ফাঁকে মুণ্ডু প্রায় গলিয়ে পরিচালনা করতে লাগলেন। চালে গুনতে ভুল হলে, কার চাল তা ভুলে গেলে, পরপর কয়েকটি চাল পেয়ে মোটের হিসেবে ভুল করলে .... প্রভূত সাহায্য আসতে লাগল। কোন রং জিতবে তারও প্রেডিকশন হতে থাকল। মোট কথা, দারুণ জমে উঠল - কেউ কারুর ভাষা না বুঝলেও। আমি আবার একজনকে ছবি তুলে দিতে বললাম। এসব করতে করতে জানা গেল সাড়ে ছটার পরে ট্রেন ঢুকবে। আমাদের ওয়েটিং রুমের সহযাত্রীরা বলে গেলেন যে আমরা যেন আমাদের ব্যাগগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করি, ওঁরা এবার প্ল্যাটফর্মে যাচ্ছেন। আমরা এশিয়াডের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বলে ওনারা স্বেচ্ছায় আমাদের ব্যাগের‌ দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিলেন। এরপর সব গুটিয়ে গুছিয়ে ট্রেনে ওঠা। আমি উঠেই খোঁজ করলাম আমাদের ডিনার দেওয়া হবে কিনা।‌ অ্যাডেনডেন্ট বললেন - এখন বিকেলের স্ন্যাক্স দেওয়া হবে, আর ডিনারে খিচুড়ি। যাক বাবা, নিশ্চিন্ত, বাড়িতে কিছু আয়োজন করতে বলতে হবে না। এবার শুধু তিনটে কাজ - খাও, ঘুমোও আর পরের ট্রিপের প্ল্যান করো।

পুনশ্চ: রাত সাড়ে এগারোটায় ট্রেন হাওড়া পৌঁছেছিল।

কেওনঝড় জুলাই ৪, ২০২৬ (১, ২, ৩, ৪, ৫)

জুলাই ৪, ২০২৬ (১)



আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেরাই একটু চা তৈরি করে খেয়ে নিলাম, সঙ্গের কেক সহযোগে। তারপর এল বেডটি। সেটিও গলাধঃকরণ করে পান্থনিবাসের ছাদে গিয়ে তিনজনে মিলে হাত-পা-কোমর দুলিয়ে ছুঁড়ে টানটান করে নেওয়া হল। ঝর্ণাদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্যে এদের প্রচুর খাটাখাটনি হচ্ছে, তাই একটু ওয়ার্ম আপ। তারপর একটা ব্যালকনিতে গিয়ে খানিক বসা হল। এরপর চান করে তৈরি হওয়া ও ব্রেকফাস্ট করা। গাড়ি আসবে সকাল ৯টায়। 

এবার একটু খাবারদাবারের খবর দি। কাল দুপুরে পান্থনিবাসে লাঞ্চ করেছি - ভাত, মুসুর ডাল, আলু পটল ভাজা, মাছের ঝাল, আমের চাটনি। মাছ টাটকা, খাবার ভালো। রাতে রুটি আর মুরগির মাংস কষা। আজ সকালের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। ছিল উপমা, লুচি, আলুর তরকারি আর চা। আজ দুপুরে হালকা লাঞ্চ পথেই - ডবল ডিমের রোল। রাতে চাইনিজ খাওয়া হবে পান্থনিবাসেই। আর কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়া। 


সে এক সিঁড়িভাঙা দিন

জুলাই ৪, ২০২৫ (২)

গাড়ির চাকা গড়ালো। আজ প্রথম গন্তব্য খণ্ডধার জলপ্রপাত, ৫৬ কিমি। নিকটতম পয়েন্টে গাড়ি রেখে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম খণ্ডধারের দিকে। গুগলে দেখেছি এটি কোরাপানি নালার জলপ্রপাত, বৈশিষ্ট্যে অনেকটা উঁচু, ৫০০ ফিট। আজ আকাশ বড় অনিশ্চিত - ঝিরঝিরে বৃষ্টি প্রায় লেগেই আছে। মধুমিতা আর সর্বাণী নিয়েছে ছাতা, আমি রেইনপোঞ্চ। তবে আমাদের থেকেও প্রোটেকশন বেশি দরকার মধুর ক্যামেরার। তাই ওকে বললাম রেইনপোঞ্চটা পরে ক্যামেরাটা তার ভেতরে নিয়ে নিতে। রাজি হল। ওর ছাতাটা নিলাম আমি। দূর থেকে দেখলাম ছোটোখাটো ধাপের চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পাহাড়ের বুকে। মোট ১৭৫টি ধাপ। দুপাশে গাছের ডালের মতো বাহারি কংক্রিটের রেলিং, মাঝে মাঝে  কংক্রিটের বসার জায়গা। দুপাশে বর্ষার ঘন জঙ্গল। গাছ থেকে টুপটাপ জল পড়েই যাচ্ছে। নয়তো আকাশ থেকে বৃষ্টি। আশপাশ পাহাড়ের ঢেউ দিয়ে ঘেরা, পাহাড়ের ওপরের লেভেলটা মেঘে ঢাকা। বেশ দূর থেকেই চোখে পড়ল অনেক উঁচু থেকে নিচে ঝাঁপ দেওয়া জলের প্রপাত। ওপরে উঠতে তা যখন চোখের সামনে এল তখন তার ছড়িয়ে পড়া জলকণায় আমরা নাস্তানাবুদ। অনেক উঁচু থেকে একটিই প্রচণ্ড ধারায় তীব্র গতিতে জল যেন চোখকান বুজে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। পড়তে পড়তে তার আবার হাওয়ার সঙ্গে খুনসুটি চলছে - হাওয়ার টানে জলের শরীরে আলপনা দেওয়া চলছে। দেখে মনে হচ্ছে জলপরীর সাদা ওড়নায় হাওয়ায় ঢেউ উঠেছে।‌ নিরাপদ দূরত্ব থেকে ক্যামেরা বাঁচিয়ে ছবি তোলা হল। কিন্তু সেখান থেকে দেখাই যাচ্ছে না জলপরীর পা ফেলা নাচের মঞ্চটা। সেটা আবার একটু নিচে, নামতে হবে। কিন্তু ভিজে যাব পুরো। এখানে জলের আনাগোনা সব দিক থেকে। অথচ না দেখলেও জীবন ব্যর্থ। মধুকে বললাম তুই আগে যা। ও তো পোঞ্চতে প্যাক করা। আমাদের কাছে ক্যামেরা দিয়ে ও গিয়ে ঘুরে এল। তখন ওই পোঞ্চটা আমি পরে, আপাদমস্তক ঢেকে চললাম। সঙ্গে সর্বাণী। কাছাকাছি যেতেই চশমা পুরো ঝাপসা হয়ে টপটপ জল ঝরতে লাগল। মাথার ঢাকনাটা খুলে উড়ে যাবার জোগাড়। তাকে ধরতে দুহাত তুলতেই হাতার ফাঁক দিয়ে জলকণারা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরের খবর নিতে। পৃথিবীতে যখন এই সব ঘটে চলেছে তখন অবশ্য আমি জন্নতে - দেখছি ঊর্বশী-মেনকার দ্রুত পায়ের কাজের নৃত্য শৈলী। ওই নকশাকাটা হালকা রেশমের ওড়না নিচের জল ছুঁয়েই কি প্রচণ্ড গতিতে ঘূর্ণি তুলে হৈ হৈ করে ছুটে চলেছে দিকবিদিকশূন্য কে জানে কোথায়! এ সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কি দেখিলাম! কি দেখিলাম!! চর্মচক্ষু সার্থক হইল!!!





জুলাই ৪, ২০২৫ (৩)

এবার গন্তব্য গোনাসিকা। কেওনঝড় থেকে এর দূরত্ব ৩৩ কিমি। আমরা অবশ্য আসছি খণ্ডধার থেকে। সাধারণ বিশ্বাসে বলে এখানে পাহাড়ের ওপর গোরুর নাসিকা থেকে বৈতরণী নদীর জন্ম হচ্ছে। এটাই বৈতরণীর উৎস। এখানেও সিঁড়ি ভাঙা। ধাপের সংখ্যা ১৪৮। ওঠা নামায় দ্বিগুণ। এখানেও নিচু ধাপের চওড়া সিঁড়ি, কোথাও কোথাও মাথার ওপর ছাউনিও আছে। আশপাশে ঘন পাথুরে জঙ্গল। সেখানে এপাশ ওপাশে পাথরের ফাঁক দিয়ে ছোটো ছোটো জলের‌ ধারা বইছে। ওপরে উঠে একটি ছোটো ঘরের মতো মন্দির। তার সামনে নন্দীর অবস্থান। ভেতরে একজন পূজারী রয়েছেন। কয়েকটি দেবদেবীমূর্তী। একটি গোমুখ। তার নাসিকার দুই ছিদ্র দিয়ে অবিরাম জলের ধারা বয়ে চলেছে। আর আছে একটি গাছ, যাকে বলে বৃক্ষ। সেটি দুভাগ হয়ে ঘরের জানলা ফুঁড়ে দুই বিপরীত দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তারপর কোন গাছের দু'ডালের ফাঁকে নিজের ভার রেখে গলে গিয়ে, কোন গাছের গলা জড়িয়ে, আবার কার প্রায় কোলে চড়ে সে এক বিচিত্র বিস্তারে নিজেকে মেলে‌ ধরেছে। বহু প্রাচীন বৃক্ষ। কি গাছ জানিনা। ওই মন্দির কাম ঘরের মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট বস্তুই বেশি, বৃক্ষটি ছাড়া। তবে গতকাল যে বৈতরণী দেখে এসেছি ভীমকুণ্ডে তার উৎস এই গোনাসিকার ধারা বললে তেমন বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। হয়ত এই ধারাটিও বৈতরণীর অংশ হয়েছে, যার থেকে ভক্তজনের বিশ্বাসে এটাই উৎস হয়ে গেছে। ভক্তি আর যুক্তি তো হাত ধরে চলে না। অতএব ভক্তিতে কি না হয়! নামার সময় পাহাড়ের এক গুহার মুখও দেখলাম।





জুলাই ৪, ২০২৫ (৪)

এরপরের গন্তব্য সানাঘাগরা, যেটি পান্থনিবাস থেকে মাত্র ৫ কিমি দূরত্বে। সানাঘাগরাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পার্ক, পিকনিক স্পট, সেখানে জলাশয় আছে, তার মাঝখানে শিব বসে আছেন,  নিমীলিত চোখ। তাঁকে ঘিরে বোটিং -এর ব্যবস্থা। বোট ওল্টালে শিব চোখ খোলেন কি জানা নেই, তবে অল্প সাঁতরে তাঁর কোলে উঠে পড়া যায়। পার্ক সাজানো। কয়েকটি খাবারের দোকান আছে। প্রচুর আচার সাজানো থরে থরে। এসব ছাড়িয়ে আরও খানিক এগোলে সিঁড়ি শুরু। এখানে প্রথমে ওঠা, তারপর শেষের দিকে নেমে জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছনো। ধাপ মোট ১৭০। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চওড়া,নিচু নিচু ধাপ। যত অবধি উঠতে হয় সেই উচ্চতায়ও বিশাল পার্ক, সেখানে আছে সানাঘাগরা নেচার ক্যাম্প। থাকা যায়, তবে আমরা তো অতটা সময় পকেটে নিয়ে আসিনি। অতএব সানাঘাগরা দেখে ফেরা।

চড়াই পেরিয়ে উৎরাই সিঁড়ির শেষে বাঁদিকের পাথরের ফাঁক ফুঁড়ে বুলেটের মতো প্রবল শক্তি ও গতিতে জলপ্রপাতের আত্মপ্রকাশ। তারপর প্লাঞ্জপুলে ঘূর্ণি তুলে প্রবল বিক্রমে কয়েক মিটার এগিয়েই একটা বটলনেকের মতো পাথরের খাঁজ দিয়ে আবার কয়েক ফুট নিচে আছাড় খেয়ে আরেকবার ফুঁসে উঠছে। দুটো লেভেলে জলপ্রপাত। তীব্র গতিশক্তির। সিঁড়ির নিচের চত্বরে দাঁড়ালে ১৫ সেকেন্ডে আধাভিজে। বর্ষার ফুল ফ্লাশ প্রপাতের কি ভীষণ সৌন্দর্য! সানা মানে ছোটো। গুগল বলছে এটি সান মছকন্ডন নদীর ওপর একটি ছোটো জলপ্রপাত। নদীর নামের উচ্চারণ ঠিক লিখলাম না ভুল তা জানিনা, তবে জলপ্রপাতটি যে বর্ষায় আদৌ ছোটো নেই সেটা একশো ভাগ খাঁটি।

বৃষ্টির ঝিরি ঝিরি তো চলছেই। তারই মধ্যে এগরোল খেয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম বড়াঘাগরার দিকে।

সানাঘাগরা পার্কে প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ২০/-, আর ড্রাইভারসহ গাড়ির ৫০/-।





জুলাই ৪, ২০২৫ (৫)

সানাঘাগরার পার্ক থেকে বেরিয়ে হাইওয়ে পেরিয়ে বড়াঘাগরা যাবার রাস্তায় ঢুকতে হয়।‌ প্রায় ৫ কিমি। গুগল বলছে এটাও মচ্ছকন্ডন নদীর ওপর। ঠিক কি ভুল জানিনা। বড়াঘাগরার প্লাঞ্জপুলটি বিশাল। দেখে বোঝা যায় আগে বড়াঘাগরা সত্যি বড়ো ছিল, এখন সে তুলনায় ক্ষীণতনু। প্রায় ৬০ মিটার উঁচু থেকে ঝর্ণার জল নামছে। আগে যতগুলো জলপ্রপাত দেখে এলাম সে তুলনায় একটু দুবলা-পাতলা। জলের ধারার পেছনের পাথর এখানে দৃশ্যমান। এই দৌর্বল্যের কারণ হল বাঁধ। ঝর্ণার ওপরে এক বিশাল রিজার্ভার রয়েছে, সেখান থেকে জল নিয়ন্ত্রিত হয়ে ঝর্ণার পথে যাচ্ছে। ঝর্ণার প্লাঞ্জপুল থেকে ওপর অবধি সিঁড়ির ধাপ ১২২টি। আর ওই লেভেল থেকে রিজার্ভার অবধি আরও ৭৫টি। ৭৫ ধাপ উঠে, রিজার্ভার দেখে, আবার নামতে হয়েছিল। তবে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার ওই লেভেলে উঠে গিয়েছিল বলে ১২২ ধাপ আর নামতে হয়নি। বড়াঘাগরায় গাড়ির এন্ট্রি ফি ৫০/-। সারাদিনের পরে এবার পান্থনিবাসে ফেরা। আজ রাতে চাইনিজ - এগচাওমিন ও চিলি চিকেন।

কেওনঝড় (জুলাই ৩, ২০২৫ (১, ২, ৩ ))

 কেওনঝড়

জুলাই ৩, ২০২৫ (১)






মেঘ না চাইতেই জলের মতো কাল রাতে চেন্নাই মেলে উঠে দেখি আমাদের তিনজনেরই লোয়ার বার্থ! ঘটনাটা হল আমাদের প্রাণ কাঁদছিল বর্ষায় বেড়ানোর জন্যে। দুটো প্ল্যান ক্যানসেল হল - একটা বুকিং সমস্যায়, অন্যটা তাপমাত্রার পায়ে গড় করে। ৩ নংএ আছে কেওনঝড়। কিন্তু টিকিট কাটার আগের দিন কম্পুটারে আঁতিপাতি খুঁজেও রাতের কোনো ট্রেনে জুলাইয়ে ১৮ পর্যন্ত ওয়েটিং লিস্টে ১৭-র নিচে কোনো টিকিট দেখলাম না। সেটা জানিয়ে দিলাম মধুমিতা, সর্বাণীকে। এই ট্যুরে, যদি ট্যুর হয় তো তবে ৩য় জন আমি। টিকিট করবে মধুমিতা। পরেরদিন বিকেলে মধুমিতা জানালো - টিকিট হয়ে গেছে। চেন্নাই মেল, কনফার্মড। হল কি করে?! ২টো হয়েছে সিনিয়র সিটিজেন কোটায়, ১টা সিংগল ওম্যান কোটায়, তবে সব এক কম্পার্টমেন্টেই। 

গতকাল, জুলাই ২-এ ট্রেন ছেড়েছে হাওড়া স্টেশন থেকে রাত ১১.৪৫-এ, একেবারে রাইট টাইম। তারপরই মেঘ-জলের চমৎকারিত্ব। ট্রেনে উঠেই শোয়ার পর্ব। আমাদের কম্পার্টমেন্টের এসি এতই বেশি ঠাণ্ডা যে বোঝা যাচ্ছে না তার দায়িত্বটা কি - জ্যান্ত মানুষ তাজা রাখা, না মরা মানুষ তাজা রাখা। যাই হোক, সেই ঠাণ্ডায় মাথা ঠাণ্ডা হতে এটা স্পষ্ট হল যে টিকিটটা মন দিয়ে দেখলে ও তার সঙ্গে কোন কোটার টিকিট সেটা লজিকালি যোগ করলে আগেই বোঝা যেত যে আমাদের লোয়ার বার্থ পাওয়াই স্বাভাবিক। তবে অত ভাবাভাবি করলে আজকের সারপ্রাইজ বেচারা মাঠে মারা যেত!

ভোর ৪.৩০-য়, একেবারে রাইট টাইমে ট্রেন নামালো জাজপুর কেওনঝড় জংশন স্টেশন। আকাশ অন্ধকার। স্টেশনের মহিলা ওয়েটিং রুমে শুধুই আমরা। প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে তৈরি হয়ে, সর্বাণীর করা কেক খেয়ে, চায়ের খোঁজে গিয়ে স্টেশনপরিস্কাররত কর্মীর থেকে শুনলাম প্ল্যাটফর্মের মা ভবানী চায়ের দোকানটি খুলবে ৬টায়, কারণ তার মালিক দোকান বন্ধ করে শুয়েছে সাড়ে তিনটেয়! জাজপুর জংশন স্টেশন, লম্বা প্লাটফর্ম, পরিচ্ছন্ন, দুটি ওভারব্রিজ, লিফট আছে। কিন্তু ঝাঁ চকচকেওলা নাকউঁচুপনা নেই। প্লাটফর্মের কালো পাথর বাঁধানো বসার জায়গাগুলো দেখলে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

আলো ফুটলো। আমাদের গাড়ি এলো। আগেই বুক করা ছিল। স্টেশন থেকে পিকআপ, দুদিন সব দ্রষ্টব্য ঘুরিয়ে দেখাবে, তৃতীয় দিনেও দুটো জায়গা দেখিয়ে স্টেশনে ড্রপ করবে। স্করপিও  জিপ, নেবে সাড়ে বারো হাজার। চালকের নাম তপন। প্রায় ছটা নাগাদ যাত্রা শুরু। পথে গাড়ি থামিয়ে চা-বিস্কুট।

প্রথম দ্রষ্টব্য মা তারিণী মন্দির। বিশাল খোলামেলা মন্দির, তার আরও বিশাল চত্বর। মন্দিরের মাঝখানের গোল চত্বরে মূর্তি। প্রতিষ্ঠিত শীতলা ঠাকুরের মতো - গোল পাথরে টকটকে লাল রঙের ওপর সোনালী ধাতুর চোখ-নাক-মুখ। অবয়বের কোনো ফর্ম নেই। সেই গোল ঘিরে বিশাল চওড়া খোলা গোল বারান্দা। সেখানে ভিড় সামলানোর স্টিলরডের ভক্ত-চ্যানেল, গেট সবই আছে। আমরা যখন গেছি তখন একেবারেই ফাঁকা। ঠাকুরকে ঘিরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ৪/৫ জন পুরোহিত বসে। তাঁরা ভক্তদের থেকে ডালা নিয়ে পুজো করে তাদের হাতে ফেরৎ দিচ্ছে। তাঁদের প্রত্যেকের সামনেই ঠুকে নারকেল ভাঙার একটা করে লোহার যন্ত্র। সেগুলি থেকে বিরামহীন ফটফট শব্দ হয়েই চলেছে। নারকেল সহযোগে পুজো দেওয়াই রীতি। পুরো মন্দিরটি পরিস্কার ঝকঝকে। সদ্য রেনোভেশন হয়েছে বোঝা যায়। মূল মন্দিরের দরজার বাইরে দুদিকে দুটি অসুর নিধনরত দেবীমূর্তি। সেই অসুরদের পেটের মাঝখানে ১টি করে গর্ত - কোকোনাট-বে। ওখানে নারকেল দিয়ে দিলে তা গড়গড় করে সুড়ঙ্গপথে যথাস্থানে পৌঁছে যায়! মন্দিরের বাইরের চত্বরে ১টি বিশাল কলসের ওপর ১টা উপযুক্ত মাপের ডাব - কংক্রিটের। কলসটি পানীয় জলের। তার গায়ে কল ও গাঁথা বেসিন।‌ আর বাইরের ফটকের কাছে, ভেতর দিকেই, বিনামূল্যে জুতো রাখার জায়গা। মন্দিরের গায়ে, ফটকের মাথায়, মূল ফটকে, দরজায় কারুকাজ তো আছেই।







জুলাই ৩, ২০২৫ (২)

এবার তারিণী মন্দির থেকে ১২ কিমি দূরের ঝর্ণা গুণ্ডিচা ঘাই বা ঘাগি। জাজপুর থেকে কেওনঝড়ের দূরত্ব ১১৪ কিমি মতো। পথ এনএইচ ২০ আর স্টেট হাইওয়ে। এই দূরত্ব অতিক্রম করার পথে আশেপাশেই পড়ে তারিণী মন্দির, গুণ্ডিচা ঘাই আর ভীমকুণ্ড। আমরা এই তিনটে তাই যাবার পথেই দেখব আজ।

গুণ্ডিচা ঘাই একটি ঝর্ণা মহেন্দ্রতনয়া নদীর ওপর। নায়াগ্রা বা ভারতের আথিরাপল্লীর ছোটো সংস্করণ এটি। এর উচ্চতা ও প্রস্থ দুইই আছে। জল অনেকগুলি ধারায় ভাগ হয়ে উঁচু থেকে পড়ছে। তার আগে নদীর আসছে বেশ খানিকটা প্রায় সমতল পাথুরে ভূমি পেরিয়ে। এই বর্ষায় ঝর্ণার ফুল ফ্লাশ। সুন্দর বাঁধানো সিঁড়ি রেলিংসহ নেমে গেছে ঝর্ণার নিচে অবধি। বাতাসে জলকণার হুড়োহুড়ি। সিঁড়ির ধাপে পাঁচ মিনিট দাঁড়ালে নিজে স্যাঁতস্যাঁতে পাঁপড় হয়ে যাবে। ওখানে ছবি তোলা হল - সে ছবিতেও জলকণা আমাদের ঢেকে দিচ্ছে। সিঁড়ি থেকে উঠে ঝর্ণার সামনে, ক'হাত দূরেই একটা তিনতলা ভিউ পয়েন্ট। আরও আছে ঝর্ণার নিচে যে নদীটা তৈরি হচ্ছে সেটার ওপর দিয়ে একটা ব্রিজ। সেই ব্রিজের এক পাশেও ভিউ পয়েন্ট, সেখান থেকে দেখা যায় ঝর্ণার শুরুর আগের পাথুরে পথটাও। আশপাশে কয়েকটা দোকানপাটও আছে, তবে কিছুই খোলেনি তখনও। কি অনাবিল সৌন্দর্য তাই!




জুলাই ৩, ২০২৫ (৩)

এবার ভীমকুণ্ড। প্রথমে ১২ কিমি গিয়ে আবার তারিণী মন্দির। তার আশপাশে কোথাও ব্রেকফাস্ট করে ভীমকুণ্ডের পথে। রাস্তার ধারে বড় হোটেলের একটা আউটলেট - স্টিলের কাউন্টার - গরম গরম খাবার সার্ভ করছে। আমরা ইডলি আর ধোসা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম।

ভীমকুণ্ডে প্রবেশমূল্য ১০/-। বড় গেট, ঢোকার লোহার রিভলভিং দরজা, ওয়েটিং রুম, পরিস্কার টয়লেট। আর ভেতরে ঢুকে লম্বা একটা ব্রিজের শেষে তিনতলা ভিউ পয়েন্ট। প্রত্যেকটা তলার চারপাশ ঘিরে বারান্দা। ঘুরে ঘুরে ভীমকণ্ডের পুরোটা দেখার জন্যে। 

ভীমকুণ্ড ভীমের মতোই বিশাল। বৈতরণী নদী বয়ে আসছে প্রস্তরসঙ্কুল নদীখাত ধরে। তারপর পাথরের ওই রকম ফর্মেশনের কারণে অজস্র ধারায় ভাগ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা ধারাই পাথরের অসমান লেভেলে লাম্ফঝম্প করে একটা আরেকটার সঙ্গে মিশছে। সবশেষে বড় বড় দুতিনটি ধারায় জড়ো হয়ে বড় বড় দুতিনটি প্রচণ্ড স্রোতের সঙ্গম। এই বর্ষায় প্রতিটি ধারাই অত্যন্ত সজীব। ভীমকুণ্ডের বিশাল বিস্তার, কিন্তু উচ্চতা নেই। স্রোতের তীব্রতা যেন বাঁধের ছাড়া জল। আর এই এত সৌন্দর্যের ফ্রেমের চারিদিকে ঘন সবুজ জঙ্গলের পাড়। অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতি!

এবার গন্তব্য ওডিশা টুরিজিমের পান্থনিবাস, কেওনঝড়। আমরা সেখানে থাকব আগামী দুদিন। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় একটা বাজল। শহরের একটু বাইরে, হাইওয়ের ওপর, পেছনে পাহাড়ের চালচিত্রে খোলামেলা পান্থনিবাস। প্রচুর গাছপালা। এখান থেকে গুণ্ডিচা ঘাই ৫৬ কিমি, আর ভীমকুণ্ড ৫০ কিমি। আজকে আর ডেরার বাইরে নয়। বিশ্রাম। বিশ্রামের সময় কথায় কথায় চলে এল নন্দিনীর কথা। ওরও আসার কথা। ছিল। কিন্তু পাকেচক্রে জড়িয়ে আটকে গেল! আমরা মিস করছি। ওও করছে নিশ্চয়ই।সর্বাণী লুডোর বোর্ড এনেছে। চারজন হলে ভালো হয়। ওকে যে অনলাইনে ডাকব তারও ভরসা নেই, কারণ এখানে কানেকশন এই আছে, এই নেই!